মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ
মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ

লাস্ট সিন থিওরি: একটি আইনি উপাখ্যান

১.

স্যার, আমরা দিন-রাত রক্ত-ঘামে তদন্ত করি, এতো এতো সাক্ষী খুঁজি, আলামত সংগ্রহ করি, আসামি গ্রেপ্তার করি; অথচ শেষ পর্যন্ত আদালত সব আসামিকে খালাস দিয়ে দেন!

প্রশিক্ষণ কক্ষে উপস্থিত এক তদন্তকারী কর্মকর্তার কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা একসঙ্গে ঝরে পড়ল। কয়েক বছর আগের কথা। একটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে রিসোর্স পারসন হিসেবে ক্লাস নিচ্ছিলাম।

এমন কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর ধীরে বললাম, “খালাসের পেছনে সাক্ষ্য-প্রমাণের অপর্যাপ্ততা, তদন্তের ত্রুটিসহ নানা কারণ থাকতে পারে। অধিকাংশ মামলা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়, যার অনেক কিছুই প্রকাশ্য প্রতিবেদনে আসে না। তবে আজ সে বিষয়ে নয়; বরং বলব, ন্যূনতম অথচ যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত কীভাবে অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠা করে দণ্ড নিশ্চিত করতে পারে।”

কক্ষে একটা নীরবতা নেমে এলো।

আমি আবার বললাম, “আজ আপনাদের এমন এক হত্যা মামলার গল্প শোনাবো, যেখানে কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না। তবুও মাত্র ছয়জন সাক্ষীর বর্ণনায় সত্য যেন সূর্যের মতো উদ্ভাসিত হয়েছিল।”

সবাই অবাক হলো। কেউ একজন বলে উঠলেন, “চাক্ষুষ সাক্ষী ছাড়াই?

আমি মৃদু হাসলাম।

হ্যাঁ। কখনও কখনও নীরব প্রমাণই বজ্রের মতো গর্জে ওঠে, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে। শুনুন তবে…

২.

রাত ঠিক ৮টা। ধূলিধূসরিত মিরপুর বাস স্ট্যান্ডের কোণে হঠাৎ এক আর্তনাদ!

রাস্তার পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে আছে তরুণ আলমগীর কবির। বুকে আর পেটে ধারালো ছুরির গভীর ক্ষত। খবর পেয়ে বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন হাসপাতালে ছুটলেন দিশেহারা হয়ে। কিন্তু হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ডাক্তারের এক শীতল উচ্চারণ সব শেষ করে দিল— “হি ইজ নো মোর।”

২৪ অক্টোবর, ১৯৯২ সালের এই রক্তভেজা দৃশ্যটির শুরু কিন্তু হয়েছিল আরও কয়েক ঘণ্টা আগে।

শরতের রক্তিম বিকেলে আলমগীরের ভাড়া বাড়িতে কড়া নেড়েছিল গ্রামের চেনা মুখ মোঃ রবিউল ইসলাম। এরপর একে একে সেখানে জড়ো হয় বিল্লাহ, মিরাজ আর সাইফুল ইসলাম। সামান্য আড্ডা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সাইফুলের মিষ্টি কিন্তু চতুর আহ্বান, “আলমগীর, একটু বাইরে আয়, কথা আছে।”

সরল আলমগীর উঠে দাঁড়াল। সাইফুল, বিল্লাহ ও তাদের সঙ্গী দুলালের মায়াবী ছায়ায় গিলে খেল তাকে। শহরের গলির অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল তারা, যেখান থেকে আলমগীর আর কখনো জীবন্ত ফিরে আসেনি।

৩.

ভিকটিমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার সূত্র ধরে পুলিশ দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাইফুল ইসলামকে।

সাইফুলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেই উন্মোচিত হয় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা এক বিষাক্ত প্রেমোপাখ্যান।

আলমগীরের সাথে প্রতিবেশী মুকসেদা আক্তারের প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিল। অন্যদিকে বন্ধুত্বের মুখোশ পরা বিল্লাহও মুকসেদার প্রতি অন্ধভাবে আকৃষ্ট ছিল। প্রত্যাখ্যানের তীব্র ক্ষোভে বিল্লাহ মুকসেদাকে সরাসরি হুমকি দেয়, “আলমগীরের সাথে থাকলে তোর জীবন কেমন হয়, দেখে নিবি!

