মোরশেদ কামাল
মোরশেদ কামাল

রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার ও সংসদ সদস্যপদ: সাংবিধানিক বিতর্ক, দলীয় শৃঙ্খলা ও জনপ্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন

মো. মোরশেদ কামাল : বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের একজন সদস্য শুধু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেই তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না। নির্বাচিত হওয়ার জন্য যেমন কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়, তেমনি কিছু অযোগ্যতার কারণও রয়েছে, যার ফলে তিনি প্রার্থী হতে পারেন না বা নির্বাচিত হওয়ার পরও সংসদ সদস্যপদ হারাতে পারেন। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত একজন সদস্যের ওপর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এসব বিষয় নিয়েই বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রণয়ন করেছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(২) শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতাই নির্ধারণ করেনি, বরং একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি ওই অনুচ্ছেদে বর্ণিত কোনো অযোগ্যতার মধ্যে পড়েন, তাহলে তাঁর সদস্যপদও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি উপযুক্ত আদালতের রায়ে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, দেউলিয়া হয়ে আইনগতভাবে অব্যাহতি না পান, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন, নৈতিক স্খলনসংক্রান্ত অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন (এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিক্রম না করে), Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order, 1972-এর অধীনে দণ্ডিত হন, প্রজাতন্ত্রের অধীনে লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকেন অথবা অন্য কোনো আইনের অধীনে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না।

৬৬(২ক) কেন আনা হয়েছে? বাস্তবে অনেক জন্মসূত্রে বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেন। পরে কেউ কেউ—বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন, অথবা আবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। প্রশ্ন হলো—তাঁরা কি সারাজীবনের জন্য MP হওয়ার অযোগ্য থাকবেন? এই সমস্যার সমাধান করতেই অনুচ্ছেদ ৬৬(২ক) যুক্ত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬৬(২ক) অনুযায়ী—জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ বা পুনরায় বাংলাদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে, MP হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে তাঁকে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জনকারী হিসেবে ধরা হবে না।

সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্যের যোগ্যতা বা সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা নির্বাচন কমিশন নিষ্পত্তি করবে। তবে এই বিরোধ নির্বাচন কমিশনের কাছে কে পাঠাবেন, সে বিষয়ে সংবিধান নীরব। এ শূন্যতা পূরণ করেছে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ নম্বর বিধি, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, স্পিকারই বিরোধটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাবেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ ও অনুচ্ছেদ ৭০ সংসদ সদস্যের যোগ্যতা, অযোগ্যতা এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁর আসন শূন্য হবে, সে বিষয়ে মৌলিক বিধান নির্ধারণ করেছে। তবে এসব বিধান বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তার প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির (Rules of Procedure) ১৭৮ নম্বর বিধি।

বিরোধ হলে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন

কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি প্রশ্ন ওঠে যে তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(২)-এ বর্ণিত কোনো অযোগ্যতার মধ্যে পড়েছেন, অথবা অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হওয়া উচিত কি না—তাহলে সেই বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রেরণ করবেন।

নির্বাচন কমিশন যদি সিদ্ধান্ত দেয় যে সংশ্লিষ্ট সদস্য অযোগ্য হয়েছেন বা তাঁর আসন শূন্য হওয়া উচিত, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর পদ হারাবেন।

পদত্যাগ বা অন্য কারণে সদস্যপদ শেষ হলে স্পিকারের করণীয়

কোনো সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে, অথবা সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ কার্যদিবস অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকলে, কিংবা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৭(১)(ক) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ গ্রহণে ব্যর্থ হলে অথবা অন্য কোনো কারণে সংসদ সদস্যপদ হারালে, স্পিকার সেই বিষয়টি সংসদকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবেন।

যদি তখন সংসদের অধিবেশন চলমান না থাকে, তাহলে পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পিকার সংসদকে জানাবেন যে, অধিবেশন বিরতির সময় সংশ্লিষ্ট সদস্য পদত্যাগ করেছেন বা অন্য কোনো কারণে তাঁর সদস্যপদ শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে, অনুচ্ছেদ ৭০ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এটি প্রার্থীর যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নয়; বরং কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য দলত্যাগ করলে বা সংসদে নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে—এই সাংবিধানিক বিধান নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, অনুচ্ছেদ ৬৬(২) একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য কি না এবং নির্বাচিত হওয়ার পর সেই যোগ্যতা বজায় রেখেছেন কি না, তা নির্ধারণ করে। আর অনুচ্ছেদ ৭০ নির্ধারণ করে, দলীয় আনুগত্য ভঙ্গের কারণে কখন একজন সংসদ সদস্য তাঁর সদস্যপদ হারাবেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে “দলত্যাগ” (resigns from that party) এবং “দলের বিরুদ্ধে ভোটদান” (votes in Parliament against that party)-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭০ অনুচ্ছেদ আসলে প্রয়োজন ছিল। আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রস্তাবের আলোচনায় কেন এ-ধরনের একটি বিধান সংবিধানে রাখা হচ্ছে সেই ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘সংসদীয় পদ্ধতি যদি সঠিকভাবে চালাতে হয়, তাহলে পার্টি-পদ্ধতির প্রয়োজন আছে। সেখানেই গণতন্ত্র সফল হয়েছে, যেখানেই সুষ্ঠু পার্টি-পদ্ধতি আছে।’ ড. কামাল বলেন, ‘যদি কেউ একটি দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা করে নির্বাচিত হন, তাহলে তিনি সংসদে নিজ দায়িত্ব পালন করার সময় দলের শৃঙ্খলা ও দলীয় নির্দেশ অনুযায়ী সব কিছু করবেন। কেননা, এটার যদি আরও একটু ব্যাখ্যা দিতে হয়, তাহলে যখন তিনি জনসাধারণের কাছে ভোট দাবি করেছেন, তিনি যখন এক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন, তখন সেই পার্টির মেনিফেস্টো এবং সমর্থন নিয়েই তিনি উপস্থিত হয়েছেন এবং সেটাকে ভিত্তি করেই তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন।’ অতএব, তাঁর মতে, এই বিধান ‘অগণতান্ত্রিক মোটেও নয়’। (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পক্ষে বিপক্ষে বই থেকে সংগৃহীত)।

