পিএসসির প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে রিট

দুইয়ের অধিক সন্তান থাকলে মাতৃত্বকালীন ছুটি সীমিত করার বিধান চ্যালেঞ্জ করে রিট

কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | দুই সন্তানের অধিক সন্তান থাকলে একজন নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটি ও মাতৃত্ব সুবিধা সীমিত বা অস্বীকার করার বিদ্যমান আইনি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। এই বিধানকে বৈষম্যমূলক, অযৌক্তিক এবং দেশের মূল সংবিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।

আজ সোমবার (১৫ জুন) সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান জনস্বার্থে উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। রিটে মূলত ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর সংশ্লিষ্ট বৈষম্যমূলক ধারা এবং ‘বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস’ (Bangladesh Service Rules)-এর প্রাসঙ্গিক বিধানসমূহের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনো পুরস্কার বা উৎসাহের উপকরণ নয়

উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট আবেদনে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রকৃত সংজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনো বিশেষ আর্থিক সুবিধা বা সন্তান জন্মদানে উৎসাহ প্রদানের কোনো উপকরণ বা পুরস্কার নয়; বরং এটি একজন মায়ের প্রসব-পরবর্তী শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা পুনরুদ্ধার, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা এবং শিশুর জন্মের পর ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ বা বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় ও বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।

রিটে আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন নারী তাঁর জীবনে প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়—যে কোনো সন্তানই জন্মদান করুন না কেন, প্রসবজনিত শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি, চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা, প্রসব-পরবর্তী বিশ্রাম এবং পরম মমতায় নবজাতকের যত্নের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা প্রতিবারই সমান থাকে।

ফলে শুধুমাত্র সন্তানের সংখ্যার একটি গাণিতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একজন মাকে তাঁর মাতৃত্বকালীন ছুটি বা আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা চরম বৈষম্যমূলক, সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং দেশের সর্বোচ্চ সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।

সংবিধানের ৮টি অনুচ্ছেদ ও আন্তর্জাতিক সনদের লঙ্ঘন

দাখিলকৃত রিট পিটিশনে দাবি করা হয়েছে যে, দুই সন্তানের অধিক সন্তান থাকলে মাতৃত্ব সুবিধা অস্বীকার করার এই বিধানটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭, ১৫, ১৮, ২৬, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা নাগরিকদের সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের সরাসরি পরিপন্থী। এছাড়া এটি মাতৃত্ব ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও চরমভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

রিট আবেদনটির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরে বলেন:

মাতৃত্বকালীন ছুটি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো উপকরণ নয়। এটি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি মৌলিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। একজন মা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলেও তার স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রয়োজন কমে যায় না।

রিট আবেদনে আরও একটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার দিক স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’ (CEDAW)-এর একটি অন্যতম স্বাক্ষরকারী ও সদস্য রাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক এই আইন অনুযায়ীও মাতৃত্ব সংক্রান্ত যে কোনো ধরনের বৈষম্য দূর করার রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের রয়েছে।

পরিশেষে রিটে, দেশের সকল কর্মজীবী ও চাকুরিজীবী নারীদের জন্য সন্তানের সংখ্যা নির্বিশেষে সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন এবং সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের জন্য আদালতের কাছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আবেদন করা হয়েছে।