শামস নজীব অর্ক
শামস নজীব অর্ক

ডিসি/ইউএনও সাহেবদের এলআর ফান্ডের বিতর্ক: প্রশাসনিক পরিপত্র কি আইনের বিকল্প হতে পারে?

শামস নজীব অর্ক : বাংলাদেশে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কখনো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়কখনো সরকারি ক্রয়কখনো বিশেষ তহবিলের ব্যবহার—প্রতিবারই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়: রাষ্ট্রের অর্থ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই ব্যবস্থার জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত? বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসকের বা ইউ এন ও কার্যালয়ের লোকাল রিসোর্স (এলআর) ফান্ড নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছেসেটিও মূলত এই বৃহত্তর প্রশ্নেরই অংশ।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পর্যবেক্ষণে এলআর ফান্ডের অর্থ সংগ্রহব্যয়নিরীক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে কোথাও তহবিল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগকোথাও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগআবার কোথাও প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। এসব প্রশ্নকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ এবং আদালত বা আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত সত্য এক বিষয় নয়। তাই একটি দায়িত্বশীল আলোচনার সূচনা হওয়া উচিত অভিযোগ দিয়ে নয়বরং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিশ্লেষণ দিয়ে।

এই আলোচনায় প্রথম যে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকারতা হলো—এলআর ফান্ড সংবিধানের আওতায় দায়যুক্ত তহবিল বা কন্সোলিডেটেড ফান্ড নয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রণীত কোনো আইন বা বিধিমালা নেই। এটা সম্পূর্ণ একটি অনানুষ্ঠানিক তহবিল যা প্রশাসন ব্যাতীত অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের দ্বারা করা স্বাধীন নীরিক্ষার বাহিরে। তাই এই তহবিলের মর্জি মাফিক ও স্বেচ্ছাধীন ব্যবহারের ব্যাপারে প্রায়ই প্রশ্ন উঠে। যদিও ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জেলা প্রশাসকদের এলআর ফান্ড পরিচালনা-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে (স্মারক নং- ০৪.০০.০০০০.৫২১.০২.০৩৪.১৫.৪৮২)। কিন্তু একটা প্রশাসনিক পরিপত্র কি সংসদ প্রণীত আইনের বিক্ল্প হতে পারে যেখানে বিষয়টি প্রজাতন্ত্রের আর্থিক তহবিল সম্পর্কিত? সংবিধান আইন প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদকে প্রদান করেছে। তাহলে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের মত একটি চুড়ান্ত এক্সিকিউটিভ ফোরাম (যার সচিব আবার এডমিন ক্যাডারের ই কর্মকর্তা) কিভাবে নির্বাহী বিভাগে অংশ হয়ে রাষ্ট্রের অপর আরেকটি অংগ আইন বিভাগ বা সংসদ কে পাশ কাটিয়ে পরিপত্র জারী করতে পারে?

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইনের শাসন কেবল আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়বরং আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যেই তার প্রকৃত সাফল্য নিহিত। একটি উৎকৃষ্ট আইনও বাস্তবে প্রয়োগ না হলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে। তাই এলআর ফান্ডের বিতর্ককে ‘আইন আছে কি নেই’—এই সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আইন কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে’—এই বৃহত্তর প্রশ্নে মূল্যায়ন করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি অর্থের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা নয়বরং ট্রাস্টি-সুলভ দায়িত্ব স্বীকৃত। অর্থাৎ রাষ্ট্র জনগণের অর্থের অভিভাবকমালিক নয়। সেই কারণেই সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে বৈধতাস্বচ্ছতানিরীক্ষা এবং জবাবদিহির নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো তহবিলের উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক না কেনযদি তার পরিচালনাপদ্ধতি নাগরিকের কাছে অস্পষ্ট থাকেতবে জনবিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার উল্টোভাবেএকটি স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য ব্যবস্থা কেবল অনিয়ম প্রতিরোধই করে নাসৎ প্রশাসনকেও অযথা অভিযোগের হাত থেকে রক্ষা করে।