এই প্রতিহিংসা থেকেই বিল্লাহর ছক আঁকা, আর সাইফুলের মাধ্যমে আলমগীরকে ডেকে আনা।

চার্জশিটের পর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার দায়রা আদালতে এলে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৬ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা করে। কিন্তু P.W.-1 রওশন আরা, P.W.-2 মুকসেদা, P.W.-3 মোঃ রবিউল ইসলাম কিংবা P.W.-4 জাহাঙ্গীরগণ কেউই সরাসরি খুন হতে দেখেননি। অপর দুজন সাক্ষী হলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং চিকিৎসক।

বিচারকক্ষে দু’পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি লড়াই রূপ নিল তীব্র সংঘাতের:

আসামিপক্ষের আইনজীবী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সশব্দে যুক্তি ছুড়লেন, “মাননীয় আদালত! আমার মক্কেলরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। এই মামলায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী নেই! আর সহ-আসামি সাইফুলের যে জবানবন্দির কথা বলা হচ্ছে, তা নিজেকে বাঁচিয়ে সাজানো গল্প মাত্র (Exculpatory)। মুকসেদার বাবা ও মামা এই সম্পর্ক পছন্দ করতেন না, তারাই খুন করে আমার মক্কেলদের ফাঁসিয়েছেন!

রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলি শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে পাল্টা জবাব দিলেন, “মাননীয় আদালত! অন্ধকার রাতে খুন হলে চাক্ষুষ সাক্ষী পাওয়া যায় না। কিন্তু ঘটনার ঠিক আধা ঘণ্টা আগে আসামিরা ভিকটিমকে ডেকে নিয়ে গেল, আর এর পরপরই মিলল তার ক্ষতবিক্ষত লাশ! সাক্ষীদের বর্ণনায় পারিপার্শ্বিক প্রমাণের যে শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে, তাতে আসামিদের ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”

উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ১৯৯৫ সালের ২ অক্টোবর ঢাকার ৩য় অতিরিক্ত দায়রা জজ আসামিদের দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০,০০০ টাকা জরিমানা প্রদান করেন।

৪.

দায়রা আদালতের রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে আসামিরা হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেন। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চে আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি প্রদর্শন করলেন, “মাই লর্ড! কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছাড়া, কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নিম্ন আদালত এই সাজা দিয়েছেন! লাস্ট সিন থিওরি কোনো জাদুদণ্ড নয় যে তা দিয়ে চাক্ষুষ সাক্ষীর অভাব ঢেকে দেওয়া যাবে!

রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শক্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, “মাননীয় আদালত! ‘লাস্ট সিন থিওরি’ (Last Seen Theory) কেবল একটি দুর্বল অনুমান নয়, এটি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের একটি অকাট্য শৃঙ্খল! আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী এই থিওরি প্রয়োগের মূল আবশ্যিক উপাদানগুলো এই মামলায় শতভাগ বিদ্যমান:

  • প্রথমত, সময় ও স্থানের ঘনিষ্ঠতা (Proximity of Time and Place): রাত ৭:৩০ মিনিটে আসামিরা ভিকটিমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিল এবং ঠিক আধা ঘণ্টার মধ্যে রাত ৮:০০ টাতেই মাত্র কয়েক শত গজ দূরে বাস স্ট্যান্ডে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ মিলল। ঘটনার সময় ও মৃত্যুর ব্যবধান এতই কম যে অন্য কারো মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের কোনো সুযোগ বা যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা থাকে না।

  • দ্বিতীয়ত, ঘটনার একক ও একচেটিয়া সম্ভাবনা (Exclusive Knowledge): ভিকটিমকে শেষবার জীবিত অবস্থায় কার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল, তা P.W.-1 রওশন আরা এবং P.W.-3 রবিউল ইসলাম অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছেন।

  • তৃতীয়ত, ১০৬ ধারার আইনি দায়িত্ব (Burden under Section 106): সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারা অনুযায়ী, আলমগীরকে জীবিত অবস্থায় সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল, তা আসামিদের ‘বিশেষ জ্ঞানে’ (Special Knowledge) ছিল। ভিকটিম কীভাবে মারা গেল—এর একক ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার আইনি দায় আসামিদের ওপরই বর্তায়। তারা ব্যর্থ হলে বিচারিক আদালত আসামির বিরুদ্ধে প্রতিকূল অনুমান (Adverse Presumption) গঠন করতে বাধ্য!

