ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তামিমা সুলতানা
ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তামিমা সুলতানা

বিয়ে করে অপরাধ করেননি নাসির ও তামিমা, খালাসের রায়

আইনগতভাবে বিচ্ছেদের আগেই নতুন করে বিয়ে করার অভিযোগে দায়ের করা মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন ক্রিকেটার নাসির হোসন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মি।

ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম বুধবার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

ব্যাভিচারের অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেছিলেন তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হোসেন। বিচার শুরুর চার বছরের বেশি সময় পর সেই অভিযোগ খারিজ করে দিল আদালত।

রায় ঘোষণার সময় নাসির হোসেন ও তামিমা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। খালাসের রায় শুনে প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে আদালতপ্রাঙ্গণ ছাড়েন তারা।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নাসির ও তামিমার আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছেন যে সকল ফাইন্ডিংসের আলোকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল যে, তালাকটা সঠিকভাবে কার্যকর হয়েছে।”

অন্যদিকে মামলার বাদী রাকিব হাসানের আইনজীবী ইশরাত হাসান রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জুডিসিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই না করে এ ধরনের রায় দেওয়ায় আমরা সংক্ষুদ্ধ। আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

মামলা বৃত্তান্ত

মামলায় বলা হয়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের আট বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। কিন্তু রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসির বিয়ে করেন।

২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা রাকিবের নজরে আসে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তিনি এই মামলা দায়ের করেন।

সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর নাসির, তামিমা ও তার মা সুমি আক্তারকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান।

২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে নাসির ও তামিমার বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। তবে নাসিরের শাশুড়ি সুমি আক্তারকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ওই বছরের ৬ মার্চ মহানগর দায়রা আদালতে নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন করেন তাদের আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ হিরু।

অন্যদিকে সুমি আক্তারকে অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দায়ের করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান।

২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুটো আবেদনই আদালতে নাকচ হয়ে যায়। ফলে নাসির-তামিমার বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনি বাধা কাটে। সে বছর ২০ মার্চ বাদী রাকিবের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। সব মিলিয়ে ১০ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত। এরপর গত ১০ মার্চ আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি হয়। শুনানিতে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।

গত ৩০ মার্চ নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের সাবেক বিমানবালা তামিমা। তিনি দাবি করেন, ‘সাংসারিক এবং মানসিক বনিবনা’ না হওয়ায় আগের স্বামী রাকিবকে তালাক দিয়ে বৈধভাবেই তিনি ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন।

ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই ধারায় এবং তামিমার বিরুদ্ধে আলাদা তিন ধারায় অভিযোগ গঠন করে এ মামলার বিচার চলে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসিরের সর্বোচ্চ সাত বছরের এবং তামিমার সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত। তবে আদালতের বিচারে তারা দুজনেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

কার কী প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মামলার বাদী রাকিব হোসেন বলেন, “আজকে রায় ঘোষণার সময় জজ সাহেব যা বলছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, এটা পূর্ব পরিকল্পিত। দুই তিনটা কথা বলেই রায় দিয়েছেন। মামলায় বিভিন্ন এভিডেন্স ছিল, ১০ জন সাক্ষী ছিল, তার কিছুই পড়ে শোনাননি। আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট না।

আমরা শতভাগ শিওর ছিলাম যে ন্যায়বিচার পাব। কারণ আমরা আদালতে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণ করেছি, তারা অপরাধ করেছে। তবে আমি আগেও আপাকে (আইনজীবী ইশরাত হাসান) বলছি, তারা ক্ষমতাধর, বর্তামান বিসিবি প্রধান তার (নাসিরের) বন্ধু । তাদের লিংক লবিং অনেক। তাদের একটা ফোন কলেই অনেক কিছু হবে, যেটা আমরা হাজার বার দৌঁড়ালেও হবে না। এর পরেও আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কোর্টে এসেছিলাম, কিন্তু সেটা হল না।