কোনো সংসদীয় আসন শূন্য হলে জাতীয় সংসদের সচিব সরকারি গেজেটে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করবেন। একই সঙ্গে ওই প্রজ্ঞাপনের একটি অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সাবেক সংসদ সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে, যাতে কমিশন শূন্য আসনে উপনির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ নম্বর বিধি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা, সদস্যপদ শূন্য হওয়া এবং শূন্য আসনে নির্বাচন আয়োজন—পুরো প্রক্রিয়ায় স্পিকার, নির্বাচন কমিশন এবং সংসদ সচিবালয়ের পৃথক ও নির্দিষ্ট সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে।

একই সঙ্গে সংবিধানের ৬৬(৫) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রণীত Members of Parliament (Determination of Dispute) Act, 1980-এ ও স্পিকারকে বিরোধের বিবরণ প্রস্তুত করে তা নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। Members of Parliament (Determination of Dispute) Act, 1980-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(৪)-এর আওতায় কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে স্পিকারকে ৩০ দিনের মধ্যে সেই বিরোধ সম্পর্কিত একটি বিবরণী (Statement) প্রস্তুত করতে হবে। এই বিবরণীতে বিরোধের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য, যে সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে তাঁর নাম ও ঠিকানা এবং যে ব্যক্তি বিরোধটি উত্থাপন করেছেন তাঁর নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। আইনে এই উভয় পক্ষকে বিরোধের পক্ষ (Parties to the Dispute) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এরপর স্পিকার ওই বিবরণী নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রেরণ করবেন, যাতে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিরোধটি শুনানি করে নিষ্পত্তি ও সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে। আইন অনুযায়ী, স্পিকারের কাছ থেকে বিরোধের বিবরণ পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে সেই বিবরণ পাঠায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের লিখিত বক্তব্য দাখিল করতে বলে।

অর্থাৎ, কোনো সংসদ সদস্যের যোগ্যতা, অযোগ্যতা বা সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন নিজ উদ্যোগে বিচার শুরু করে না; বরং আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারে স্পিকারের রেফারেন্সের মাধ্যমেই নির্বাচন কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এই বিধান সংসদ, স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করে।

সংসদ সদস্যের যোগ্যতা, অযোগ্যতা বা অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী আসন শূন্য হওয়ার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে কাজ করে না; আইন তাকে গুরুত্বপূর্ণ আধা-বিচারিক (quasi-judicial) ক্ষমতা প্রদান করেছে। Members of Parliament (Determination of Dispute) Act, 1980-এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, এ ধরনের বিরোধের শুনানি ও নিষ্পত্তির সময় নির্বাচন কমিশন দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908) অনুযায়ী একটি দেওয়ানি আদালতের (Civil Court) সমপর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—কোনো ব্যক্তিকে সমন জারি করে হাজির করা এবং শপথের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব ও দাখিলের নির্দেশ দেওয়া, হলফনামার (Affidavit) মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ, সাক্ষী বা নথি পরীক্ষা করার জন্য কমিশন (Commission) ইস্যু করা এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য ক্ষমতা প্রয়োগ করা। শুধু তাই নয়, একই আইনের ৫(২) ধারায় আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সামনে পরিচালিত এ ধরনের কার্যক্রম Penal Code, 1860-এর ১৯৩ ধারার অর্থে একটি “Judicial Proceeding” বা বিচারিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হবে। এর অর্থ হলো, এই শুনানিতে কেউ মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রমাণ উপস্থাপন করলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

অতএব, সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা বা আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেবল মতামত প্রদান বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আইন তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ক্ষমতা দিয়েছে, যাতে ন্যায়সংগত শুনানির মাধ্যমে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়।

দল থেকে বহিষ্কার কি সংসদ সদস্যপদ বাতিলের কারণ?

বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদে এ প্রশ্নটি প্রথম বড় আকারে সামনে আসে তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে। ২০১৪ সালে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ তাঁকে দল এবং দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে। এর পরপরই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে—কেবল দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণেই কি একজন সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায়?

আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে স্পিকারের কাছে আবেদন জানালে স্পিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের মতামত চান। দলটির বক্তব্য ছিল, যেহেতু লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাই সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর অবস্থান বহাল রাখার আইনগত ভিত্তি আর নেই। অন্যদিকে, লতিফ সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনের কাছে যুক্তি দেন যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ ও অনুচ্ছেদ ৭০-এ সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার যেসব কারণ নির্ধারণ করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তার কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। তিনি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েরও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে—দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া মাত্রই কোনো সদস্যের আইনসভার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। তবে এই সাংবিধানিক বিতর্কের কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি তখন হয়নি। কারণ, নির্বাচন কমিশনের শুনানি শুরু হওয়ার আগেই লতিফ সিদ্দিকী স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে দল থেকে বহিষ্কার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের কারণ কি না—এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নটি আজও বিচারিকভাবে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সম্প্রতি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনায় একই প্রশ্ন আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জামায়াতে ইসলামী তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগ তুললেও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ) স্পষ্টভাবে বলছে, কেবল নৈতিক স্খলনসংক্রান্ত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন। ফলে আদালতের দণ্ড ছাড়া শুধু দলীয় অভিযোগ বা বহিষ্কারের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। এখানেই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-এর ভাষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য “দল থেকে পদত্যাগ করলে” (resigns from that party) অথবা “সংসদে নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে” (votes in Parliament against that party) তাঁর আসন শূন্য হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনুচ্ছেদটিতে কোথাও “দল থেকে বহিষ্কার” (expulsion) শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। সংবিধানের ভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে দলত্যাগ এবং দল থেকে বহিষ্কার এক নয়। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য দলের সমর্থন, আস্থা ও রাজনৈতিক পরিচয় হারান। এ কারণেই একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে আসে—যে যুক্তিতে স্বেচ্ছায় দলত্যাগকে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, একইভাবে দল থেকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রেও কি সেই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত? তাই প্রশ্ন ওঠে—সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে কি কেবল এর আক্ষরিক ভাষা (literal interpretation) অনুসরণ করা হবে, নাকি এর উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে (purposive interpretation) বিবেচনায় নেওয়া হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সংবিধানে স্পষ্টভাবে দেওয়া নেই। তার নিষ্পত্তি অনেকাংশেই নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের বিচারিক পর্যালোচনায় সুপ্রিম কোর্ট যে ব্যাখ্যা প্রদান করবেন, তার ওপর।

বঙ্গবন্ধু হঠাৎ ৭০ অনুচ্ছেদের মতো বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেননি। সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৭২ সালে গণপরিষদ গঠনের সময়ই রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সদস্যের সদস্যপদ হারানো সম্পর্কিত ধারণার প্রকাশ ঘটে। ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল সংক্রান্ত আদেশ ‘The Bangladesh Constituent Assembly Members (Cessation of Membership) Order, 1972’ জারি করা হয়। এই আদেশে গণপরিষদ সদস্যদের সদস্যপদ হারানোর শর্তের মধ্যে রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা বহিষ্কৃত হওয়ার শর্তের উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, কোনো সদস্য যে দলের মনোনয়ন নিয়ে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি যদি সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন বা দল থেকে বহিষ্কৃত হন তাহলে তাঁর গণপরিষদের সদস্যপদ শূন্য বলে ঘোষিত হবে। আদেশে ব্যাখ্যা করা হয়, ‘যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার উপর পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে যে ব্যক্তি নির্বাচনের ভিত্তিতে গণপরিষদ সদস্য হয়েছেন এবং যে রাজনৈতিক দলের টিকেটে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন সেই রাজনৈতিক দল থেকে তিনি পদত্যাগ করলে অথবা তাঁকে দল থেকে বহিষ্কৃত করা হলে তাঁর গণপরিষদ সদস্য বাতিল হয়ে যাবে। এই শর্ত সম্পর্কে তখন প্রতিবাদ বা বিরোধিতা হয়নি। বরং ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়ী কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনকারীদের গণপরিষদ সদস্যপদ বাতিলের জন্য এই শর্তের প্রতি প্রবল জনমত ছিল। এর পূর্বে ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আইয়ুবের ১৯৬২ সালের সংবিধানের ওপর যে সংশোধনী প্রস্তাব করা হয় তাতে দলের টিকেটে নির্বাচিত হয়ে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দল থেকে বহিষ্কৃত হলে বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিলের শর্ত ছিল। (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পক্ষে বিপক্ষে বই থেকে সংগৃহীত)।

দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত নিবন্ধে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেন,

