আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান

মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায় মামলা দায়ের কমেছে ৬২ শতাংশ: ১০ জেলায় নতুন কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন আইনমন্ত্রী

ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম ডেস্ক | আদালতে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে চাপ কমানোর লক্ষ্যে প্রি-কেস (মামলাপূর্ব) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রি-কেস (মামলাপূর্ব) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে আদালতে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। এ উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে।

আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়ালি দেশের ১০টি নির্বাচিত জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য জানান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেন। অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বিশেষ অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন।

বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ-এর বিধান অনুযায়ী আজ থেকে নতুন করে যে ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু হলো, সেগুলো হলো: বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।

এখন থেকে বর্ণিত জেলাগুলোতে ৭টি নির্দিষ্ট আইনের অধীন কোনো মামলা আদালতে দায়ের করার পূর্বে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে বিনামূল্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হলো।

পাইলট প্রকল্পের অবিশ্বাস্য সাফল্য ও পরিসংখ্যান

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা আমাদের বিচার ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও সীমাহীন ভোগান্তি কমবে।”

তিনি পাইলট প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ করে জানান, ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমেছে:

  • পারিবারিক আদালত আইন: মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪টিতে নেমে এসেছে (৫১% হ্রাস)।

  • বণ্টন মামলা (সিভিল জজ আদালত): ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমে এসেছে (৬৬.৯৭% হ্রাস)।

  • স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইন (প্রিম্পশন): মামলা ১৭টি থেকে কমে মাত্র ২টি হয়েছে (৮৮.২৪% হ্রাস)।

  • যৌতুক নিরোধ আইন: মামলা ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে কমে ১ হাজার ৮১০টিতে নেমে এসেছে।

  • নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি ও পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন: উভয় আইনেই মামলা দায়ের উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

কক্সবাজারের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’

কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। এসময় তিনি জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আগামী তিন মাসের মধ্যে কক্সবাজারের মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর আমি নিজে এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করব।”

তিনি মধ্যস্থতাকারীদের (Mediators) উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, এই দায়িত্বকে কেবল চাকরি হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক মানবিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তবে লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতা কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।

অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। এছাড়া জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) ও ইউএনডিপির (UNDP) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।