AGM-এ বিলম্ব মার্জনা: প্রতিকার যেন দায়মুক্তি না হয়

কামাল হোসেন মিয়াজী: সুশাসন (Good Governance) শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ নয়; একটি কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব সমান। করপোরেট সু শাসনের (Corporate Governance) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM)। এই সভায় কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ও পরিচালনার সামগ্রিক চিত্র শেয়ারহোল্ডারদের সামনে তুলে ধরা হয় এবং পরিচালকদের কাজ জবাবদিহির আওতায় আসে। শেয়ারহোল্ডাররা প্রশ্ন করতে পারেন, মতামত দিতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন। তাই AGM নিছক কোনো আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আর এ কারণেই কোম্পানি আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে AGM অনুষ্ঠানকে একটি বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশে পাবলিক কোম্পানি এবং প্রাইভেট কোম্পানি – উভয়ের ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ে এজিএম (AGM) অনুষ্ঠিত না হওয়ার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ধারা ৮১ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এজিএমের সময় বাড়ানোর সীমিত ক্ষমতা Registrar of Joint Stock Companies and Firms (RJSC)-এর রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি যখন সেই সীমা অতিক্রম করে, তখন কোম্পানিগুলো বা কোম্পানির যেকোনো সদস্য ধারা ৮১(২), ধারা ৮৫(৩) এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ধারা ৩৯৬-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি বেঞ্চে আবেদন করে।

এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত একটি উদার (liberal) ও প্রতিকারমূলক (curative) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। বিলম্বের সন্তোষজনক কারণ দেখানো হলে আদালত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বকেয়া (delayed) এজিএম করার অনুমতি দেন। অনেক ক্ষেত্রে বিলম্বের যথাযথ কারণ না দেখালেও আদালত উদার নীতি গ্রহণ করেন। এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। একটি কোম্পানিকে অনির্দিষ্টকাল আইনি ব্যত্যয়ের মধ্যে রেখে দেওয়া কোম্পানি বা তার শেয়ারহোল্ডার—কারও স্বার্থেই প্রত্যাশিত নয়। বরং এজিএম অনুষ্ঠানের সুযোগ দিয়ে কোম্পানির কার্যক্রমকে আবার আইনের ধারায় ফিরিয়ে আনাই অধিকতর কার্যকর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উদারতা কত দূর পর্যন্ত যাওয়া উচিত?

এজিএমে বিলম্ব মার্জনার আবেদনে সাধারণত বলা হয়, বিলম্বটি ইচ্ছাকৃত ছিল না অথবা নির্ধারিত সময়ে সভা করতে না পারার যথেষ্ট কারণ ছিল। এমন বক্তব্য যদি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও দলিল দিয়ে সমর্থিত হয় এবং দেখা যায় যে পরিস্থিতি সত্যিই কোম্পানি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, তাহলে বিলম্ব মার্জনার যথেষ্ট যুক্তি থাকতে পারে।

কিন্তু শুধু বললেই কি যথেষ্ট যে—‘বিলম্বটি ইচ্ছাকৃত ছিল না’?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন একই কোম্পানি বছরের পর বছর এজিএম করতে ব্যর্থ হয়। প্রথম বছরের বিলম্বের পেছনে কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ থাকতে পারে। কিন্তু একই ঘটনা দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরেও ঘটলে আদালতের অনুসন্ধান স্বাভাবিকভাবেই আরও গভীর হওয়া উচিত। প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর পরিচালকেরা কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? একই ব্যত্যয় যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? আইন মেনে চলার জন্য তাঁরা কি যথাযথ সতর্কতা ও যত্ন দেখিয়েছিলেন?

কারণ, ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভঙ্গ না করা আর আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া – এক বিষয় নয়। কোম্পানির পরিচালক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জানা এবং তা পালনের জন্য যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রত্যাশিত। ফলে শুধু অসৎ উদ্দেশ্য (ill motive) বা অবহেলা (negligence) ছিল না—এটুকু বলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেখতে হবে, তাঁরা সততা ও যুক্তিসংগত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করেছেন কি না এবং সময়মতো আইন পালনের জন্য বাস্তবে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এখানেই ধারা ৩৯৬ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এজিএম করতে দেওয়া এবং এজিএম করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দায়ী পরিচালক বা কর্মকর্তাকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।

ধারা ৮১ ও ৮৫-এর অধীনে আদালত বকেয়া (delayed) এজিএম করার সুযোগ দিতে পারেন। এর উদ্দেশ্য কোম্পানিকে আবার আইনসম্মত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু একই আবেদনে ধারা ৩৯৬-এর অধীনে পরিচালক বা কর্মকর্তাদের দায় থেকে অব্যাহতি চাওয়া হলে ভিন্ন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সততা ও যুক্তিসংগতভাবে কাজ করেছেন কি না এবং সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তাঁকে দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া ন্যায়সংগত হবে কি না—সে প্রশ্নটিও স্বতন্ত্র বিবেচনার দাবি রাখে।

সুতরাং, বিলম্বিত এজিএম করার অনুমতি দেওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট পরিচালক বা কর্মকর্তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্ত করা নয়। কোম্পানি ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে আদালত এজিএম করার অনুমতি দিতে পারেন; একই সঙ্গে বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ধারা ৩৯৬-এর শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না, সেটিও পৃথকভাবে যাচাই করতে পারেন।

এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিলম্ব মার্জনার প্রতিকারমূলক ক্ষমতা যদি কার্যত নিয়মিত দায়মুক্তির (routine amnesty) পথ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আইনে নির্ধারিত AGM অনুষ্ঠান সময়সীমার গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে বছরের পর বছর একই ব্যত্যয় ঘটলেও যদি শুধু ‘অনিচ্ছাকৃত বিলম্ব’ বা ‘যথেষ্ট কারণ’-এর সাধারণ বক্তব্যে দায়মুক্তি পাওয়া যায়, তাহলে আইন মেনে চলার প্রয়োজনীয় তাগিদও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

আইনের উদ্দেশ্য কোম্পানিকে অচল করে দেওয়া নয়; আবার আইনের ব্যত্যয়কে স্বাভাবিক করে তোলাও নয়। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি। কোম্পানির স্বার্থে প্রয়োজন হলে বিলম্বিত এজিএম করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তির দায়মুক্তির প্রশ্নটি বিচার করা উচিত পৃথকভাবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতার সঙ্গে। এতে একদিকে কোম্পানি আবার আইনের ধারায় ফিরে আসবে, অন্যদিকে পরিচালক ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিও অক্ষুণ্ণ থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, করপোরেট সুশাসন (Corporate Governance)-এর মূল কথা শুধু ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া নয়, একই ভুল যেন বারবার না ঘটে সেটিও নিশ্চিত করা। আদালতের প্রতিকারমূলক ক্ষমতা কোম্পানিকে আইনের পথে ফিরিয়ে আনার মাধ্যম; সেই ক্ষমতা যেন আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথ হয়ে না ওঠে। এখানেই এজিএমে বিলম্ব মার্জনার ক্ষেত্রে বিচারিক উদারতা ও করপোরেট জবাবদিহির মধ্যে সঠিক ভারসাম্যের প্রয়োজন।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।