“বাংলাদেশের সংবিধান একটি মৌলিক বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। বিতর্কটি হলো, পার্টি না পার্লামেন্ট কোনটি সার্বভৌম? সমালোচনাকারীরা যুক্তি দেখাচ্ছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই যে-কোন পার্লামেন্ট-সদস্য পার্লামেন্ট থেকেও বহিষ্কৃত হবেন, সংবিধানে এই বিধান থাকার দরুন পার্লামেন্টের তুলনায় পার্টি সার্বভৌম শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এটা গণতান্ত্রিক নীতির বরখেলাপ। আপাতদৃষ্টিতে সমালোচনাকারীদের যুক্তিই টেকসই মনে হয়। কিন্তু একটু খতিয়ে বিষয়টি চিন্তা করলে দেখা যাবে, আধুনিক যুগে পার্লামেন্টারী পার্টি ও প্যারেন্ট পলিটিক্যাল অর্গানাইজেসনের মধ্যে অহরহ যে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং যে বিরোধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে পার্লামেন্টারী পার্টি বা তার নেতা প্যারেন্ট অর্গানাইজেসনকে মুঠোয় পুরে গণতন্ত্রকেই কবর দেয়, বাংলাদেশে তার পুনরভিনয় রোধ করার জন্যই সম্ভবতঃ অনেক ভেবেচিন্তে এই বিধানটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং পার্লামেন্টারী পার্টির উপরে মূল রাজনৈতিক দল বা প্যারেন্ট অর্গানাইজেসনের কর্তৃত্ব অপ্রতিহত হবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা আমাদের সকলের কাম্য হওয়া উচিত। তবু যারা ধূয়া তুলেছেন যে, দল থেকে বহিষ্কারের অর্থ পার্লামেন্ট থেকে বহিষ্কার-এই ব্যবস্থা দ্বারা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে, তাঁদের কাছেই আমার প্রশ্ন, পার্লামেন্টে ফ্লোর ক্রসিং বা দল বদলালে সদস্যপদ খারিজ হওয়ার বিধান দ্বারা যদি পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ না হয়, তাহলে প্যারেন্ট অর্গানাইজেসন হতে বহিষ্কারের ফলে পার্লামেন্টের সদস্যপদ খারিজ হওয়ার বিধান দ্বারা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় কিভাবে? সমালোচনাকারীরা যুক্তি তুলেছেন, রাজনৈতিক দল পার্লামেন্টের অংশ নয়। তাহলে পার্লামেন্টের ভেতরে পার্লামেন্টারী দলগুলো পার্লামেন্টের বাইরের প্যারেন্ট অর্গানাইজেসন বা মূল দলের আনুগত্য পোষণ করে কিভাবে এবং সেই দলের টিকেটেই বা তাঁরা পার্লামেন্টে সদস্য নির্বাচিত হন কিভাবে? আসলে পার্লামেন্টারী বা সংসদীয় রাজনীতিতে পার্লামেন্ট, পার্লামেন্টারী দল, মূল রাজনৈতিক দল পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এবং পরস্পরের পরিপূরক।

বাংলাদেশের সংবিধানে পার্লামেন্টারী দলের উপর মূল রাজনৈতিক দলের প্রাধান্য স্থাপন দ্বারা গণতন্ত্র রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদকে রোখার ব্যবস্থাই করা হয়েছে। এজন্যে সংবিধান প্রণেতারা দেশের সচেতন ও গণতন্ত্রমনা নাগরিকদের অভিনন্দন লাভের যোগ্য।

মূল রাজনৈতিক দলের বা প্যারেন্ট অর্গানাইজেসনের উপরে পার্লামেন্টারী দল বা তার সদস্যরা সর্বেসর্বা হয়ে উঠলে একটা দেশে গণতন্ত্রের কি বিপদ হতে পারে সাবেক পাকিস্তানে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দীন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন প্রধানমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সরকারী আমলা বা বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ তাকে বরখাস্ত করেন এবং পরিষদের সদস্য নয় এমন এক ব্যক্তি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। মন্ত্রিত্ব, উচ্চ পদ ও অন্যান্য সরকারী সুযোগ-সুবিধার লোভে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী দল বিনা প্রতিবাদে খাজা নাজিমুদ্দীনের পদত্যাগ মেনে নেয় এবং বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে। এই সময় খাজা নাজিমুদ্দীন মুসলিম লীগেরও সভাপতি ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের সভাপতিরূপে তিনি পার্লামেন্টারী দলের সদস্যদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ প্রতিহত করবেন, এমন কোন ক্ষমতা তাঁর ছিল না। বরং পার্লামেন্টারী দলই কিছুদিনের মধ্যে তাঁকে সভাপতির পদ থেকে তাড়িয়ে বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে সে পদেও বসিয়ে দেয়। সেই থেকে পার্লামেন্টের বাইরে মুসলিম লীগের কোন রাজনৈতিক ভূমিকা, মর্যাদা ও অস্তিত্ব রইল না। মুসলিম লীগ হয়ে দাঁড়াল তার পার্লামেন্ট সদস্যদের সাবসারভিয়েন্ট বা দাসানুদাস সিল মোহর। এইভাবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রকৃত মুসলিম লীগের অপমৃত্যু ঘটে। দলের ননপার্লামেন্টারী উইং থেকে পার্লামেন্টারী উইং শক্তিশালী হয়ে উঠলে বহু দেশে-বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়তে দেখা গেছে। স্বাধীনতা লাভের পর সংসদীয় বা পার্লামেন্টারী প্রথায় যাত্রা শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, ঘানার নক্রুমা, কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা যে পরে একনায়ক হয়ে উঠলেন, তার বড় কারণ, অনুন্নত দেশে এক ব্যক্তির মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা। পদ্ধতির চাইতে এখানে ব্যক্তি বড়। ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার রোধের জন্য তাই দলের পার্লামেন্টারী উইং ও ননপার্লামেন্টারী উইংয়ের মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্যারেন্ট অর্গানাইজেসনের অধিকতর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা থাকা উচিত। বাংলাদেশের সংবিধানে এই বাস্তবতা স্বীকৃত হওয়ায় গণতন্ত্রমনা মানুষের আনন্দিত হওয়া উচিত।” (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পক্ষে বিপক্ষে বই থেকে সংগৃহীত)।

এক নজরে ৭০ অনুচ্ছেদ: গণপরিষদের বিতর্কে যা উঠে এসেছিল

সূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদ কার্যবিবরণী: সংবিধান প্রণয়ন বিষয়ক বিতর্ক (দ্বিতীয় ভাগ), গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: কাওসার আহমেদ।