এখানেই এলআর ফান্ড নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি নিহিত। প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট জেলা প্রশাসকের নয় কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জেলার হিসাবেরও নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস- জনগণের। একটি প্রশাসনিক তহবিলের ক্ষেত্রে নাগরিক কী জানবেনতহবিলের অর্থের উৎস কীব্যয়ের অনুমোদন কীভাবে হয়নিরীক্ষা কে করেসেই নিরীক্ষার ফলাফল কি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্তএসব প্রশ্নের উত্তর যদি সহজে পাওয়া না যায়তবে বিতর্কের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ কারণেই এলআর ফান্ডের আলোচনাকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে একটি নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে দেখা জরুরি। রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নাগরিকের আস্থা কেবল প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে নাসেই আস্থা গড়ে ওঠে তখনইযখন রাষ্ট্রের প্রতিটি আর্থিক ব্যবস্থা স্পষ্ট আইনকার্যকর নিরীক্ষা এবং উন্মুক্ত জবাবদিহির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের সংবিধান সরকারি অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে কী নির্দেশনা দেয়এবং সেই সাংবিধানিক দর্শনের আলোকে এলআর ফান্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিতএই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সংবিধানের আর্থিক কাঠামোপ্রশাসনিক আইনের মৌলিক নীতি এবং সুশাসনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দিকে তাকাতে হবে। কারণ এলআর ফান্ডের বিতর্কের প্রকৃত গুরুত্ব কোনো একক তহবিলের সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক জবাবদিহির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

রাষ্ট্রের অর্থরাষ্ট্রের জবাবদিহি: সংবিধান যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে

এলআর ফান্ড নিয়ে চলমান বিতর্কের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কোনো তহবিলের বৈধতা কেবল তার প্রশাসনিক উপযোগিতা দিয়ে নির্ধারিত হয় নাবরং তা নির্ধারিত হয় তার আইনগত ভিত্তিআর্থিক জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের মাধ্যমে। এই কারণেই এলআর ফান্ডের আলোচনা শুরু হওয়া উচিত সংবিধান থেকে।

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কারণ সরকারি অর্থ কোনো সরকারি কর্মকর্তার নয়কোনো মন্ত্রণালয়েরও নয়এটি প্রজাতন্ত্রের অর্থযার প্রকৃত মালিক জনগণ। রাষ্ট্র কেবল সেই অর্থের অভিভাবক বা ট্রাস্টি। ফলে রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত প্রতিটি অর্থের উৎসব্যবহার এবং হিসাব সম্পর্কে নাগরিকের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক শর্ত।

এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে– “ সরকারী অর্থের রক্ষণাবেক্ষণক্ষেত্রমত সংযুক্ত তহবিলে অর্থপ্রদান বা তাহা হইতে অর্থ প্রত্যাহার কিংবা প্রজাতন্ত্রের সরকারী হিসাবে অর্থপ্রদান বা তাহা হইতে অর্থ প্রত্যাহার এবং উপরি-উক্ত বিষয়সমূহের সহিত সংশ্লিষ্ট বা আনুষঙ্গিক সকল বিষয় সংসদের আইন-দ্বারা এবং অনুরূপ আইনের বিধান না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত বিধিসমূহ-দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইবে।” অর্থাৎ সংসদ প্রনীত আইন দ্বারা ভিন্নভাবে বিধান না থাকলে প্রজাতন্ত্রের সব রাজস্ব সংযুক্ত তহবিলে (Consolidated Fund) বা ক্ষেত্র মতে জনগ্ণ হতে সংগ্রহীত টাকা প্রজাতন্ত্রের সরকারী হিসেবে জমা হবে যা আইন দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের সব অর্থ একটি অভিন্ন সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনাযাতে কোনো সরকারি অর্থ আইন ও সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত না হয়।

এখানেই এলআর ফান্ডকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নটি উঠে আসে। এলআর ফান্ডে জমা হওয়া অর্থের প্রকৃতি কীএটি কি সংবিধানের অর্থে “প্রজাতন্ত্রের রাজস্ব”নাকি একটি বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত পৃথক তহবিলএই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এলআর ফান্ডকে সরাসরি সাংবিধানিক বা অসাংবিধানিক ঘোষণা করা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়তেমনি এই প্রশ্নকে অপ্রয়োজনীয় বলাও সঠিক হবে না। বরং এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে সংবিধানের আর্থিক বিধানগুলো কোন পরিসরে প্রযোজ্য হবে।

সংবিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (Comptroller and Auditor General) সাংবিধানিক অবস্থান। ১২৮ থেকে ১৩২ অনুচ্ছেদে এই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অন্তর্নিহিত দর্শন স্পষ্ট—সরকার অর্থ ব্যয় করবেকিন্তু সেই ব্যয়ের বৈধতানিয়মানুবর্তিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে জনগণের পক্ষে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করবে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ কারণেই নিরীক্ষা কেবল হিসাবের অঙ্ক মেলানোর প্রক্রিয়া নয়এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অন্যতম প্রধান উপায়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নিরীক্ষা হচ্ছে কি না—এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণতেমনি নিরীক্ষার ফলাফল কতটা কার্যকরকতটা স্বচ্ছ এবং কতটা জনসমক্ষে উন্মুক্ত—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি নিরীক্ষা যদি কেবল দাপ্তরিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকেতাহলে তার গণতান্ত্রিক মূল্য অনেকাংশে কমে যায়। আধুনিক সুশাসনের ধারণা বলছেজনগণের অর্থ সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এই কারণেই তথ্যপ্রকাশউন্মুক্ত হিসাব এবং স্বাধীন নিরীক্ষাকে এখন আর আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হয় নাবরং এগুলো একই জবাবদিহি কাঠামোর পরস্পর-সম্পূরক অংশ।

এলআর ফান্ডের বিতর্কের আলোচনায় এই সাংবিধানিক নীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আরও একটি কারণে। কারণ বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে কেবল অর্থের পরিমাণ নয়বরং অর্থ ব্যবস্থাপনার কাঠামো। যদি কোনো প্রশাসনিক তহবিলের জন্য লিখিত নির্দেশনা থাকেতাহলে সেই নির্দেশনার আলোকে নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণনিরীক্ষাতথ্যপ্রকাশ এবং তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এটিই মূল্যায়নের বিষয় হওয়া উচিত। অর্থাৎ প্রকৃত প্রশ্ন হলোআইনের অস্তিত্ব নয়আইনের কার্যকারিতা।

এই আলোচনায় আরেকটি বিষয় স্মরণযোগ্য। প্রশাসনিক আইন কখনো ধরে নেয় না যে প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা অসৎ। আবার এটিও ধরে নেয় না যে সবাই সবসময় নির্ভুলভাবে কাজ করবেন। সেই কারণেই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যক্তির সততার ওপর নয়প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপর নির্ভর করে। একটি ভালো প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তোলা হয়যাতে সৎ কর্মকর্তা অযথা সন্দেহের শিকার না হন এবং অসৎ কর্মকর্তা সহজে নিয়মের ফাঁক ব্যবহার করতে না পারেন। এই দর্শন থেকেই স্বচ্ছতালিখিত নীতিমালানিরীক্ষা এবং তথ্যপ্রকাশের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

তাই এলআর ফান্ড নিয়ে প্রকৃত বিতর্ক কোনো ব্যক্তি বা কোনো জেলার বিরুদ্ধে নয়। বিতর্কটি একটি প্রশাসনিক কাঠামোকে ঘিরে। সেই কাঠামো কি সংবিধানের আর্থিক জবাবদিহির চেতনাকে যথাযথভাবে ধারণ করছেবিদ্যমান পরিপত্র ও প্রশাসনিক নির্দেশনা কি বাস্তবে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছেনাকি কাগজে থাকা নিয়ম ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছেএই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—সমস্যার নাম আইননাকি প্রয়োগ।

পরিপত্র আছেকিন্তু প্রশ্ন কেন রয়ে গেল?

যদি ২০১৬ সালের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রের মাধ্যমে এলআর ফান্ড পরিচালনার একটি প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়ে থাকেতাহলে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন সামনে আসে—এক দশক পরও এই তহবিলকে ঘিরে এত বিতর্ক কেনএই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিআইবির পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি প্রতিক্রিয়াকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ এসেছে যে অনেক জেলায় এলআর ফান্ডে অর্থ সংগ্রহব্যয় এবং হিসাব সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একরূপতা নেই। কোথাও অনুদান গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছেকোথাও ব্যয়ের খাত নিয়েআবার কোথাও নিরীক্ষা ও তথ্যপ্রকাশের পর্যাপ্ততা নিয়ে। আবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কর্তৃক তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর আওতায় তথ্য চাইতে গেলেও সংশ্লিষ্ট ডিসি অফিস গুলো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে সরকারি পর্যায় থেকে বলা হয়েছেএলআর ফান্ড পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনা রয়েছে এবং নিরীক্ষা-সংক্রান্ত ব্যবস্থাও বিদ্যমান। অর্থাৎ জনপরিসরে দুটি ভিন্ন বর্ণনা বিদ্যমান—একদিকে স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগঅন্যদিকে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি আস্থা।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি সঠিক—সেটি নির্ধারণ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলোকেন এই দুই ধরনের বর্ণনা একই সঙ্গে বিদ্যমানএকটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি বাস্তবে কার্যকরস্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হয়তাহলে তার সম্পর্কে এমন মৌলিক প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার কথা নয়। তাই সমস্যার গভীরে যেতে হলে অভিযোগ নয়কাঠামোকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

