ভূমিকা: সত্য অনুসন্ধান ও ডিজিটাল বাস্তবতার সন্ধিক্ষণ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিচারব্যবস্থা সবসময়ই সত্য অনুসন্ধানের এক অবিরাম প্রচেষ্টা। একসময় সাক্ষ্য বলতে বোঝাত প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, হাতে লেখা দলিল, বস্তুগত আলামত কিংবা বিশেষজ্ঞের মতামত। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন ডিজিটাল পরিসরে স্থানান্তরিত হয়েছে, তেমনি অপরাধ, বিরোধ, চুক্তি, যোগাযোগ এবং সামাজিক আচরণের বিশাল অংশও এখন ডিজিটাল তথ্যের ভেতরেই সংরক্ষিত থাকে। ফলে আধুনিক বিচারব্যবস্থায় সত্যের অনুসন্ধান ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে ডিজিটাল সাক্ষ্যের ওপর। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে বর্তমানে অবস্থান করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক প্রযুক্তিগত বাস্তবতা, যা কম্পিউটারকে শুধু তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতাই দেয় না; বরং তথ্য বিশ্লেষণ, প্যাটার্ন শনাক্তকরণ, ডিজিটাল রেকর্ড সৃজন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও প্রদান করে। আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্রে AI ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ: বিচারিক প্রক্রিয়ায় AI-এর ভূমিকা
ডিজিটাল সাক্ষ্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিপুলতা। বর্তমান সময়ে একটি মামলার সঙ্গে হাজার হাজার ই-মেইল, অসংখ্য কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, ক্লাউডে সংরক্ষিত ডেটা, সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা ডিজিটাল ডিভাইসের বিপুল ডেটা জড়িত থাকতে পারে। মানুষের পক্ষে এসব তথ্য ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। এখানেই AI বিচারিক প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি স্ক্যান করা নথিকে অনুসন্ধানযোগ্য টেক্সটে রূপান্তর করতে পারে, দীর্ঘ নথির সারাংশ তৈরি করতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, ব্যক্তি, তারিখ, ঘটনা বা আইনি প্রশ্ন শনাক্ত করতে পারে এবং বিভিন্ন ভাষার নথিকে অনুবাদ করে একটিসমন্বিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে পারে। আদালতে ব্যবহৃত বিপুল সংখ্যক ই-মেইল, বার্তা কিংবা অন্যান্য টেক্সটভিত্তিক তথ্যের মধ্যে কোন অংশটি মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোন অংশটি অসঙ্গতিপূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর—AI তা মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম।
অডিও-ভিডিও ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ
শুধু ভাষাভিত্তিক তথ্য নয়, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি এখন ছবি বা ভিডিওর মধ্যে মুখমণ্ডল, বস্তু, অস্ত্র, যানবাহন, নম্বরপ্লেট কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি শনাক্ত করতে পারে। এমনকি কোনো ছবিতে বা ভিডিওতে কারসাজি করা হয়েছে কিনা, দৃশ্যের আলো-ছায়া বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, কোনো অংশ সংযোজন বা বিয়োজন করা হয়েছে কিনা—এসব সূক্ষ্ম বিষয়ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও AI-এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান যুগে অপরাধ তদন্তের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সিসিটিভি ফুটেজ। একটি বড় শহরে কোনো ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে শত শত ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণের প্রয়োজন হতে পারে। কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে AI এই বিশাল কাজটি অনেক দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে। একইভাবে কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ, ভয়েস ম্যাচিং এবং বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও বর্তমানে তদন্তে ব্যবহৃত হচ্ছে। একসময় মানবচোখের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল যে কাজগুলো ছিল, সেগুলো এখন অ্যালগরিদমের সহায়তায় অধিকতর নির্ভুল ও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব।
আরও পড়ুন : আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্য: তত্ত্ব ও ব্যবহারবিধি (পর্ব-১)