পরিষদ-বিতর্ক ১৯৭২, সংখ্যা ১৫, বাংলাদেশ গণপরিষদ, বৃহস্পতিবার, ২রা নভেম্বর, ১৯৭২

অনুচ্ছেদ ৭০

জনাব ডেপুটি স্পীকার: ৭০ অনুচ্ছেদ। ৩৪ ‘সিরিয়াল’। শ্রীমানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।

জনাব ডেপুটি স্পীকার: আমি এখানে দেখছি ৩৪-এ কোনো সংশোধনী-প্রস্তাব নাই। কাজেই আপনার এই তথাকথিত সংশোধনী-প্রস্তাব বিধিবহির্ভূত হলো। এখানে কোনো সংশোধনী-প্রস্তাব নাই। আপনি বসুন।

এরপর শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত, ৩৫ নম্বর।

শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত: জনাব ডেপুটি স্পীকার, আমার প্রস্তাবটি হলো এই যে,

“৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক:

‘৭০। কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার পর তিনি যদি উক্ত দল পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে বিধানানুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হইবে।’”

শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত: জনাব ডেপুটি স্পীকার সাহেব, এখানে বাংলার কিছু ভুল রয়েছে। সেটুকু সংশোধন-সাপেক্ষ।

এই অংশটুকু আলোচনা করা সম্পূর্ণ হবে না যদি ৭০ অনুচ্ছেদ পুরাপুরি আপনার সামনে বা আপনার মাধ্যমে হাউসের সামনে না আনি। ৭০-এর মধ্যে এমন একটি অগণতান্ত্রিক বিধান রাখা হয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোনো সংবিধানেই নাই। এই বিধান নিয়ে সেদিন সাধারণ আলোচনার সময়েও বলেছিলাম, এই বিধান পাকিস্তানী ডিক্টেটর আইয়ুব খানের শাসনতন্ত্রেই শুধু আছে এবং এছাড়া আর কোথাও এর নজির নাই। এখানে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ধারাটি সংযোজন করা হয়েছে? ধারাটি অত্যন্ত দীর্ঘ। এটা পড়লে অনেক সময় নষ্ট হবে। আমি শুধু আপনার মাধ্যমে আসল জিনিসটি বলে যাচ্ছি। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য সেই দলের টিকেট নিয়ে পাস করে যদি পরিষদে আসেন এবং সেই পরিষদ-সদস্যকে যদি সেই রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি সদস্য পদ হারাবেন।

দ্বিতীয়ত, যদি কোনো রাজনৈতিক দল থেকে টিকেটে নির্বাচিত সদস্য পরিষদে আসেন এবং এখানে এসে তিনি অন্য দলে যান, তাহলেও তিনি তাঁর সদস্য পদ হারাবেন। এছাড়া আরও কিছু কথা আছে। বহিষ্কারের কথা আগেই বলেছি।

মাননীয় স্পীকার সাহেব, এখানে আমি দেখতে পাচ্ছি, এরপরে আরও একটি সংশোধনী আছে। আমার মনে হয়, অন্তত এর কিছু অংশ হয়তো মাননীয় ভারপ্রাপ্ত সদস্য মেনে নিতে পারবেন।

মাননীয় স্পীকার, স্যার, এ সম্বন্ধে দীর্ঘ বক্তব্যের প্রশ্ন আসে না। এ সম্বন্ধে আমি শুধু একটি বক্তব্য রাখতে চাই। যেহেতু সংশোধনী অনেক গ্রহণ করা হচ্ছে, তাই আমি বলছি, যখন কোনো মাননীয় সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন এবং এখানে এসে যদি তিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে আবার ৯০ দিনের মধ্যে ‘ইলেক্টোরালের’ সামনে যাওয়া উচিত। কিন্তু যদি এই পরিষদে কোনো প্রশ্নে তাঁর মত চাওয়া না হয় এবং তিনি যদি সেই প্রশ্নে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য এবং পছন্দ বিবেচনা করে ভোট দেন; তাহলে তার জন্য তাঁর সদস্য পদ যাওয়া ঠিক হবে না। এটাই আমার বক্তব্য।

জনাব ডেপুটি স্পীকার: জনাব ভারপ্রাপ্ত সদস্য।

ড. কামাল হোসেন (আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী এবং সংবিধান-প্রণয়ন-মন্ত্রী): মাননীয় ডেপুটি স্পীকার সাহেব, মাননীয় সদস্য শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্তের সংশোধনীর মতো আরও একটি সংশোধনী এই অনুচ্ছেদ সম্পর্কে হাউসের সামনে উত্থাপন করা হবে।

আমরা কমিটিতেই গভীরভাবে বিষয়টি বিবেচনা করেছিলাম এবং আলোচনা করেছিলাম যে, এই রকম একটা অনুচ্ছেদ কেন আমরা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করছি। সে আলোচনায় মাননীয় সদস্যও অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, বিশেষ করে সেখানে আমরা যে কয়েকটি কারণে এটা গ্রহণ করেছিলাম, [তা হলো] এই যে, সংসদীয় গণতন্ত্র যদি সঠিকভাবে চালাতে হয়, তাহলে পার্টি-পদ্ধতির প্রয়োজন আছে। সেখানেই গণতন্ত্র সফল হয়েছে, যেখানেই সুষ্ঠু পার্টি-পদ্ধতি থাকে।