টিআইবি বিভিন্ন সময়ে এলআর ফান্ডের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাজবাবদিহিনিয়মিত নিরীক্ষা এবং তথ্যপ্রকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। লক্ষ্য করার বিষয় হলোতাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ব্যবস্থার সংস্কারকেবল তহবিলের বিলুপ্তি নয়। এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি স্বীকার করে যে প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি তহবিল থাকতে পারেকিন্তু সেই তহবিলের বৈধতা শেষ পর্যন্ত তৎসংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা, স্বাধীন কমিশনের নিরীক্ষার উপর নির্ভর করবে কোনো নির্বাহী পরিপত্রের উপর নয়

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যের সহজলভ্যতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রশাসনিক তহবিল সম্পর্কে মৌলিক তথ্য—যেমন বার্ষিক আয়ব্যয়নিরীক্ষার সারসংক্ষেপ এবং পরিচালনা-সংক্রান্ত নীতিমালা—নাগরিকের জন্য সহজে প্রাপ্ত হওয়া উচিত। তথ্য অধিকার আইন২০০৯–এর চেতনাও রাষ্ট্রকে আরও উন্মুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করার দিকে নির্দেশ করে। ফলে প্রশ্নটি কেবল আইনি বাধ্যবাধকতার নয়এটি গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও প্রশ্ন।

এখানেই ‘Paper Compliance’ এবং ‘Practical Compliance’-এর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কাগজে নিয়ম থাকা এবং মাঠপর্যায়ে সেই নিয়মের কার্যকর বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তখনইযখন দেখা যায় আইনের নির্দেশনা বাস্তবে কতটা অনুসৃত হচ্ছে। এলআর ফান্ডকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কও মূলত এই ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়। যদি নিয়ম বাস্তবে যথাযথভাবে কার্যকর হয়তবে সেই বাস্তবায়নের প্রমাণও জনসমক্ষে দৃশ্যমান হওয়া উচিত। আর যদি কোথাও ঘাটতি থাকেতবে সেটি অস্বীকার না করে সংস্কারের মাধ্যমে দূর করাই সুশাসনের পরিচয়।

অতএবএলআর ফান্ডের বিতর্ক কে ঘিরে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো কি স্বচ্ছতানিরীক্ষাতথ্যপ্রকাশ এবং জনজবাবদিহির যে মানদণ্ড একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যাশিততা কি বাস্তবে নিশ্চিত করতে পেরেছেকারণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে ঘোষণায় নয়কার্যকর বাস্তবায়নে।

সমাধান কোথায়: আইন প্রণয়ন, জবাবদিহির সংস্কার

এলআর ফান্ড নিয়ে চলমান বিতর্কের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—এটি আমাদের সরকারি অর্থব্যবস্থার একটি বৃহত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিশেষ তহবিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের বহু দেশেই জরুরি প্রশাসনিক ব্যয়স্থানীয় উন্নয়ন বা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিশেষ তহবিল রয়েছে। কিন্তু সেই তহবিলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে একটি মৌলিক নীতির ওপর—জনগণ যেন জানতে পারে অর্থ কোথা থেকে এলোকোথায় ব্যয় হলো এবং সেই ব্যয়ের জন্য কে জবাবদিহি করবেন সর্বোপরি আইনের শাসন ও আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা

বাংলাদেশেও এলআর ফান্ডকে ঘিরে আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই মানদণ্ড অর্জন করা। কারণ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হয় কেবল তখনইযখন সেই ব্যবস্থা ব্যক্তি-নির্ভর না হয়ে প্রতিষ্ঠান-নির্ভর হয়ে ওঠে। একজন সৎ জেলা প্রশাসকের জন্য যেমন একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো সুরক্ষা তৈরি করেতেমনি অনিয়মের সুযোগও সীমিত করে। তাই স্বচ্ছতা কখনো প্রশাসনের প্রতিপক্ষ নয়বরং দক্ষ প্রশাসনের অন্যতম ভিত্তি।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েকটি সংস্কার এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমতএলআর ফান্ড পরিচালনার সম্পূর্ণ নীতিমালাপ্রযোজ্য পরিপত্রব্যয়ের অনুমোদিত খাত এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম সরকারিভাবে একত্রে প্রকাশ করা উচিত। প্রয়োজনে সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে তহবিলটি কীভাবে পরিচালিত হবেসেই তথ্য জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করার নির্দেশনা দেওয়া সুশাসনের প্রাথমিক শর্ত।

