রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় সোহেল রানা-স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ড

পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: ঘটনার মাত্র ১৯ দিনে বিচার সম্পন্ন, স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড

কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার নৃশংস ঘটনায় নজিরবিহীন দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মূল আসামি সোহেল রানা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত জনাকীর্ণ এজলাসে এই রায় ঘোষণা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(২) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করা হয়।

মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এই অর্থদণ্ডের টাকা ভিকটিম শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী (বাবা-মা) পাবেন। আদালত তাঁর আদেশে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, আসামিরা এই ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই টাকা মৃত রামিসার উত্তরাধিকারীকে হস্তান্তর করতে হবে।

নজিরবিহীন গতিতে মাত্র ১৯ দিনে বিচার সম্পন্ন

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে কোনো ক্লু-লেস বা নৃশংস ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার নজির মেলা ভার। গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটার পর থেকে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আজ চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হলো। আদালতের কার্যবিবরণী ছিল নিম্নরূপ:

  • ১৯ মে ২০২৬: পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

  • ২০ মে ২০২৬: পল্লবী থানায় ভিকটিমের বাবার মামলা দায়ের।

  • ২৪ মে ২০২৬: ঘটনার মাত্র ৪ দিনের মাথায় ১৮ জন সাক্ষীসহ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামানের চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল।

  • ১ জুন ২০২৬: আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন।

  • ২ জুন ২০২৬: মাত্র ১ দিনেই ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন।

  • ৩ জুন ২০২৬: আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিদের নিজেদের নির্দোষ দাবি।

  • ৪ জুন ২০২৬: রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষে রায়ের দিন ধার্য।

  • ৭ জুন ২০২৬: ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক চূড়ান্ত রায় ও মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা।

কড়া নিরাপত্তা ও আদালত কক্ষের চিত্র

আজকের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে নারী আসামি স্বপ্না খাতুনকে এবং ৮টা ৫০ মিনিটে প্রিজনভ্যানে করে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে কারাগার থেকে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। বেলা ১১টার পর বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে বসে রায়ের মূল অংশ পড়া শুরু করেন। রায় ঘোষণার সময় দুই আসামিই কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল।

যে লোমহর্ষক ঘটনায় কেঁদেছিল মিরপুর

মামলার এজাহার ও চার্জশিটের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার (৮) বাসা থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে তার মা প্রতিবেশী সোহেলের বন্ধ দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান।

অনেক ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাপ্লুত মরদেহ এবং পাশে একটি বড় বালতির ভেতরে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান।

পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে স্বপ্নাকে ঘরের ভেতর থেকেই হাতেনাতে আটক করে। অন্যদিকে মূল ঘাতক সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা আদালতের এই দ্রুততম ও দৃষ্টান্তমূলক রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।