হাউস অব কমন্সের ৬৩০ জন মেম্বার দলীয় শৃঙ্খলা মেনে দলবদ্ধভাবে যদি সেখানে কাজ না করে যেতেন, তাহলে সেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র চলতে পারত না এবং যদিও অনেক ‘কনভেনশন’ গড়ে উঠেছে, তবু সংসদীয় গণতন্ত্রে দেখা যায়, যদি কোনো মেম্বার একটি দলের সদস্য হন এবং দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা করেন এবং সেখান থেকে জয়যুক্ত হয়ে সদস্য হন, তাহলে সেখানে তাঁকে দলের শৃঙ্খলা মেনে কর্তব্য পালন করতে হয়।

যেহেতু ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র অলিখিত সেহেতু এগুলো Constitution Act-এ পাওয়া যাবে না। এগুলো ‘কনভেনশন’ আকারে সেখানে আছে। ব্রিটিশ সদস্যদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কতখানি মেনে চলতে হবে সেগুলোও ‘কনভেনশন’ আকারেই আছে।

এ ব্যাপারে আমরা অনেক উদাহরণ দিতে পারব। এই কিছুদিন আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অভ্যন্তরের একজন মেম্বার Labour Party-এর সঙ্গে একমত হতে না পারায় তাঁর উপর থেকে দলীয় সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো এবং এর ফলে তিনি পদত্যাগ করলেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি এখন উপনির্বাচনে যাচ্ছেন।

আজ এটাকে বিলের আকারে দিলে মনে হয়, একটু ব্যাপক। এটা যে সময় আমরা করেছিলাম, সেই সময়েই আমাদের মনে হয়েছিল যে, এটা এর পরে হাউসের সামনে পেশ করা হবে।

আমার মনে হয়, যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই আমরা রাখব—যদিও ‘কনভেনশনে’ আছে, যদি কেউ একটি দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা করে নির্বাচিত হন, তাহলে তিনি সংসদে নিজ দায়িত্ব পালন করার সময় দলের শৃঙ্খলা ও দলীয় নির্দেশ-অনুযায়ী সবকিছু করবেন। কেননা, এটার যদি আরও একটু ব্যাখ্যা দিতে হয়, তাহলে যখন তিনি জনসাধারণের কাছে ভোট দাবি করেছেন, তিনি যখন এক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন, তখন সেই পার্টির মেনিফেস্টো এবং সমর্থন নিয়েই তিনি উপস্থিত হয়েছেন এবং সেটাকে ভিত্তি করেই তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন। কাজেই আমরা মনে করি যে, এটা অগণতান্ত্রিক মোটেও নয়। যদি তিনি এসে সেই দলের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে না পারেন, সেই পার্টির প্রোগ্রাম, সেই পার্টির নির্দেশ না মানতে পারেন, তাহলে তাঁর কাছে নিশ্চয় আশা করা যেতে পারে যে, তিনি আবার জনসাধারণের কাছে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসবেন। কেননা আমাদের এখানে বিধান করা হয়েছে যে, কোনো একটি আসন খালি হলে ৯০ দিনের মধ্যে একটা উপনির্বাচন করতে হবে এবং সেই উপনির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। যদি তিনি পার্টিতে না থাকতে পারেন, যদি পার্টির শৃঙ্খলা মানতে না পারেন, তাহলে তাঁর জনসাধারণের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে আসা উচিত।

বিলে যেটা ছিল, সেটা অত্যন্ত ব্যাপক। এরপরে যে সংশোধনীটা আসবে, সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। আর সুরঞ্জিৎ বাবু যে-সংশোধনী এনেছেন, সেটা অসম্পূর্ণ। যদি কোনো সদস্য হাউসের মধ্যে শৃঙ্খলা না মানেন, দলের মধ্যে থেকে অন্যপথ ধরেন, তাহলে কি হবে, সেটার উল্লেখ সুরঞ্জিৎ বাবুর সংশোধনীতে নাই।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সেটার বিধান থাকতে হবে। তাঁরা আসবেন দলবদ্ধভাবে এবং যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাঁরা সরকার গঠন করবেন এবং অন্যরা বিরোধী-দলে বসবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই সংশোধনী গ্রহণ করা যেতে পারে না।

(অতঃপর অপরাহ্ণ ৪টা ১ মিনিট পর্যন্ত চলার পর পরিষদের কাজ মুলতবী হয়ে যায়।)

(বিরতির পর অপরাহ্ণ ৪টা ১৬ মিনিটের সময় ডেপুটি স্পীকার জনাব মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ্র সভাপতিত্বে পরিষদের কাজ আবার আরম্ভ হয়)

জনাব ডেপুটি স্পীকার: এখন পরিষদের সম্মুখে প্রশ্ন হলো:

“৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক:

‘৭০। কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার পর তিনি যদি উক্ত দল পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে বিধানানুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হইবে।’”

অতএব, সংশোধনী প্রস্তাবটি অগ্রাহ্য হলো।

জনাব ডেপুটি স্পীকার: […] নোয়াখালীর মাননীয় সদস্য জনাব নূরুল হক এখন ৭০ অনুচ্ছেদের উপর সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।

জনাব নূরুল হক (এন.ই.-১৪৭: নোয়াখালী-৩): মাননীয় ডেপুটি স্পীকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে,

“হাশিয়াসহ ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে হাশিয়াসহ নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করা হোক:

হাশিয়া: ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া’

‘৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য হইলে তিনি যদি

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা

(খ) সংসদে উক্ত দলের সহিত ভোটদান করিতে অসমর্থ হন, তাহা হইলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’”

