কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসায় চরম অবহেলায় ছয় শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এবং দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামগ্রিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বিদ্যমান চরম অনিয়ম, চিকিৎসায় অবহেলা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে এই রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে। ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের (এনএলসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিটটি দায়ের করেন। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) বিষয়টি তিনি নিজেই গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
রিটে জনস্বার্থ ও নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং র্যাবের মহাপরিচালককে (ডিজি) বিবাদী (রেসপন্ডেন্ট) করা হয়েছে।
রিট আবেদনের প্রধান ৫টি আইনি প্রার্থনা
১. বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন: আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর রহস্যজনক ও দুঃখজনক ঘটনা তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বর্তমান অথবা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
২. বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ অভিযান: দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনতিবিলম্বে বিশেষ অভিযান ও পরিদর্শন পরিচালনার নির্দেশনা প্রার্থনা করা হয়েছে।
৩. লাইফ সাপোর্ট সেবার কার্যকারিতা যাচাই: সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা বন্ধে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র), সিসিইউ, এইচডিইউ এবং এনআইসিইউ (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সুবিধার কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সত্যতা যাচাইয়ের আবেদন জানানো হয়েছে।
৪. অবৈধ ক্লিনিক সিলগালা: সারা দেশে লাইসেন্সবিহীন ও অননুমোদিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও সেগুলো বন্ধের আর্জি জানানো হয়েছে।
৫. রোগীর নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা: দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী গাইডলাইন বা প্রয়োজনীয় আইনি নির্দেশনা জারির প্রার্থনা করা হয়েছে।
রিট আবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ১৮, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পরম সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন নামী-দামী ও অননুমোদিত হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসায় গাফিলতি, প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট সরঞ্জামের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার (হেলথ ডিরেক্টরেট) পর্যাপ্ত তদারকির অভাব জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, যা নাগরিকদের মৌলিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
জানা যায়, এর আগে গত ৩১ মে ২০২৬ তারিখে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিগ্যাল নোটিশ (আইনি নোটিশ) পাঠানো হয়েছিল। নোটিশে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করা হলো। চলতি সপ্তাহেই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে এই রিট আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।