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস এবং প্যাটার্ন রিকগনিশন প্রযুক্তি। একটি অপরাধ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ফল নয়; বরং এর পেছনে থাকে সম্পর্ক, যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা ডিজিটাল আচরণের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। AI বিপুল পরিমাণ নেটওয়ার্ক লগ, ডাটাবেস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, আর্থিক নথি, ফোনকল রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমন সব সম্পর্ক ও প্রবণতা শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অর্থপাচার, সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি, সংগঠিত অপরাধ কিংবা অনলাইন হয়রানির মতো মামলাগুলোতে এ ধরনের বিশ্লেষণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রমাণের অখণ্ডতা যাচাই ও তথ্য পুনরুদ্ধার
তবে AI-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত ডিজিটাল সাক্ষ্যের সত্যতা ও অখণ্ডতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে। ডিজিটাল প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কি আসল, নাকি পরিবর্তিত? কোনো নথি, ছবি, ভিডিও বা অডিওর প্রকৃত উৎস কী? এর মধ্যে কারসাজি হয়েছে কিনা? AI মেটাডেটা, টাইমস্ট্যাম্প, ডিজিটাল স্বাক্ষর, এডিটিং হিস্টোরি (Editing History) এবং ফাইলের গঠন বিশ্লেষণ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে।
একইসঙ্গে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্ব পাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ব্লকচেইন তথ্যকে এমনভাবে সংরক্ষণ করে, যেখানে প্রতিটি পরিবর্তনের ইতিহাস স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ থাকে এবং পরবর্তী সময়ে তা গোপনে পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে ডিজিটাল নথির প্রামাণিকতা ও অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন : আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্য: তত্ত্ব ও ব্যবহারবিধি (পর্ব-২)
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো হারিয়ে যাওয়া বা মুছে ফেলা প্রমাণ পুনরুদ্ধার। বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা ডিজিটাল আলামত ধ্বংস করার চেষ্টা করে। AI অবশিষ্ট ডেটা, মেটাডেটা এবং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে মুছে ফেলা তথ্য পুনর্গঠন করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ছবি, ভিডিও কিংবা নথির হারিয়ে যাওয়া অংশ እንደሚলিয়ে দিতে বা পুনরুদ্ধারেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
তদন্তকারীদের জন্যও AI একটি শক্তিশালী সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভিডিও, অডিও, ছবি এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যের স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ, স্পিচ-টু-টেক্সট রূপান্তর, কীওয়ার্ড অনুসন্ধান, টাইমলাইন পুনর্গঠন এবং ক্রস-মিডিয়া বিশ্লেষণ তদন্তকে দ্রুততর ও অধিক কার্যকর করছে। একইভাবে ডিফেন্স আইনজীবীদের জন্যও AI একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তারা AI ব্যবহার করে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত প্রমাণের মধ্যে অসঙ্গতি শনাক্ত করতে পারেন, মেটাডেটা বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং ডিজিটাল সাক্ষ্যের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
প্রযুক্তির অন্ধকার দিক: ডিপফেক ও ‘Liar’s Dividend’
কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের শেখায়—যে প্রযুক্তি সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে, সেই প্রযুক্তি মিথ্যাও তৈরি করতে পারে। AI-এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই নতুন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে সক্ষম। ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও, ভয়েস ক্লোনিং, স্বয়ংক্রিয় জাল ফরেনসিক রিপোর্ট—এসব এখন বিচারিক অঙ্গনে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষত ডিপফেক প্রযুক্তি বিচারব্যবস্থার জন্য এক নতুন সংকট তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা বাস্তবতার প্রায় নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির এই পর্যায়ে এসে “চোখে দেখেছি” কিংবা “কানে শুনেছি”—এই প্রচলিত ধারণাগুলোর ওপর আর সন্দেহাতীতভাবে নির্ভর করা যায় না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ডিপফেক শুধু ভুয়া প্রমাণ তৈরির ঝুঁকিই সৃষ্টি করে না; বরং প্রকৃত প্রমাণকেও সন্দেহের মুখে ফেলে। ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে অপরাধী সত্য ভিডিওকেও “ডিপফেক” বলে দাবি করতে পারে। আইনবিদেরা এই প্রবণতাকে “Liar’s Dividend” নামে অভিহিত করেছেন। একটি ভুয়া ভিডিও বা অডিও আদালতে উপস্থাপিত হলে তা বিচারক, আইনজীবী কিংবা সাক্ষীদের উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় গেছে, মানুষ কোনো দৃশ্য বা শব্দ একবার সত্য বলে বিশ্বাস করলে পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলেও সেই প্রথম ধারণার প্রভাব পুরোপুরি দূর হয় না। ফলে ডিপফেক বিচারিক সত্য অনুসন্ধানের জন্য একটি গুরুতর হুমকি।
