নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে কর্মরত জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আদালত পাড়ায় তীব্র বিতর্ক, অসন্তোষ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারবিরোধী আইনজীবীরা একে ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’ বলে কড়া সমালোচনা করলেও সরকার পক্ষ ও বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা এই অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) আইন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি প্রজ্ঞাপনে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ’ বর্তমান বিএনপি সরকার চূড়ান্ত আইনে রূপ না দিয়ে তা রহিত করায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পক্ষ থেকে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে।
‘এটি মারাত্মক আদালত অবমাননা, আগামীকালই পিটিশন’: অ্যাডভোকেট শিশির মনির
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি পদক্ষেপকে ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ (Seriously Contemptuous) বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনিজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, “তারা (সরকার) যে কাজ করেছে, এতে মারাত্মক আদালত অবমাননা হয়েছে। এই সচিবালয় স্ট্রাকচারকে তারা ভেঙে চুরমার (ডিজম্যান্টল) করে দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চেয়ে গত ২১ এপ্রিল জনস্বার্থে আমরা সাত আইনজীবীর পক্ষে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করেছি। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে ৩ মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে যেন কার্যক্রম বন্ধ না করা হয়, তাও রাষ্ট্রপক্ষকে জানানো হয়েছিল। আদালতের ইচ্ছার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না দেখিয়ে এই বদলি করা হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে কনটেম্পট নোটিশ দিয়েছি এবং আগামীকালই (বৃহস্পতিবার) আদালতে একটি কনটেম্পট পিটিশন (আদালত অবমাননার মামলা) দায়ের করব।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনা হলে আদালত চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের সামনে কোর্টে এসে বলেছেন কোর্টের ইচ্ছাটা সেদিন রিসিভ করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল নিজে হাজির ছিলেন। তাহলে এই সমস্ত কাজ কেন করছেন?’ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী ৭ জুনের মধ্যে সরকার যদি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করে সচিবালয় বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, তবে তারা পুনরায় কঠোর আইনি লড়াইয়ে যাবেন।
‘সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিল আসবে’: ব্যারিস্টার বাদল
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির কারণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে– এমন দাবি সম্পূর্ণ অবান্তর ও ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রফিকের সুযোগ্য উত্তরসূরি ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল।
গতকাল সুপ্রিম কোর্টে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “যেসব জুডিশিয়াল অফিসার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য নিয়োজিত ছিলেন, অর্ডিন্যান্সটি সংসদে পাস না হওয়ায় গেজেটের মাধ্যমে তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যেহেতু অর্ডিন্যান্সটি আইনে রূপান্তরিত হয়নি, পার্লামেন্টে পাস হয়নি, সেহেতু উনারা এই পদে ফাংশন বা কাজ করবেন কীভাবে? সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই তারা মিনিস্ট্রিতে অ্যাটাচড হবেন এবং পরে তাদের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হবে।”
আদালত অবমাননার অভিযোগ নাকচ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন:
এখানে আদালত অবমাননা হবে কেন? সংসদে এটা এখনও পাস বা চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপি তো বলেনি যে তারা পৃথক সচিবালয় আর করবে না। বিএনপি সরকার আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিল আকারে আইনটি সংসদে এমনভাবে নিয়ে আসবে, যাতে পরে এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক, আইনি ফাঁকফোকর বা সমালোচনার সুযোগ না থাকে। এখানে আদালত অবমাননার বা বিচার বিভাগ ধ্বংসের কিছু নেই।
বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’ ও আইনমন্ত্রীর নীরবতার সমালোচনা
সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এটিকে স্বাধীন বিচার বিভাগ ধ্বংসের ‘নীলনকশা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থিত আইনজীবীরা। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ন্যাশনাল লয়ার্স অ্যালায়েন্সের নেতারা কড়া বক্তব্য দেন।
আইনজীবী ফোরামের নেতা জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, “স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ মানুষ ও বিচারকদের যে দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটিতে বিএনপি সরকার খুবই বাজেভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। সবচেয়ে ব্যথাজনক বিষয় হলো—পূর্বের অধ্যাদেশ প্রণয়নের সঙ্গে বর্তমান আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন এবং তখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আজ বিচার বিভাগকে অবদমিত করার এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের এই রহস্যজনক নীরবতা আমাদের ব্যথিত করেছে। জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে দয়া করে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না। নিয়ন্ত্রিত বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে আপনাদের নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফার ওয়াদা বাস্তবায়ন করুন।”
বাসদের গভীর উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার সরকারি ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। গতকাল এক বিবৃতিতে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের জন্য নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা অপরিহার্য। ক্ষমতাসীন বিএনপিও তাদের নির্বাচনি ইশতেহার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় স্বাধীন বিচার বিভাগের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু আজ সেই সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিএনপি সরকার তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ এবং জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সিদ্ধান্ত নিল, যা মোটেও দেশবাসীর কাম্য নয়।
বিবৃতিতে বাসদ নেতা একই সাথে প্রস্তাবিত খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইনে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কমিশনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পুনরায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করার চেষ্টারও তীব্র সমালোচনা করেন।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং সরকারের এই বিপরীতমুখী প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে আগামী দিনগুলোতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটি বড় ধরনের আইনি লড়াই ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