হাইকোর্ট বিভাগ উভয় পক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা করে পর্যবেক্ষণ দেন যে, P.W.-2 মুকসেদার সাক্ষ্যে আসামির সুনির্দিষ্ট ‘উদ্দেশ্য’ (Motive) প্রমাণিত এবং আসামিরা সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারার অধীনে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে হাইকোর্ট বিভাগ বিচার আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

৫.

হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসামিপক্ষ দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় আপিল বিভাগে পৌঁছায়। বিচারালয়ের থমথমে পরিবেশে শুরু হয় দুই বাঘা আইনজীবীর চূড়ান্ত বাকযুদ্ধ।

আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নথিপত্র ঝাঁকিয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন ভঙ্গিতে যুক্তি ছুড়লেন, “মাই লর্ড! বিচারিক ভুল হয়েছে! ‘লাস্ট সিন থিওরি’ দিয়ে সাজা দিতে হলে প্রমাণের শৃঙ্খল এমন হতে হবে যেন তা আসামির নির্দোষিতার প্রতিটি যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাতিল (exclude all reasonable hypotheses of innocence) করে দেয়!

এখানে P.W.-3 মোঃ রবিউল ইসলাম একজন দৈব সাক্ষী (Chance Witness)। আর সহ-আসামি সাইফুলের জবানবন্দি ছিল নিজেকে বাঁচিয়ে কথা বলা (Exculpatory narrative), যা সাক্ষ্য আইনের ৩০ ও ১১৪(বি) ধারা অনুযায়ী অন্য আসামির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা আইনি অপরাধ! কে সরাসরি ছুরি চালিয়েছিল তার কোনো অকাট্য প্রমাণ ছাড়া ৩০২ ধারায় এই সাজা টিকতেই পারে না, মাই লর্ড!

এজলাসে মৃদু গুঞ্জন উঠল। চশমার ফাঁক দিয়ে বিচারক মহোদয় তাকাতেই রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (DAG) টেবিল চাপড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

“ক্ষমা করবেন, মাই লর্ড! আপিলকারী পক্ষ প্রমাণের অবিচ্ছিন্ন শৃঙ্খলকে ভেঙে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন!” ডিএজি সাহেবের কণ্ঠ গমগম করে উঠল, “আমরা কেবল একটি প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। লাস্ট সিন থিওরির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘটনার পরপরই আসামি বিল্লাহর দীর্ঘ এক বছরের পলাতকাবস্থা (Abscondence), যা সাক্ষ্য আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী তার অপরাধবোধের স্পষ্ট আচরণগত প্রমাণ!

ভিকটিমকে ডেকে নেওয়ার পর গলির অন্ধকারে কী ঘটেছিল—সেই বিশেষ সত্যটি লুকানোর জন্য আসামি বিল্লাহ আজও নীরব! এই নিস্তব্ধতাই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অকাট্য প্রমাণের শৃঙ্খল গঠন করে। নির্দোষ হলে সে ব্যাখ্যা দিল না কেন? কেন উধাও হয়ে গেল?

উভয় পক্ষের শাণিত যুক্তি, নজির এবং সাক্ষ্য আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর আপিল বিভাগের বিচারপতিরা ঐতিহাসিক রায়ের দিকে এগিয়ে যান। রুদ্ধশ্বাস এক থ্রিলারের মতো থমকে থাকে গোটা এজলাস।

৬.

অবশেষে, দীর্ঘ ও রুদ্ধশ্বাস বিচারিক যাত্রার পর এজলাসের নিস্তব্ধতা চিরে গম্ভীর কণ্ঠে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা রায়ের চুম্বক অংশ পাঠ করতে শুরু করলেন।

বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট ও স্পষ্টভাষী— “প্রত্যক্ষদর্শীর অনুপস্থিতিতেও যে ন্যায়বিচার অটল থাকতে পারে, এই মামলা তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”

আদালত একে একে প্রমাণের কুয়াশা সরাতে লাগলেন:

মিরপুর বাস স্ট্যান্ডে ভিকটিম আলমগীরের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারের পর তদন্তের মোড় ঘুরেছিল আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। যদিও সাইফুল কৌশলে নিজেকে মূল অপরাধ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার বক্তব্য থেকে বিল্লাহর সরাসরি নির্দেশ ও ষড়যন্ত্রের চিত্র পরিষ্কার ধরা পড়ে। আদালত বিজ্ঞ আইনজীবীর দাবি খারিজ করে ঘোষণা করেন, সহ-আসামির এই আংশিক স্বীকারোক্তিকে একা বিবেচনা করা হয়নি, নথিতে এর সমর্থনে পর্যাপ্ত অন্যান্য দোষারোপকারী পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য (Other Incriminating Circumstantial Evidence) বিদ্যমান!

