বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

ই-সিগারেট নিষিদ্ধে হাইকোর্টের রুল: ৪ সপ্তাহের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ

কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর ও নিকোটিনে আসক্তি সৃষ্টিকারী ই-সিগারেট এবং এর সংশ্লিষ্ট সব ধরনের নতুন প্রজন্মের পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বাজার থেকে অপসারণের দাবিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অনলাইন ও দোকান থেকে এসব পণ্য অপসারণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে তামাক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসা দেশের বিশিষ্ট তিন ব্যক্তিত্ব—সাইফুদ্দিন আহমেদ, এ. কে. এম. মাসুদ এবং হেলাল আহমেদ জনস্বার্থে হাইকোর্টে এই রিট পিটিশনটি (রিট পিটিশন নং: ৭৭২১/২০২৬) দায়ের করেন।

গত সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) হাইকোর্টের বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটির ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।

আদালতে রিটকারীদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ।

হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, শ্রম সচিব, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব, আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী ৪ (চার) সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

হাইকোর্টের রুলের মূল বিষয়বস্তু

আদালত তাঁর রুলে জানতে চেয়েছেন:

কেন সব ধরনের ই-সিগারেট (যেমন: ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম-ENDS, ইলেকট্রনিক নন-নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম-ENNDS, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট-HTP) এবং এগুলোর বিভিন্ন উপাদান বা অংশ (যেমন– ই-সিগারেট, ভ্যাপ/ভেপিং, ড্যাপার ও ই-লিকুইড ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত) সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগতভাবে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না; এবং কেন অনলাইন ও দোকান—উভয় স্থান থেকেই এই পণ্যগুলো সম্পূর্ণভাবে অপসারণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হবে না—যদিও এসব পণ্য মানবজীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং তা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) ও ৩২ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সংশোধিত আইনের আইনি শূন্যতা (Legal Vacuum) ও উদ্বেগ

শুনানি শেষে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দেখেছি প্রথাগত বা ট্রেডিশনাল তামাকের পাশাপাশি নতুন কিছু ক্ষতিকর তামাক পণ্য যেমন ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংসহ আরো কিছু নিকোটিনজাত পণ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই সচেতন হয়ে এই পণ্যটিকে নিষিদ্ধ করেছে।”

তিনি দেশের বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইন সংশোধন করে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ২০০৫’ পাস করেছিলেন। সেই অধ্যাদেশে ই-সিগারেটসহ নতুন প্রজন্মের সব ধরনের নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে সেই নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কিত কঠোর ধারাটি বাতিল করা হয়েছে এবং এসব ক্ষতিকর পণ্যকে আইনের মূল সংজ্ঞা থেকেও সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে একটি বড় আইনি শূন্যতা (Legal Vacuum) সৃষ্টি হয়েছে, যা আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও নিকোটিনের বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।”

রাজস্ব আদায়ের নামে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলার চেষ্টা

রিটকারীদের অপর আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ শুনানিতে বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ই-সিগারেটকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কোনো প্রচলিত আইন নেই যা ই-সিগারেট বিক্রি বা ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় কিংবা একে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ, একটি মহলের পক্ষ থেকে কেবল রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে এই মরণঘাতী পণ্যটিকে সুকৌশলে বাজারজাত করার অপউদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর স্বার্থে ই-সিগারেটের ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।”

আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেন যে, জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং বিচার বিভাগের পূর্ববর্তী নির্দেশনাগুলোর আলোকেই আদালত চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।