জনাব নূরুল হক: মিস্টার ডেপুটি স্পীকার, স্যার, আমরা গণতান্ত্রিক উপায়ে, সাবলীলভাবে যাতে চলতে পারি, সেজন্য আমি এই অনুচ্ছেদের সংশোধনীর প্রস্তাব করেছি।

…কোনো মাননীয় সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসার পর যদি মনে করেন যে, কোনো এক ব্যাপারে সরকারী দলের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত হতে রাজি নন, এবং হাউসে কোনো ডিভিশন হলে তিনি যদি নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তিনি তা দিতে পারেন। কিন্তু এজন্য তাঁর সদস্য পদ চলে যাবে।

এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন সদস্যের নজির উত্থাপন করছি এইজন্য যে, মাননীয় সদস্য শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত বলেছেন, দুনিয়ার কোনো সংবিধানে এই রকম কোনো অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয় নাই। অথচ, এমন কতগুলি দেশের কথা আমি জানি, যে দেশের সংবিধানে সংযোজিত না হলেও কনভেনশনের মধ্যে তা আছে, তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা, ভারতের পার্লামেন্টের সদস্যরা যে কোনো পার্টি থেকে নির্বাচিত হবার পর সেই পার্টির সঙ্গে কোনো মতানৈক্য দেখা দিলে তিনি পদত্যাগ করেন। নিজের ইচ্ছামতো তিনি সেটা করতে পারেন। তাহলে সদস্যের পদ শূন্য হয়ে যায়। এবং তিনি আবার নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন।

এই সংবিধানের বর্তমান বিধান সংশোধনের জন্য আমি যে আকারে নতুন ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তিত করে পেশ করেছি, আমি আশা করি, এই পরিষদে তা গৃহীত হলে গণতন্ত্রের পক্ষে সেটা একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে।

জনাব নূরুল হক: […] “In the course of Parliamentary proceedings arising out of the British and French military intervention in Egypt in 1956. Mr. Stanley Evans made it clear that he did not agree with the general attitude of opposition to the Government on the matter by the Labour Party. Accordingly, he abstained from voting on the Opposition’s Vote of Censure on 1 November 1956, which he was permitted to do under the Standing Orders of the Parliamentary Labour Party. The Wednesbury Constituency Labour Party were strongly critical of their Member’s line and demanded his resignation. Mr. Evans resigned and at the by-election the Labour Party held this ‘safe’ seat.”

এবং আমি এই কথা মনে করি যে, প্রত্যেক দেশে এরূপ হয়েছে। মিসরের উপর যখন আক্রমণ হয়, তখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের শ্রমিক দলের এক সদস্য মনে করলেন যে, সুয়েজ ক্যানালের উপর আক্রমণ করে অন্যায় করা হয়েছে এবং তার দ্বারা সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে এবং অন্যের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এবং সেইজন্য তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেছেন, সংখ্যাধিক্যের কারণে তাঁর মত প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও বাইরে গিয়ে তিনি এর বিরোধিতা করতে পারবেন, এ অধিকার তাঁর আছে। কারণ, তাঁকে অবশেষে তাঁর নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে ফিরে যেতে হবে। সেটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। […]

জনাব নূরুল হক: জনাব ডেপুটি স্পীকার সাহেব, আমি আর একটি কথা বলে শেষ করছি।

Mr. Dick Taverne, a Labour Party M.P. from Lincoln, who has been disowned by his constituency and party executive, explains why he was resigning. He said, he was resigning in order to fight the by election as an independent candidate.

… আমার সংশোধনীটি সংযোজিত হলে আমি বিশ্বাস করি এই সংবিধান আরও সুন্দর হবে এবং দেশকে গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে সুবিধা হবে।

জনাব ডেপুটি স্পীকার: ভারপ্রাপ্ত সদস্য ড. কামাল হোসেন।

ড. কামাল হোসেন (আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী এবং সংবিধান-প্রণয়ন-মন্ত্রী): মাননীয় ডেপুটি স্পীকার সাহেব, আমার মনে হয়, এই ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ এইভাবে সংশোধিত হলে ব্যাপক অর্থে তার উদ্দেশ্য Serve করবে কি-না, সেইজন্য আমি House-এর অনুমতি নিতে চাই যে, সুস্পষ্টভাবে এর ব্যাখ্যার জন্য, বিশেষ করে অসমর্থ শব্দটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যার জন্য যদি কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন হয় তাহলে বা যদি এর সংজ্ঞার প্রয়োজন হয়, তাহলে তা যেন আনতে পারি। এই ব্যাপারে আপনার অনুমতি চাই। আমি অনুমতি চাচ্ছি এইজন্য যে, এই সংশোধনীর ফলে বিশেষ করে ‘অসমর্থ’ শব্দটির জন্য further examination কিংবা consequential কোনো amendment-এর প্রয়োজন হলে তা যেন আমরা আনতে পারি।

জনাব আছাদুজ্জামান (এন.ই.-৯০: ময়মনসিংহ-১৫): জনাব ডেপুটি স্পীকার সাহেব, নূরুল হক সাহেব যেভাবে সংশোধনীটি হাউসে উত্থাপন করেছেন, তার উপর আর কোনো কথা হতে পারে না।