রাকিবের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “রাকিব হাসান প্রথম থেকে বলেছেন, তার যেহেতু টাকা নাই, বিচারও নাই। তারপরও আমরা তাকে আশ্বস্ত করি। আদালত মামলাটি সরাসরি আমলে নেয়নি, পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ায় পিবিআই তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে।

১০ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তামিমা সাফাই সাক্ষ্য দিলে তাকে জেরা করি। জেরায় তামিমা অনেক কিছু স্বীকার করেছেন। কিন্তু আদালত আজ দুজনকেই খালাস দিয়েছেন, অপারেটিভ বিষয়গুলো বলেছেন। বিস্তারিত রায় আমাদের হাতে নেই।

রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এ আইনজীবী বলেন, “পিবিআইয়ের তদন্ত রিপোর্টে এসেছিল, তামিমা সুলতানা বাদী রাকিব হাসানকে ডিভোর্স না দিয়ে নাসির হোসেনকে বিয়ে করেছেন। ২০১৬ সালের যে ডকুমেন্টগুলো, সেগুলো সব জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা।

তার সপক্ষে ডাক বিভাগের ডিজিএম সাক্ষ্য দিতে আদালতে এসে বলেছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছেন। তদন্ত করে দেখেছেন, সেই ডাক রশিদগুলো ডাক বিভাগেরই না। এখানে সুস্পষ্ট জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। জাল কাগজ সৃজন করার বিষয়ে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের একাধিকবার সম্পর্কের বিভিন্ন রকম তথ্য-প্রমাণ সবকিছুই আদালতের কাছে আছে।

রাকিবের আইনজীবী বলেন, “দুইজন চেয়ারম্যান আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে বলেছেন, তারা কোনো ধরনের নোটিস (তালাক নোটিস) পাননি। তামিমা সুলতানা জেরায় বলেছেন, সিটি করপোরেশ বা চেয়ারম্যানকে কোনো ধরনের নোটিস পাঠাননি।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, কোনো নোটিস না পাঠিয়ে, জাল ডকুমেন্ট তৈরি করলেই যদি খালাস পাওয়া যায়, তাহলে এ ধরনের দৃষ্টান্ত আসলে সমাজের জন্য ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাই আমরা মামলার রায় বিস্তারিত আসামাত্র রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব। আমরা মনে করি, আসামিদের প্রকৃত বিচার হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন : বার কাউন্সিলের প্রথম রিভিউয়ের ফল বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা হাইকোর্টের

অন্যদিকে নাসির ও তামিমার আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “তালাক কার্যকরের ক্ষেত্রে মূল উপাদান হল হাজবেন্ড ওয়াইফের মধ্যে কন্ডাক্ট, অর্থাৎ তালাক দেওয়ার পর তারা আলাদা থাকে কিনা এবং তাদের কনজুগাল লাইফ হয় কিনা এই সকল বিষয়ের উপর।

উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে আদালত ফাইন্ডিংস দিয়ে বলেছেন যে তামিমা ২০১৬ সালে তালাক দিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার পর নাসিরের সহিত বিবাহ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কতদিন বাংলাদেশে এসেছেন, এটা বাদী কিংবা বাদীর যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেউই জানেন না।

তিনি বলেন, “তার মানে হল, এই যে আচরণ, আচরণটার কারণে এবং একই সাথে অন্যান্য ফাইন্ডিংস যে ১৪/০২/২০২১ তারিখ রাত্রি ৮ ঘটিকায় বাদী তার নিজ বাসভবনে যে ঘটনাস্থলে ঘটনার কথা বলেছেন সেই ঘটনাস্থলে উভয় আসামির কোনো আসামি যান নাই।

