মৃত্যুদণ্ডের মামলা উচ্চ আদালতে আটকে থাকে, দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কাজ করছে সরকার: আইনমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা | উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মামলাসমূহের নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিরসনে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, নিম্ন আদালতে চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার দ্রুত শেষ হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে নথিপত্র প্রস্তুত ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বছরের পর বছর মামলা আটকে থাকে, যা বিচার ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে।

গতকাল বুধবার (১০ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এসব কথা বলেন। ‘লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেশন ইন ডেথ পেনাল্টি কেসেস ইন বাংলাদেশ: অ্যান এমপিরিক্যাল অ্যান্ড কনসেপচুয়াল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ।

ব্যক্তিগত অবস্থান ও সামাজিক বাস্তবতা

সেমিনারে মৃত্যুদণ্ড ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে নিজের গভীর দর্শন তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন—

  • ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজে মৃত্যুদণ্ডের ঘোর বিরোধী এবং এটি মানবাধিকারের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারেরই অংশ।

  • তবে কিছু জঘন্য ও নৃশংস অপরাধের ঘটনায় সমাজের বাস্তবতা, জনমত ও নৈতিকতার বিষয়টিও একই সাথে বিবেচনায় নিতে হয়। সামাজিক বাস্তবতা ও জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে এককভাবে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

  • বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনায় সমাজের ভেতর থেকে অপরাধীদের সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তির দাবি অত্যন্ত জোরালো হয়ে ওঠে।

রামিসা ও আছিয়া হত্যা মামলার উদাহরণ: দ্রুত বিচারের নজির

আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নিম্ন আদালতে বিচার চাঙ্গা হওয়ার উদাহরণ হিসেবে মাগুরার আছিয়া এবং অতি সাম্প্রতিক রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি জানান, রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং গত ২৪ মে দ্রুততম সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র (Chargesheet) জমা দেওয়া হয়। মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে এই মামলার বিচারিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। আছিয়া হত্যা মামলাসহ আরও বেশ কয়েকটি মামলাতেও এমন দ্রুত বিচার হয়েছে। তবে এই মামলাগুলোই যখন উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) যায়, তখন আইনি নথিপত্র প্রস্তুতের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে, যা দূর করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

আইনি সেবার আধুনিকায়ন ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণে বড় উদ্যোগ

সেমিনারে আইনমন্ত্রী বিচারপ্রার্থী দরিদ্র মানুষ এবং আইনজীবী সমাজের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা ও নির্দেশনার কথা জানান:

১. লিগ্যাল এইডের সম্প্রসারণ ও প্রি-ট্রায়াল মেডিয়েশন: দেশের প্রতিটি অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। এই লক্ষ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) কার্যক্রম জেলা জজের তত্ত্বাবধানে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে, যেখানে একজন যুগ্ম জেলা জজ সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এখন থেকে লিগ্যাল এইডে ‘প্রি-ট্রায়াল মেডিয়েশন’ বা বিচার-পূর্ব মধ্যস্থতা যুক্ত করা হয়েছে। চুরি বা যৌতুকের মতো ছোটখাটো মামলায় যেখানে দীর্ঘদিন সাক্ষ্য হচ্ছে না, সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে আপস-নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা আদালতের মামলার জট ও হয়রানি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

২. বেসরকারি সংস্থার (NGO) সাথে সমন্বয়: সরকারি লিগ্যাল এইড সেবার পাশাপাশি যেসকল এনজিও আইনি সহায়তা দেয়, তাদের সাথে কাজের সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো যায়।

৩. আইনজীবীদের বাধ্যতামূলক ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ: দেশে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। কিন্তু বার কাউন্সিলের সনদ পাওয়ার পর অধিকাংশের জন্যই কোনো বাধ্যতামূলক পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে আইনজীবীদের দক্ষতা বাড়াতে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

৪. সিনিয়র আইনজীবীদের জন্য ১০% প্রো-বোনো (Pro-bono) নীতি: সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) আইনজীবীদের জন্য একটি বিশেষ নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা চলছে। এই নীতিমালার অধীনে সিনিয়র আইনজীবীগণ তাঁদের পরিচালিত মোট মামলার অন্তত ১০ শতাংশ অথবা বছরে ন্যূনতম একটি মামলা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে (Pro-bono) পরিচালনা করবেন।

সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন ও বিরোধ নিষ্পত্তি

পারিবারিক মামলার একটি বড় উৎস সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান উত্তরাধিকার আইনে হিন্দু নারীরা পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশ পাওয়ার সুযোগ পান না, অন্যদিকে মুসলিম নারীরা পুরুষের তুলনায় কম অংশ পান। এ কারণে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে সমাজে প্রচুর বিরোধ ও মামলা সৃষ্টি হয়।

এই জটিলতা নিরসনে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের রেফারেন্স দেন আইনমন্ত্রী। ওই রায়ে বলা হয়েছিল— কোনো ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার নিজের কাছে রেখে সন্তানদের নামে দানপত্র (Gift Deed/Heva) করে দিতে পারেন। এই আইনি বিধানটি যদি সমাজে কার্যকর ও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে সম্পত্তি-সংক্রান্ত পারিবারিক মামলার সংখ্যা বহুগুণে কমে আসবে।

সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক উপস্থিত থেকে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।