দ্বিতীয়তপ্রতিটি জেলার এলআর ফান্ডের বার্ষিক আয়ব্যয়উদ্বৃত্ত অর্থ এবং নিরীক্ষার সারসংক্ষেপ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্তমানে সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের যে ধারা গড়ে উঠেছেতার সঙ্গে এই উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

তৃতীয়তনিরীক্ষা-ব্যবস্থাকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করা প্রয়োজন। নিরীক্ষা কেবল সম্পন্ন হলেই যথেষ্ট নয়নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ এবং গৃহীত সংশোধনমূলক ব্যবস্থাও নির্দিষ্ট পরিসরে জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। এতে নাগরিকের আস্থা যেমন বাড়বেতেমনি প্রশাসনের ওপর অযথা সন্দেহও কমবে।

চতুর্থততথ্য অধিকার আইন২০০৯–এর আলোকে এলআর ফান্ড-সংক্রান্ত তথ্যের স্বতঃপ্রকাশ (proactive disclosure) বাড়ানো উচিত। নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদাভাবে আবেদন করতে বাধ্য করার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা—উভয়ই বৃদ্ধি করবে।

পঞ্চমতদীর্ঘমেয়াদে কেবল প্রশাসনিক পরিপত্রের ওপর নির্ভর না করে এই ধরনের তহবিল পরিচালনার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইন বা বিধিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে তহবিলের উদ্দেশ্যঅর্থের উৎসব্যয়ের সীমানিরীক্ষাজবাবদিহিতা এবং তদারকির কাঠামো স্পষ্ট হবে। প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রয়োজনীয় হলেওএকটি আইন অধিকতর স্থায়িত্বস্বচ্ছতা এবং আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করে।

এলআর ফান্ডকে ঘিরে বিতর্ক তাই শেষ পর্যন্ত একটি সুযোগও বটে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সুশাসনের প্রকৃত শক্তি কোনো একক কর্মকর্তার সততায় নয়বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেযেখানে নিয়ম ব্যক্তি-নির্ভর নয়বরং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে টেকসই সংস্কার হলো সেই সংস্কারযা ক্ষমতার ওপর নয়নিয়মের ওপর আস্থা গড়ে তোলে।

সবশেষেএলআর ফান্ড নিয়ে আজকের বিতর্কের উত্তর কোনো একপক্ষের জয় বা পরাজয়ে নেই। উত্তরটি রয়েছে একটি মৌলিক নীতিতে—রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত প্রতিটি অর্থের উৎসব্যবহার এবং হিসাব সম্পর্কে নাগরিকের জানার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই এলআর ফান্ডকে ঘিরে বিতর্কের বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই প্রশমিত হবে।

আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা আইন প্রণয়নে নয়তার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রয়োগে। এলআর ফান্ড আমাদের আবারও সেই চিরন্তন সত্যটির কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নটি তাই আইন আছে কি নেই—সেটি নয়। প্রশ্ন হলোআইন ও প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে যে জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছেতা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেইবরং এর স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আপত্তিবাস্তবতা ও আইনের উত্তর

এলআর ফান্ড নিয়ে যেকোনো আলোচনায় একটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে—জেলা প্রশাসক যদি এই ধরনের একটি তহবিল ব্যবহার করতে না পারেনতাহলে হঠাৎ উদ্ভূত জনকল্যাণমূলক বা মানবিক প্রয়োজনে কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেনপ্রাকৃতিক দুর্যোগঅসহায় মানুষের জরুরি সহায়তারাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অতিথির আগমনকিংবা স্থানীয় পর্যায়ের এমন কিছু প্রশাসনিক প্রয়োজন থাকেযার জন্য অনেক সময় প্রচলিত বাজেট প্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত ধীর। ফলে প্রশাসনের হাতে একটি সীমিতনিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক তহবিল থাকা প্রশাসনিকভাবে অযৌক্তিক নয়।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। কোনো তহবিলের প্রয়োজনীয়তা এবং সেই তহবিলের পরিচালনাপদ্ধতির বৈধতা এক বিষয় নয়। একটি তহবিল রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারেকিন্তু সেই কারণেই সেটি স্বচ্ছতানিরীক্ষা কিংবা জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে পারে না। আইনের শাসনের মূল শিক্ষা হলো—যত বেশি ক্ষমতাতত বেশি জবাবদিহি।