আরও পড়ুন : আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্য : কিছু প্রযুক্তিগত বিষয়, যা জানা জরুরি (পর্ব-৩)
AI-প্রক্রিয়াজাত বা AI-উৎপাদিত সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা তাই নতুন ধরনের আইনগত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আদালতকে এখন শুধু প্রমাণটি সত্য কিনা তা নয়, বরং ব্যবহৃত অ্যালগরিদম কতটা নির্ভরযোগ্য, তার প্রশিক্ষণ ডেটা কতটা নিরপেক্ষ, ব্যবহৃত পদ্ধতি কতটা স্বচ্ছ এবং ফলাফল কতটা পুনরুৎপাদনযোগ্য—এসব প্রশ্নও বিবেচনা করতে হচ্ছে। কারণ AI অনেক সময় একটি “ব্ল্যাক বক্স” (Black Box) হিসেবে কাজ করে; ফলাফল পাওয়া যায়, কিন্তু সেই ফলাফলে পৌঁছানোর যুক্তি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিচারব্যবস্থার জন্য এটি একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ, কারণ ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
AI-এর আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো পক্ষপাত বা বায়াস (Bias)। কোনো AI ব্যবস্থা যদি পক্ষপাতপূর্ণ, অসম্পূর্ণ বা অপ্রতিনধিত্বমূলক তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে তার ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষত ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণ কিংবা ঝুঁকি মূল্যায়নমূলক অ্যালগরিদমের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে।
আদালতে AI-সম্পৃক্ত প্রমাণের শ্রেণিবিভাগ ও আইনি মূল্যায়ন
তাই, AI-নির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যা উপস্থাপিত হচ্ছে তা কতটুকু সত্য, নির্ভরযোগ্য এবং বিকৃতিমুক্ত। এ প্রসঙ্গে AI-সম্পৃক্ত প্রমাণকে সাধারণত দুই ভাগে দেখা হয়:
-
প্রথমত, স্বীকৃত AI প্রমাণ: এমন প্রমাণ যেখানে AI ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়। যেমন জটিল দুর্ঘটনা, চিকিৎসাগত অবহেলা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর ঘটনার বাস্তবসম্মত ত্রিমাত্রিক (3D) মডেল ও অ্যানিমেশন নির্মাণ, বিপুল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ প্যাটার্ন শনাক্তকরণ, ঝাপসা ছবি বা অস্পষ্ট ভিডিওকে উন্নত করা, এমনকি শব্দের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অডিওকে পরিষ্কার করা কিংবা কোনো সিমুলেশন বা ডেটা বিশ্লেষণ AI-এর সহায়তায় প্রস্তুত করা।
-
দ্বিতীয়ত, অস্বীকৃত বা ছদ্মবেশী AI প্রমাণ: এমন প্রমাণ যেখানে AI ব্যবহারের বিষয়টি গোপন রাখা হয় অথবা অস্বীকার করা হয়, অথচ প্রমাণটির সত্যতা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের অবকাশ থাকে। এই দ্বিতীয় শ্রেণির প্রমাণ বিচারব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ এখানেই ডিপফেক প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত কিন্তু সম্পূর্ণ ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিও ব্যবহারের ঝুঁকি বিদ্যমান।
এই বাস্তবতায় আদালতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। AI-সংশ্লিষ্ট প্রমাণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিচারককে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার দেখলেই চলবে না; বরং প্রমাণের উৎস, সংগ্রহের পদ্ধতি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, চেইন অব কাস্টডি (Chain of Custody), মেটাডেটা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সবকিছু সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। AI ব্যবহৃত হয়েছে—এমন স্বীকৃত সাক্ষ্য এবং AI ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—এমন অস্বীকৃত সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো অনুসরণ করাও প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য বিভিন্ন বিচারব্যবস্থায় বিচারকদের জন্য AI-সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কার্ড (Bench Card) বা নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন : আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্য (পর্ব-৪); সংগ্রহ, জব্দকরণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ধারণা