ফলে একটি মামলার মূল উপাদান যে কয়েকটি, তার মধ্যে প্লেস অফ অকারেন্স, টাইম অফ অকারেন্স এবং ম্যানার অফ অকারেন্স… যে জায়গায় ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেই জায়গায় নাসির কিংবা তামিমা কোনো দিনেই যান নাই, তাহলে অপরাধ হয় কী করে? এই ফাইন্ডিংস দিয়ে মাননীয় আদালত উভয় আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

তালাকের আইনি বৈধতা নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, তালাক বৈধ কি বৈধ না, এটা সিভিল আদালতের বিষয়। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায়ের কথা তারা শুনানিতে বলেছিলেন।

উচ্চ আদালতের সেই রায়ে বলা হয়েছে, তালাক নোটিস শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট না পৌঁছানো মানে এই নয় যে তালাক হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আচরণ বা কন্ডাক্ট দেখে বুঝতে হবে তাদের মধ্যে তালাকের কার্যকারিতা হয়েছে কি না।

সেই হিসাবে ক্রিকেটার নাসির হোসেনের যে বর্তমান স্ত্রী, মানে তামিমা সুলতানা, তার সাথে যে বাদী রাকিব হোসেনের বিবাহের যে এক্সিস্টেন্সের কথা তারা বলেছে, এইটা টেকে না। বরং নাসির হোসেনের সাথে তামিমা সুলতানার বিবাহ যে বৈধ, সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আদালতে নাসির ও তামিমা

আলোচিত এ মামলার রায় শুনতে সকাল থেকেই সাংবাদিকরা আদালতপাড়ায় ভিড় করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত থেকে জানানো হয়, দুপুর ১২টায় রায় ঘোষণা হবে।

বেলা পৌনে ১২টার দিকে তামিমাকে নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন নাসির। নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের এজলাসে তুলে দিয়ে আসেন।

তারা এজলাসে গিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। আইনজীবী, সাংবাদিক, আসামিদের স্বজনসহ উৎসুক জনতার ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে এজলাস।

বিচারক তখন প্রকাশ্য আদালতে জানান, রায় ঘোষণা করা হবে বেলা সাড়ে ১২ টায়। সাংবাদিকরা তখন এজলাসের সামনে বারান্দায় অবস্থান নেন।

তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই বেলা ১২টা ১০ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে নাসির ও তামিমার খালাসের রায় দেন বিচারক জশিতা ইসলাম।

রায় শুনে আইনজীবীরা আদালত থেকে বের হওয়া শুরু করেন। তারা বলতে থাকেন ‘খালাস, খালাস’। এরপর তাদের কাছ থেকেই সাংবাদিকরা খালাসের রায়ের কথা জানতে পারেন। নাসির ও তামিমা তখনও ভেতরে ছিলেন।

তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়। সোয়া ১২টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এজলাস থেকে বেরিয়ে আসেন নাসির। পরে তামিমাও বের হন।

এ সময় কিছুটা পেছনে পড়ে যান তামিমা। আদালতের চতুর্থ তলা থেকে এক সিঁড়ি নেমে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যান নাসির। হাত দিয়ে তামিমাকে ডাকতে থাকেন।

এর মাঝে তৃতীয় তলায় পৌঁছে দাঁড়িয়ে থেকে তামিমাকে কাছে টেনে নেন নাসির। পরে ভিড়ের মধ্যে একসাথে নেমে আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়েন তারা।

নাসির ও তামিমার সঙ্গে তাদের কয়েকজন আত্মীয়ও আদালতে এসেছিলেন । তাদের মধ্যে নাসিরের একজন ‘বড় ভাই’ও ছিলেন।

নাসির ও তামিমা এজলাসের ভেতর প্রবেশের পর তারা আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সে সময় নাসিরের ভাই হঠাৎ টের পান, তার মানিব্যাগ হাওয়া।

পরে তিনি বলেন, “ভিড়ের মধ্যে মানিব্যাগ নেই। ৭/৮ হাজার টাকা মানিব্যাগে ছিল।”

তবে নাম জানতে চাইলে বলতে চাননি তিনি।