আরেকটি যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়—সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদ থাকলেও সব সরকারি অর্থ কি সংযুক্ত তহবিলে (Consolidated Fund) জমা দিতে হবেএর উত্তরও সরল নয়। সংবিধান নিজেই বলছে, “আইন দ্বারা ভিন্নরূপে বিধান না থাকিলে” রাজস্ব সংযুক্ত তহবিলে জমা হবে। অর্থাৎ সংবিধান ব্যতিক্রমের সুযোগ রেখেছে। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমও আইন ও বৈধ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। ব্যতিক্রম কোনো শূন্যস্থান নয়বরং সেটিও আইনের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। ফলে এলআর ফান্ডের ক্ষেত্রেও প্রকৃত প্রশ্ন হলো—বিদ্যমান আইনবিধি বা প্রশাসনিক নির্দেশনা সেই ব্যতিক্রমকে কতটা স্পষ্টনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০১৬ সালের পরিপত্র কি নিজেই যথেষ্ট আইনগত ভিত্তিপ্রশাসনিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পরিপত্র নির্বাহী নির্দেশনা হিসেবে কার্যকর হতে পারে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তা বাধ্যতামূলকও হতে পারে। কিন্তু কোনো পরিপত্র সংসদে প্রণীত আইনের বিকল্প নয়। যদি কোনো প্রশাসনিক তহবিল দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত হয়বিপুল পরিমাণ অর্থ সেখানে লেনদেন হয় এবং তা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠেতাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট আইন বা বিধিমালার প্রয়োজনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। কারণ আইন সংসদীয় তদারকিবিচারিক পর্যালোচনা এবং নাগরিকের অধিকার—এই তিনটির জন্যই অধিকতর শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

অনেকে আবার বলেননিরীক্ষা যদি হয়েই থাকেতাহলে এত বিতর্ক কেনবাস্তবতা হলোনিরীক্ষা এবং জনবিশ্বাস এক জিনিস নয়। একটি নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণতেমনি সেই নিরীক্ষার পরিধিস্বাধীনতাপর্যবেক্ষণ এবং ফলাফলের স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরীক্ষার উদ্দেশ্য শুধু হিসাবের ভুল ধরা নয়বরং জনগণকে এই নিশ্চয়তা দেওয়া যে রাষ্ট্রের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই নিরীক্ষা যত বেশি উন্মুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হবেঅযথা বিতর্কও তত কমবে।

আরেকটি আপত্তি হলো—অতিরিক্ত স্বচ্ছতা আরোপ করলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যাবে। এই যুক্তিও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়বরং পরিপূরক। আজ সরকারি ক্রয়ভূমি রেকর্ডকর প্রদানপাসপোর্টআদালতের কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জবাবদিহি বাড়িয়েছেকিন্তু প্রশাসনকে অচল করেনি। এলআর ফান্ডের ক্ষেত্রেও বার্ষিক হিসাবনিরীক্ষার সারসংক্ষেপ এবং ব্যয়ের মৌলিক তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা প্রশাসনের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হওয়ার কথা নয়বরং এটি প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা বাড়াবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবেএলআর ফান্ড নিয়ে বিতর্কের প্রকৃত সমাধান কোনো একটি পক্ষকে সঠিক বা ভুল প্রমাণ করার মধ্যে নেই। সমাধান হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাযেখানে ভবিষ্যতে আর এই ধরনের প্রশ্নই না ওঠে। আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনইযখন কোনো প্রতিষ্ঠানের সততা প্রমাণ করার জন্য ব্যক্তির চরিত্রের ওপর নির্ভর করতে হয় নাবরং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়মস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই সেই আস্থার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণেই এলআর ফান্ড নিয়ে বিতর্ককে কেবল একটি প্রশাসনিক তহবিলের সীমিত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের আর্থিক শাসনসাংবিধানিক জবাবদিহি এবং সুশাসনের মানদণ্ডের একটি পরীক্ষাও বটে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পথ আরও বেশি গোপনীয়তা নয়বরং আরও বেশি আইনগত স্পষ্টতাপ্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং কার্যকর জবাবদিহি।

লেখক: শামস নজীব অর্ক; সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার, প্রথম আলো।