চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, চাঁদপুর
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, চাঁদপুর

৩৩ বিবাহ নিবন্ধনে সাক্ষীর স্বাক্ষর গায়েব: চাঁদপুরে কাজীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ আদালতের

কোর্ট রিপোর্টার, চাঁদপুর | চাঁদপুর পৌরসভার ১৫ নং ওয়ার্ডের এক মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধকের (কাজী) সংরক্ষিত সরকারি বালাম বই পর্যালোচনায় ৩৩টি বিবাহ নিবন্ধনে সাক্ষীর স্বাক্ষর সংক্রান্ত ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ মেলায় তাঁর বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন আদালত। চাঁদপুরের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহ এক আদেশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এই সুপারিশ পাঠান।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন একটি মামলার শুনানিকালে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেন যে, চাঁদপুর পৌরসভার ১৫ নং ওয়ার্ডের কাজী মৌলানা মো. ইসমাইল খান আইনের তোয়াক্কা না করে সাক্ষীদের কোনো প্রকার স্বাক্ষর ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিবাহ নিবন্ধন সম্পন্ন করে আসছেন। এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে আদালত সংশ্লিষ্ট কাজীর কার্যালয়ের মূল বালাম বই তলব করলে কাজী বালামসহ সশরীরে আদালতে হাজির হন।

মূল বালাম বই জব্দ ও অনিয়মের খতিয়ান

শুনানি চলাকালীন আদালত কাজীর উপস্থিতিতেই বালাম বইয়ের পাতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন। এই সময় বিবাহ নিবন্ধনে নজিরবিহীন আইনি অনিয়ম ও খামখেয়ালিপনার প্রমাণ মিললেও কাজী তার কোনো সদুত্তর বা আইনগত ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। ফলে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে কাজীর ‘০২ নম্বর বালাম বই (২০২৪ সাল)’ জব্দ করার নির্দেশ দেন।

জব্দকৃত বালাম বই পর্যালোচনা করে আদালত মোট ৩৩টি পৃষ্ঠায় বা বিবাহ নিবন্ধনে প্রধান সাক্ষীদের স্বাক্ষর সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়ম ও আইনি ত্রুটি খুঁজে পান:

  • স্বাক্ষরবিহীন পাতা (১৫টি): বালাম বইয়ের ১৪, ৩৭, ৩৮, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৬৫, ৭০, ৭২, ৭৯, ৮১, ৮২, ৮৬ ও ১০০ নম্বর পাতায় সাক্ষীর স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থানে কোনো ধরনের স্বাক্ষরই পাওয়া যায়নি।

  • একটি করে স্বাক্ষরযুক্ত পাতা (২০টি): বালামের ১৬, ২১, ২৫, ৩০, ৪১, ৪৫, ৫৯, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৭, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৮৩, ৮৪, ৮৫, pilgrims ৯২, ৯client৫ ও ৯৭ নম্বর পাতায় আইন অনুযায়ী দুই জন সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র একটি করে স্বাক্ষর।

মুসলিম আইনের ব্যত্যয় ও পেশাগত অসদাচরণ

বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহ তাঁর আদেশের পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত কঠোরভাবে উল্লেখ করেন— মুসলিম পারিবারিক আইন ও শরিয়ত অনুযায়ী, একটি বিবাহের আইনি ও ধর্মীয় বৈধতার জন্য পূর্ণবয়স্ক দুই জন পুরুষ সাক্ষী অথবা এক জন পুরুষ ও দুই জন নারী সাক্ষীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং বালাম বইয়ে তাঁদের স্বাক্ষর থাকা অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য উপাদান।

সাক্ষীদের যথাযথ স্বাক্ষর গ্রহণ ও যাচাই ছাড়া কাল্পনিকভাবে বিবাহ নিবন্ধন করা ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৯’-এর বিধি ২২-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সাথে এটি উক্ত বিধিমালার বিধি ১১ অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে ‘পেশাগত অসদাচরণ’ (Professional Misconduct) হিসেবে গণ্য হয়।

পরবর্তীতে এই বিষয়ে আদালতের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ দেওয়া হলে অভিযুক্ত কাজী মৌলানা মো. ইসমাইল খান লিখিত জবাবে নিজের অপরাধ আড়াল করতে পুরো বিষয়টিকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে দাবি করেন এবং আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

তবে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজী হিসেবে শরীয়া আইন ও রাষ্ট্রীয় বিধিমালার এমন চরম অবমাননার ব্যাখ্যাকে কোনোভাবেই সন্তোষজনক বা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি আদালত। এর প্রেক্ষিতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহ— অভিযুক্ত কাজী মৌলানা মো. ইসমাইল খানের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর সুপারিশপত্র ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্রের অনুলিপি প্রেরণের নির্দেশ দেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তৃণমূল পর্যায়ে কাজীদের এমন খামখেয়ালিপনার কারণে অসংখ্য নারীরা পরবর্তীতে দেনমোহর ও পারিবারিক অধিকারের আইনি লড়াইয়ে জটিলতায় পড়েন। আদালতের এমন কঠোর বিচারিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে বিবাহ নিবন্ধন কার্যক্রমে পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও জনআস্থা ফিরে আসবে। একই সাথে এটি সারা দেশের অন্যান্য কাজী ও নিবন্ধন কর্মকর্তাদের জন্য আইন যথাযথভাবে অনুসরণের একটি কঠোর বার্তা হয়ে থাকবে।