ড. কামাল হোসেন: জনাব ডেপুটি স্পীকার সাহেব, আমি তাঁর সংশোধনীর উপর কিছু বলছি না। আমার কথা হলো যে, এই সংশোধনীর ফলে যদি এর কোনো ব্যাখ্যা বা definition-এর প্রয়োজন হয় বা কোনো consequential amendment-এর প্রয়োজন হয়, তা হলে তা যেন আনতে পারি। আমি সেই অনুমতিটুকু চেয়েছি মাত্র।

জনাব আছাদুজ্জামান খান: জনাব ডেপুটি স্পীকার সাহেব, এটা যে আকারে হাউসে এসেছে, তার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।

জনাব ডেপুটি স্পীকার: আমার মনে হয়, ভারপ্রাপ্ত সদস্য ‘অসমর্থ’ কথাটি পরিবর্তন করতে চান নাই। তিনি বলেছেন, এই ‘অসমর্থ’ কথাটির ফলে যদি কোনো অর্থ বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় বা এর further clarification-এর প্রয়োজন হয়, যাতে এই সংশোধনীর পূর্ণ সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তার জন্য প্রয়োজন হলে consequential amendment যেন আনা যায়।

এখন আমি আগামীকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত পরিষদের অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করছি।

(অতঃপর অধিবেশন ১৯৭২ সালের ৩রা নভেম্বর, শুক্রবার, অপরাহ্ণ ৩টা পর্যন্ত মুলতবী হয়ে যায়।)

শুক্রবার-শনিবার, ৩রা-৪ঠা নভেম্বর, ১৯৭২

(বাংলাদেশ গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ষোড়শ বৈঠক ১৯৭২ সালের ৩রা নভেম্বর, শুক্রবার, অপরাহ্ণ ৩টা ৭ মিনিটে স্পীকার জনাব মুহম্মদুল্লাহ্র সভাপতিত্বে ঢাকাস্থ পরিষদ-ভবনে আরম্ভ হয়)

দফাওয়ারীভাবে সংবিধান-বিল বিবেচনা

জনাব নূরুল হক (এন.ই.-১৪৭: নোয়াখালী-৩): মাননীয় স্পীকার সাহেব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান-বিলের ৭০ অনুচ্ছেদের উপর আমি যে সংশোধনী এনেছি, তা এখন আমি আপনার অনুমতি নিয়ে উত্থাপন করতে চাই।

আমি প্রস্তাব করছি যে,

“হাশিয়াসহ ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে হাশিয়াসহ নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করা হোক:

হাশিয়া: ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া’

‘৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা

(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,

তাহা হইলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’”

ড. কামাল হোসেন (সংবিধান-প্রণয়ন এবং আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী-মন্ত্রী): মাননীয় স্পীকার সাহেব, এই অনুচ্ছেদে ভাষাগত যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় সদস্য সংশোধিত আকারে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা তা গ্রহণ করতে পারি এবং গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্যে আমাদের এটা করা উচিত। তাই এটা গ্রহণ করা যেতে পারে।

শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত (পি.ই.-২২১৪ সিলেট-২): এর বিরুদ্ধে আমার কিছু বক্তব্য আছে।

৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনীতে বলা হয়েছে:

“কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি সংসদে উক্ত দলের সহিত ভোটদান করিতে অসমর্থ হন, তাহা হইলে সংসদে তাঁর পদ শূন্য হইবে।”

—এই কথা আর আমার সংশোধনীর মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য ছাড়া আর কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না।

জনাব স্পীকার: ৭০ (খ)-এ এখন যেটা পড়লাম, সংশোধিত-আকারে তা আপনি পড়ে দেখুন।

শ্রীসুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত: একটা সংশোধনী যদি দ্বিতীয়বার নতুন সংশোধনীর রূপ ধারণ করে, তাহলে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণে আমাদের আপত্তি থাকতে পারে। আমাদের পরিষদে আজকে যখন কোনো সংশোধনী আসে এবং তার উপর যদি আর একটা নতুন সংশোধনী আসে এবং সে সংশোধনীর উপর অনর্থক আলোচনা হয় ইচ্ছামতো এবং একই সংশোধনী অন্য সদস্যের দ্বারা ভিন্ন রূপ ধারণ করে, তাহলে এ সম্বন্ধে মাননীয় স্পীকার, স্যার, আমি বলতে চাই, একই সংশোধনী দ্বিতীয় বার আলোচনার কথা বিধি-পদ্ধতিতে নাই।

জনাব স্পীকার: আপনি নিজেও এটা amend করতে পারেন।

জনাব নূরুল হক: মাননীয় স্পীকার সাহেব, আমার মনে হয়, মাননীয় সদস্য শ্রী সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত ভুলে গেছেন, তিনি নিজেই এই রকম একটি সংশোধনীর প্রস্তাব করেছিলেন। আজ ঐ বিধি-পদ্ধতির অন্যান্য ধারামতে এই সংশোধনী পাস করা যায়। মাননীয় সদস্যের নিজের বেলায় যেটা প্রযোজ্য, অন্যের বেলায় সেটা প্রযোজ্য হলেই আপত্তি করা হয়—এটার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করা উচিত নয়।

জনাব স্পীকার: এখন পরিষদের সম্মুখে প্রশ্ন হলো:

“হাশিয়াসহ ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে হাশিয়াসহ নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করা হোক:

হাশিয়া: ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া’

‘৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা

(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,

তাহা হইলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হইবে…’”

লেখক : মো. মোরশেদ কামাল; অ্যাডভোকেট (জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চট্টগ্রাম)।