আল মুস্তাসিম নবী নিকু : বিয়ে মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ইসলাম ধর্মে বিবাহকে কেবল নারী ও পুরুষের একত্রে বসবাসের অনুমতি হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি পবিত্র অঙ্গীকার, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। মহান আল্লাহ তাআলা বিবাহের মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রশান্তি, স্নেহ ও মমতার ব্যবস্থা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিবাহকে তাঁর সুন্নত হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং সামর্থ্যবান মুসলমানদের বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
একই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিবাহ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি আইনগত সম্পর্কও। স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের পরিচয়, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিবাহের আইনগত স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছে এবং এ বিষয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।
ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব
ইসলামে বিবাহ একটি মহান ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের নিজেদের মধ্য থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা পরস্পরের কাছে শান্তি লাভ করে এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিবাহ কেবল জৈবিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি মানসিক প্রশান্তি, পারিবারিক স্থিতি এবং নৈতিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“বিবাহ আমার সুন্নত; যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।”
ইসলামী শরীয়তে একটি বৈধ বিবাহের জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত আবশ্যক—ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ), উভয় পক্ষের পূর্ণ সম্মতি, সাক্ষীর উপস্থিতি, দেনমোহর নির্ধারণ এবং শরীয়তসম্মত অন্যান্য শর্ত পূরণ।
অভিভাবক বা ওলির বিষয়ে হাদিসে বলা হয়েছে, “অভিভাবক ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হয় না।” (জামে তিরমিজি: ১১০১; সুনান আবু দাউদ: ২০৮৩)। আবার অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) গোপন বিয়েকে স্পষ্টভাবে নাকচ করে বলেছেন, “যাহারা তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।” (তিরমিজি: ১০২১)।
যদিও ইসলামী ফিকহে হানাফি মাজহাব মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারী নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নিজেই বিবাহ সম্পাদন করতে পারেন, তবুও বাংলাদেশে পরিবার, অভিভাবক ও সামাজিক পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়াই ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ।
গোপন ও প্রকাশ্য বিবাহ: ইসলামের নির্দেশনা
ইসলাম বিবাহকে গোপন রাখার পরিবর্তে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে উৎসাহিত করেছে। কারণ বিবাহ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান; এটি দুই পরিবারের বন্ধন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বিবাহ ঘোষণা করো।” (মুসনাদে আহমদ ৪/৫)। এমনকি অন্য বর্ণনায় এসেছে, বিবাহকে প্রকাশ্যে মসজিদে সম্পাদন করতে এবং প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘দফ’ বাজাতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিবাহের পর সাধ্যানুযায়ী ওলিমার আয়োজন করা সুন্নত, যার মাধ্যমে সমাজ বিবাহ সম্পর্কে অবহিত হয়।
গোপন বিবাহকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে, কারণ এতে নানাবিধ পারিবারিক ও সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি হয়:
-
পরিবারে চরম ভুল বোঝাবুঝি ও অনাস্থা।
-
পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অস্বীকার করা।
-
দেনমোহর ও ভরণপোষণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিরোধ।
-
সন্তানের পরিচয় ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি জটিলতা।
শরয়ী শর্ত পূরণ হলে কেবল গোপন রাখার কারণে বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল না হলেও, তা ইসলামে অনুচিত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিবাহ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশে ‘The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974’ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক।
-
আইনের ৩ ধারা: মুসলিম আইনে সম্পাদিত প্রত্যেকটি বিবাহ আইনগতভাবে রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন করতে হবে।
-
আইনের ৫ ধারা: কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজে বিবাহ সম্পন্ন করালে তিনি অবিলম্বে তা নিবন্ধন করবেন। আর অন্য কেউ বিয়ে পড়ালে, বরকে বিয়ের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কাজী অফিসে তথ্য জানাতে হবে।
আইন লঙ্ঘনের শাস্তি: এই নিবন্ধনের বিধান লঙ্ঘন করলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, অথবা ৩,০০০ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
তবে মনে রাখা জরুরি, নিবন্ধন না করা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কেবল নিবন্ধনের অভাবে শরীয়তসম্মত কোনো বিয়ে বাতিল হয়ে যায় না। কিন্তু কাবিননামা না থাকলে আদালতের দ্বারে আইনি সুবিধা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
(উল্লেখ্য, হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে ‘Hindu Marriage Registration Act, 2012’ অনুযায়ী ঐচ্ছিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং খ্রিস্টানদের জন্য পৃথক আইন কার্যকর আছে।)
কিভাবে বিবাহ নিবন্ধন করতে হয়?
লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে সরকারি নিবন্ধন বইতে বিবাহ রেজিস্ট্রি করা হয়। প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপসমূহ:
১. পাত্র ও পাত্রীর উভয়ের স্পষ্ট সম্মতি ও স্বাক্ষর।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (আইনগত বয়স নিশ্চিত করা) ও জাতীয় পরিচয়পত্র/প্রমাণাদি।
৩. অন্তত ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষী (বা ১ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাক্ষী)-র উপস্থিতি।
৪. দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা ‘নগদ’ নাকি ‘বকেয়া’—তা কাবিননামায় সুস্পষ্ট উল্লেখ।
৫. কাজীর সিল, স্বাক্ষর এবং বর-কনের চূড়ান্ত কাবিননামা গ্রহণ।
কেন বিবাহ নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বিবাহ নিবন্ধন কোনো কাগজের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দম্পতির আইনি ঢাল। নিবন্ধিত কাবিননামার গুরুত্ব অপরিসীম:
-
সম্পর্ক প্রমাণে: বিবাহ অস্বীকার করলে আদালতের সামনে কাবিননামাই সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমাণ।
-
দেনমোহর আদায়ে: স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকার আইনি কাঠামোর অধীনে সুরক্ষিত থাকে।
-
ভরণপোষণ: স্বামী ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী আদালতে খোরপোষ দাবি করতে পারেন।
-
উত্তরাধিকার ও সন্তানের পরিচয়: সন্তানের বৈধ পরিচয়, পাসপোর্ট, জন্মসনদ প্রস্তুত এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তির অংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত কাবিননামা অপরিহার্য।
-
প্রতারণা রোধ: অনিবন্ধিত বিয়ের মাধ্যমে প্রতারণা, মিথ্যা অপবাদ বা একাধিক বিয়ের অবৈধ চেষ্টা বন্ধ করা সম্ভব হয়।
শেষ কথা
বিবাহ ইসলামের একটি মহান বিধান এবং মানবজীবনের ভিত্তি। গোপনীয়তার সংস্কৃতি পরিহার করে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজকে জানিয়ে প্রকাশ্যেই বিয়ে সম্পন্ন করা উত্তম।
একজন সচেতন নাগরিক ও মুসলমানের দায়িত্ব হলো ধর্মীয় বিধান মেনে, অভিভাবকদের জানিয়ে এবং সরকারি কাজীর মাধ্যমে যথাযথভাবে কাবিননামা নিবন্ধিত করে বৈবাহিক জীবন শুরু করা। একটি নিবন্ধিত ও সামাজিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিবাহই পরিবারে শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্ব এনে দিতে পারে।
লেখক: আল মুস্তাসিম নবী নিকু; আইনজীবী, জজ কোর্ট, পাবনা ও ঢাকা। ই-মেইল: almustashimnobi.niku@gmail.com
