সাইফুল হত্যা মামলায় একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন করে জামিন আদায়ের ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি, তিন আইনজীবীকে ১৫ দিনের জন্য হাইকোর্টে প্র্যাকটিস থেকে বিরত থাকার নির্দেশ
রাজধানীর মুগদা থানার সাইফুল হত্যা মামলায় তথ্য গোপন করে নিম্ন আদালতের একই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের এবং জামিন আদায়ের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, একই আসামিদের পক্ষে একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তির পরিপন্থি।
এ ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ আসামি, তিনটি পৃথক জামিন আবেদনের হলফকারী এবং তাঁদের পক্ষে থাকা তিন আইনজীবীকে ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তিন আইনজীবীকে তাঁদের নিজ নিজ ব্যাখ্যা বা জবাব ১৫ দিনের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য তাঁদের হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করা থেকেও বিরত রাখা হয়েছে।
বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ লিখিত আদেশে এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) আদেশের অনুলিপি সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে।
একই আদেশের বিরুদ্ধে একাধিক আবেদন নিয়ে আদালতের উদ্বেগ
লিখিত আদেশে হাইকোর্ট বলেন, একই আসামি-আবেদনকারীদের পক্ষে একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এই আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের করা, বিশেষ করে যখন অন্য একটি ডিভিশন বেঞ্চ থেকে ইতোমধ্যে জামিনের আদেশ আদায় করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আচরণের যথার্থতা, সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আদালত আরও বলেন, অন্য আবেদনগুলোর বিচারাধীন থাকার বিষয়টি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তির পরিপন্থি।
পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, এই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রত্যেক বিচারপ্রার্থীর জন্য অত্যন্ত সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আবেদন করা এবং প্রার্থিত প্রতিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতের কাছে প্রকাশ করা অপরিহার্য।
বিশেষ করে, অন্য বেঞ্চে একই বিষয়ে দায়ের করা আবেদনগুলোর অস্তিত্ব গোপন রেখে হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে সমান্তরালভাবে একাধিক আবেদন দায়েরের বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আদালতের মতে, এ ধরনের আচরণের ফলে আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বিচারিক আদেশ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট আসামি-আবেদনকারী, তাঁদের পক্ষে দায়ের করা পৃথক আবেদনগুলোর হলফকারী এবং আইনজীবীদের আচরণ যথাযথ বিচারিক পর্যালোচনার দাবি রাখে।
১১ জনের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল
আদেশে হাইকোর্ট বলেন, বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আমলে নেওয়া এবং কী পরিস্থিতিতে উল্লিখিত একাধিক আবেদন দায়ের ও জামিনের আদেশ আদায় করা হয়েছে, তা অনুসন্ধানের জন্য রুল জারি করতে আদালত আগ্রহী।
একই জামিন নামঞ্জুরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে একাধিক আবেদন দায়ের এবং অন্যান্য আবেদন বিচারাধীন থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে জামিনের আদেশ আদায়ের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে পাঁচ আসামি, তিনটি জামিন আবেদনের হলফকারী এবং তাঁদের পক্ষে থাকা তিন আইনজীবীকে।
পাঁচ আসামি হলেন, মিল্লাত ওরফে মিল্লাত হোসেন, লিপি ওরফে লিপি আক্তার, শরীফ ওরফে মো. শরীফ, টনিক ওরফে আনোয়ার হোসেন টনিক এবং জনি ওরফে আরিফুর রহমান জনি।
জামিন আবেদনগুলোর হলফকারী তিনজন হলেন মোহাম্মদ সেলিম রেজা, মো. মোশাররফ হোসেন ও রিপন আহমেদ।
আসামিদের পক্ষে থাকা তিন আইনজীবী হলেন আন্না খাতুন, মোহাম্মদ রহিম উদ্দিন ও এস. এম. আবদুল বাতেন শাকিল।
আদেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ১১ জনকে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে রুলের জবাব দাখিল করতে হবে।
নতুন করে জামিন আবেদন গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা
রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিএমএম) উল্লিখিত মামলায় জামিনের বিষয়ে নতুন কোনো আবেদন গ্রহণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে তিন আইনজীবীকে তাঁদের নিজ নিজ ব্যাখ্যা বা জবাব ১৫ দিনের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য তাঁদের হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামিনের আদেশ পাঠানো স্থগিত
আদেশে হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেন, হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ গত ১ নভেম্বর যে জামিনের আদেশ দিয়েছিলেন, সেটি এখনো ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়নি।
এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই জামিনের আদেশটি সংশ্লিষ্ট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো থেকে হাইকোর্টের ক্রিমিনাল সেকশনের অফিসকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১১ জনকে শোকজ
এর আগে গত বুধবার রাজধানীর মুগদা থানার সাইফুল হত্যা মামলায় তথ্য গোপন করে নিম্ন আদালতের একই আদেশের বিপরীতে তিনবার আবেদন করে জামিন নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় ১১ জনকে শোকজ করেন হাইকোর্ট।
শোকজের জবাব দিতে তাঁদের ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। শোকজ হওয়া ১১ জনের মধ্যে ছিলেন পাঁচ আসামি, তিন আইনজীবী এবং মামলার তিনজন তদবিরকারক।
সেই ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবার লিখিত আদেশে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ দিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে রুল জারি করলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের পেশাগত কার্যক্রমের ওপরও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

