শাহজাদপুর চৌকি আদালত, সিরাজগঞ্জ
শাহজাদপুর চৌকি আদালত, সিরাজগঞ্জ

প্রেম করে বিয়ের পর ‘অপহরণের’ মিথ্যা মামলা: সেই বাদীর বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নিজের বিয়ের ঘটনাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ ও চাঁদা দাবি’ হিসেবে সাজিয়ে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করায় মো. নুরনবী ওরফে নুর হোসেন নামের এক বাদীর (ফরিয়াদী) বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোসলেম উদ্দীন এই নজিরবিহীন আদেশ প্রদান করেন।

সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, মো. নুরনবী (যিনি বর্তমানে এই মামলার আসামী) প্রথমে ফরিয়াদী হিসেবে আদালতে একটি নালিশী দরখাস্ত বা কোর্ট পিটিশন মামলা আনয়ন করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন যে, আসামী মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মারপিট, বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছেন।

মামলায় নুরনবী উল্লেখ করেন, আসামী মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌসের মা এবং ফরিয়াদীর মা আপন দুই বোন। ফরিয়াদীর মা অসুস্থ হলে তাঁকে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাকালীন আসামী জান্নাতুল ফেরদৌস ও তাঁর মা সেখানে তাঁকে দেখতে আসেন। পরবর্তীতে নুরনবীকে জিম্মি করে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে রুমে আটকে রাখা হয় এবং তাঁর বাবাকে ফোন করে সেখানে ডাকা হয়।

সেখানে সবার উপস্থিতিতে তাঁকে গালিগালাজ ও মারপিট করে জোরপূর্বক জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে বিবাহ দেওয়া হয় এবং কাজীর ভলিউমে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এই মর্মে তিনি দণ্ডবিধির ৩২৩/৩৪২/৩৬৪/৩৮৬/৩৮৭/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন।

আরও পড়ুননিজ কোর্ট ছাড়া অন্য কোর্টে প্রবেশে ডিএজি ও এএজিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা

আদালত এই স্পর্শকাতর মামলার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI), সিরাজগঞ্জ জেলাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআই-এর উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আঃ রহিম মামলাটি নিবিড়ভাবে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নুরনবীর মা মোছা. নুরী বেগম অসুস্থ হলে তাঁকে চিকিৎসার জন্য এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজে ৭ দিন ভর্তি রেখে অপারেশন করা হয়। ওই সময় বাদীর আত্মীয়স্বজনরা হাসপাতালে রোগীর সেবায় ব্যস্ত থাকাকালীন নুরনবী এবং তাঁর খালাতো বোন জান্নাতুল ফেরদৌস একত্রে চলাফেরার কারণে একে অপরের প্রেমে জড়িয়ে পড়েন।

পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে এবং পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে গত ৩ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ধর্মীয় শরিয়াহ মোতাবেক তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানান, অপহরণ, মারপিট বা জোরপূর্বক বিয়ের বিষয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ বা প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়নি বরং এটি একটি স্বাভাবিক প্রেমের বিয়ে ছিল।

নালিশী দরখাস্ত এবং পিবিআই-এর তদন্ত রিপোর্টের মধ্যে চরম বৈপরীত্য পাওয়ায় আদালত পর্যবেক্ষণ দেন যে, নুরনবী উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। এরপর আদালত দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২১১ ধারা (মিথ্যা মামলা করা) অনুসারে অপরাধ আমলে গ্রহণ করেন এবং কেন তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেন।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নুরনবী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় এবং শোকজের কোনো জবাব না দেওয়ায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোসলেম উদ্দীন তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বিবিধ/মিস মামলা রুজু করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করেন।