কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, বর্ষীয়ান সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন (৯০) আর নেই। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার (২৩ মে) কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, এক কন্যা এবং আইন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর এই প্রয়াণে দেশের আইন অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ১৯৩৬ সালের ১৪ নভেম্বর ভোলা জেলার সদর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এলএলএম) ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনজীবীদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে থেকে তিনি সম্মুখ নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আরও পড়ুন : সুপ্রিম কোর্টের অবকাশে হাইকোর্টের বিচারকার্য পরিচালনায় ৭টি বেঞ্চ গঠন
১৯৭১ সালে তরুণ আইনজীবী হিসেবে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বরিশালের গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে বাঙালির মাঝে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিতে এবং জনমত গঠনে তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আসন ছেড়ে দিলে, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন।
২০০৭ সালের ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে যখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া প্রধান আইনজীবীদের মধ্যে ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ছিলেন অন্যতম। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি দলীয় প্রধানের পক্ষে আদালতে সাহসিকতার সাথে আইনি এজেন্ডা পরিচালনা করেন।
তিনি দেশের আইন পেশার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’-এর নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেলেন। এর আগেও তিনি একাধিকবার বার কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নিজ জেলা বরিশাল আইনজীবী সমিতিতেও তিনি বারবার সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আইনজীবীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আইন পেশার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দলটির উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর বাইরে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-র মত-দ্বিম বিভাগে নিয়মিত কলাম লিখতেন, যেখানে তাঁর রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষণ সমাজ গঠনে দিকনির্দেশনা দিত।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যেখানে ৪-দলীয় জোটের প্রার্থী আন্দালিব রহমান পার্থর কাছে তিনি পরাজিত হন।
পারিবারিক জীবনে তাঁর এক কন্যা (শম্পা) বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তাঁর পুত্র আফতাব ইউসুফ রাজ ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের একজন সুপরিচিত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

