এজলাসে ২ আইনজীবীর হাতাহাতি, সদস্যপদ স্থগিত

পাথরঘাটা আদালতের এজলাসে দুই আইনজীবীর হাতাহাতি; উভয়ের সদস্যপদ স্থগিত, ওকালতিতে নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা | বরগুনার পাথরঘাটা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম (সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতের এজলাস কক্ষের ভেতরে দুই আইনজীবীর মধ্যে হাতাহাতি ও জুতা ছোঁড়াছুড়ির এক নজিরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। আদালত কক্ষের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হট্টগোলের জেরে অভিযুক্ত দুই আইনজীবীরই সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতি।

একই সাথে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বরগুনা জেলার সকল আদালতে তাদের পেশাগত আইনি দায়িত্ব পালন থেকেও বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত রবিবার (১৭ মে) বেলা ১১টার দিকে বরগুনার পাথরঘাটা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের এজলাস কক্ষের অভ্যন্তরে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত দুই আইনজীবী হলেন— বরগুনা জেলা আদালতের অতিরিক্ত পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা লাকি এবং অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মঞ্জু।

মুহুরিকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত

আদালত ও স্থানীয় আইনি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা লাকির সহকারী (মুহুরি) মিরাজ আহমেদ অপর আইনজীবী মিজানুর রহমান মঞ্জুর ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন। নিজের মুহুরি অন্য আইনজীবীর গাড়িতে আসাকে কেন্দ্র করে দুই আইনজীবীর মধ্যে প্রথমে তীব্র বাগবিতণ্ডা ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

পরবর্তীতে এজলাস কক্ষের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় উত্তেজনা দেখা দিলে দুই পক্ষই চরম উগ্র রূপ ধারণ করে এবং একপর্যায়ে এজলাসের ভেতরেই হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য সহকর্মী আইনজীবীরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে স্বস্তির বিষয়, ঘটনার সময় বিজ্ঞ বিচারক এজলাসে উপস্থিত ছিলেন না।

জুতা নিক্ষেপ বনাম মারধরের পাল্টা অভিযোগ

ঘটনার পর দুই আইনজীবীই একে অপরের বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক হামলার পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা লাকি অভিযোগ করে বলেন, “অ্যাডভোকেট মঞ্জু দীর্ঘদিন ধরে আমার মুহুরিকে বিভিন্ন প্রলোভন ও সুবিধা দেখিয়ে নিজের দলে নেওয়ার (কাজে নেওয়ার) চেষ্টা করছেন। এই পেশাগত অনৈতিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে মঞ্জু ক্ষিপ্ত হয়ে সবার সামনে আমাকে মারধর করেন।”

অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মঞ্জু দাবি করেন, “মুহুরি আসার মতো একটি অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে অ্যাডভোকেট লাকি চরম উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সবার সামনে পা থেকে জুতা খুলে আমাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারেন।”

জেলা বারের জরুরি সভা ও কঠোর সিদ্ধান্ত

আদালত কক্ষের ভেতরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশোভন আচরণের খবর বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতিতে পৌঁছালে রাতেই বারের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মনোয়ারা আক্তার কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আদালতের পবিত্র এজলাস কক্ষে দুই আইনজীবীর এমন মারামারির ঘটনায় সামগ্রিক আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। পেশাগত আচরণবিধি (Code of Conduct) লঙ্ঘনের দায়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে উভয়ের সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছি। একই সাথে জেলার কোনো আদালতে তারা ওকালতি করতে পারবেন না।”

পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এনাম বলেন, “আদালত কক্ষে হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এজলাস কক্ষের ভেতরে আইন কর্মকর্তাদের এমন মারামারির ঘটনায় সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।