যখন কোনো পক্ষ কোনো ডিজিটাল সাক্ষ্যের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করে এবং দাবি করে যে তা AI-এর মাধ্যমে তৈরি বা পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু উপস্থাপনকারী পক্ষ AI এর ব্যবহার অস্বীকার করে, তখন আদালতের অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সাক্ষ্যের উৎস, সংগ্রহের পদ্ধতি, হেফাজতের ধারাবাহিকতা (chain of custody), সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সম্পাদনা বা পরিবর্তনের ইতিহাস, মেটাডাটা এবং স্বাধীন সমর্থনকারী প্রমাণ বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রয়োজনবোধে নিরপেক্ষ ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সহায়তায় প্রমাণের অখণ্ডতা যাচাই করাও ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষত, ডিপফেক প্রযুক্তি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেক সময় আসল ও কৃত্রিম কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আদালতে উপস্থাপিত কোনো ডিজিটাল রেকর্ডকে কেবল বাহ্যিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য দেখালেই তার সত্যতা নিশ্চিত হয় না; বরং এর উৎস, তৈরির প্রক্রিয়া, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং পরবর্তী সময়ে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি না—এসব বিষয় গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এজন্য আধুনিক বিচারব্যবস্থায় মেটাডাটা বিশ্লেষণ, ফাইলের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা, আলো-ছায়ার অসঙ্গতি শনাক্তকরণ, মুখমণ্ডল বা কণ্ঠস্বরের অস্বাভাবিকতা পর্যবেক্ষণ, রিভার্স ইমেজ ও ভিডিও সার্চ, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক যাচাইকরণ পদ্ধতির গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি মানবিক বিচারবোধ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন (২০২২ সংশোধন) ও ধারা ৬৫খ-এর ব্যাখ্যা
বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ২০২২ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ডিজিটাল রেকর্ডকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে কিছু ধারা অন্তর্ভুক্ত করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ধারা ৬৫খ মূলত ডিজিটাল রেকর্ডকে আদালতে গ্রহণযোগ্য করার একটি আইনগত কাঠামো প্রদান করে। তবে, উক্ত ধারার মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একপ্রকার পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ধারা ডিজিটাল রেকর্ড বা কম্পিউটার আউটপুটকে কিছু শর্তপূরণ সাপেক্ষ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য করেছে।
ধারা ৬৫খ(৫)-তে AI-এর সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, স্বয়ংক্রিয় তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও কম্পিউটার আউটপুট উৎপাদনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—যা AI-সৃষ্ট তথ্যকেও এর আওতায় নিয়ে আসে। ফলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে AI-উৎপাদিত তথ্যও ডিজিটাল রেকর্ড হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য।
আরও পড়ুন : ডিজিটাল সাক্ষ্য–সংক্রান্ত শেষ পর্ব: ভার্চুয়াল শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া
তাই, AI-প্রক্রিয়াজাত কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হলে ৬৫খ-এর শর্তাবলি পূরণ হয়েছে কি না তা বিবেচনা করতে হবে। ডিপফেকের অপব্যবহার রোধে ধারা ৬৫খ(৪)-তে বর্ণিত সার্টিফিকেট আবশ্যিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল সাক্ষ্যের সাথে দাখিল করতে হবে। তাহলে, উপস্থাপিত উপাদানটির উৎস কী, এটি কোন ডিভাইস থেকে এসেছে, কোন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত হয়েছে এবং এর ওপর পরবর্তীকালে কোনো প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ ঘটেছে কি না ইত্যাদি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং উক্ত সাক্ষ্যের উৎস হিসেবে প্রত্যায়নকারীর দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সত্য নির্ধারণের চূড়ান্ত দায়িত্ব এখনো বিচারকের, আইনজীবীর, তদন্তকারীর এবং বিশেষজ্ঞের। কিন্তু সেই সত্যের কাছে পৌঁছানোর পথকে আরও দ্রুত, আরও সুসংগঠিত এবং আরও কার্যকর করে তুলতে AI নিঃসন্দেহে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। সেই যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সত্যকে শক্তিশালী করা, কিন্তু প্রযুক্তির তৈরি মায়াজালে সত্যকে হারিয়ে না ফেলা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ডিজিটাল সাক্ষ্য ও ডিজিটাল সাক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, ব্যবহার কৌশল, এগুলো সংক্রান্ত আইনের ব্যাখ্যা, উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক, বিভিন্ন প্রকার ডিজিটাল রেকর্ড সম্পর্কে ধারণা ও সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার পদ্ধতি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন লেখকের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ “আদালতে ডিজিটাল সাক্ষ্য: তত্ত্ব ও ব্যবহারবিধি”-তে।
লেখক: মতিউর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পাবনা।