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের তীব্র আপত্তি উড়িয়ে আদালত P.W.-3 মোঃ রবিউল ইসলামকে একজন অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করেন। তার সাক্ষ্যেই প্রমাণিত যে, আলমগীরকে হত্যার ঠিক আধা ঘণ্টা আগে বিল্লাহ ও সাইফুলই তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

একইসঙ্গে P.W.-2 মুকসেদার ওপর বিল্লাহর দেওয়া সেই পুরোনো হুমকি এবং প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের তথ্যটি বিল্লাহর গভীর ও বিষাক্ত ‘গোপন উদ্দেশ্য’ (Ulterior Motive) প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে ‘লাস্ট সিন থিওরি’র চূড়ান্ত পেরেকটি পুঁতে দিয়ে বললেন—

ভিকটিমকে শেষবার জীবিত অবস্থায় সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর, তার পরিণতি কী হয়েছিল তার একমাত্র সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার আইনি দায়িত্ব ছিল আসামি বিল্লাহর ওপর। কিন্তু সে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি; বরং ঘটনার পর থেকে টানা এক বছর আত্মগোপনে ছিল। আইনের আদালতে এই দীর্ঘ নীরবতা ও পলাতকাবস্থা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়— এ যেন তার নিজস্ব এক অন্ধকার স্বীকারোক্তি!

তবে প্রধান আঘাতটি কে হেনেছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণের অনুপস্থিতিতে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সরাসরি খুনের সাজা বহাল রাখা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে আদালত মত দেন।

সব পারিপার্শ্বিক প্রমাণের নিখুঁত শৃঙ্খল বিবেচনায় নিয়ে আপিল বিভাগ আসামির আপিল খারিজ করেন এবং বিল্লাহর দণ্ড ৩০২ ধারা থেকে সংশোধন করে দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারায় (হত্যার প্ররোচনা বা Abetment) রূপান্তর করেন।

ধারার পরিবর্তন হলেও, সাজায় কোনো ছাড় মেলেনি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানা সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে! ন্যায়বিচারের সেই চূড়ান্ত হাতুড়ির শব্দে সমাপ্তি ঘটে এক দীর্ঘ আইনি নাটকের।

৭.

গল্প শেষ হতেই প্রশিক্ষণ কক্ষে নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।

এতক্ষণ সবাই চরম মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনলেন। তারপর নিজেদের দিকে তাকালেন যেন হঠাৎ আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতে পেলেন। তারা তো সবসময় হত্যা মামলায় ৩০-৪০ জনের নাম সাক্ষী তালিকায় ঢুকিয়ে দেন।

ফলাফল?

সেই সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে দিতেই পার হয়ে যায় ২০-২৫টা বছর। ততদিনে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়, সাক্ষী হারিয়ে যায়, মামলা নড়বড়ে হতে থাকে।

একজন কর্মকর্তা ধীরে বললেন, “স্যার, তাহলে Last Seen Theory একা যথেষ্ট নয়?

আমি বললাম, “না। শেষবার দেখা যাওয়াটা শুধু একটি link। কিন্তু সময়ের ব্যবধান, motive, আর অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যখন সেই link-গুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়, তখনই তৈরি হয় অপরাধের অকাট্য শৃঙ্খল।”

আমি একটু থামলাম।

তদন্তের আসল কাজ হলো সেই শৃঙ্খলের প্রতিটি কড়ি খুঁজে বের করা। ৪০ জন দুর্বল সাক্ষী নয়; কয়েকজন সঠিক, নির্ভরযোগ্য সাক্ষীই একটা মামলাকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারে।

কক্ষের সবাই তখন নীরব। কিন্তু এই নীরবতা আগের মতো হতাশার ছিল না। এ ছিল উপলব্ধির নীরবতা।

বি.দ্র. সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত। ঘটনাটি Billal Vs. The State, 2000 20 BLD (AD) 192, 5 MLR 2000 (AD) 244 মামলা থেকে নেওয়া।

লেখক: সাইফুল ইসলাম পলাশ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ।