ফাইজুল ইসলাম: সমগ্র মানবজাতির মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সারা পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। বলা হয়ে থাকে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন এমন এক জীবন্ত সত্তা, যিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সারাজীবন কাজ করে গেছেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাসুল (সা.) নিজে একজন সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠা পুরো ইয়াসরিবে (মদিনা) তাঁকে একজন যোগ্য সংগঠক হিসেবে আলোকিত করে। যে নীতি ও বাণী প্রচারের জন্য পরবর্তীতে জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল, সেই একই উদ্দেশ্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র ১৭ বছর বয়সে একটি সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে:
The object of modern institution is to serve the best opportunity for all the human beings. Sometimes the organisations can work specifically for the time being and a specific discourse. But the institutions have the same liability prioritizing the just, equality and perfect humanism.
তিনি শুধু সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি; দীর্ঘকাল ধরে চলা আসাবিয়াহ বা গোত্রীয় যুদ্ধ তিনি একটি দূরদর্শী পরামর্শের মাধ্যমেই থামিয়ে দেন। মক্কার সকল গোত্রপ্রধানকে নিয়ে তিনি নিজে একজন যোগ্য মধ্যস্থতাকারী (Mediator) হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
The duty of the mediator is to solve the dispute by observing the current scenario and the fact of the ongoing dispute.
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এমনই একজন যোগ্য মিডিয়েটর, যার হাত ধরে পুরো ইয়াসরিব সমগ্র আরব ভূখণ্ডে শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
একবার বিচারের সময় বনু মাখযূম গোত্রের এক উচ্চবংশীয় নারী চুরির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাহাবি হযরত জায়েদ বিন হারেস (রা.) সুপারিশ নিয়ে আসেন, যাতে সেই নারীর বিচার লঘু করা হয় বা মাফ করা হয়। তখন মুহাম্মদ (সা.) কড়া ভাষায় বলেছিলেন, “হে আমার উম্মত! আমার পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছে শুধু এই কারণে যে, তারা ধনীদের বিচার না করে আইনকে বৈষম্যমূলকভাবে সমাজে প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম, যদি আমার কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিতাম।” এই ঘটনায় মুহাম্মদ (সা.) কেবল একটি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেননি, বরং ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ‘Equality before law’ বা ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ নীতি বাস্তবে কার্যকর করেছিলেন।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বিস্তারিতভাবে ‘আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আজ পুরো পৃথিবীর আধুনিক বিচার কাঠামো এই ন্যায়বিচার তথা ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ মানদণ্ডে উচ্চারিত হয়।
Without equality, society will never be able to achieve sustainability in judicial proceedings, legal system and legal discussion. Man has the solemn responsibility for establishing judicial equality for the ends of justice.
আল্লাহ তায়ালা হযরত দাউদ (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন: “ইয়া দাউদু, ইন্না জা‘আলনাকা খালিফাতান ফিল আরদি, ফাহকুম বাইনান্নাসি বিল হাক্কি ওয়া লা তাত্তাবি‘ইল হাওয়া…” (অর্থাৎ: হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না)। যেখানে আল্লাহ দাউদ (আ.)-কে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বয়ং ন্যায়বিচারের বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করেছেন।
যে মক্কাবাসীর চরম নির্যাতনের কারণে তাঁকে মক্কা ত্যাগ করতে হয়েছিল, সেই মক্কাবাসীদের তিনি অকাতরে ক্ষমা করে দিয়েছেন মক্কা বিজয়ের মহা আনন্দের দিনে। ক্ষমা করে দিয়েছেন সেই সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের, যারা তাঁকে অধিকারবঞ্চিত ও গৃহহীন করেছিল। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই; আজ সবাই মুক্ত ও নিরাপদ। এমনকি যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে, সেও নিরাপদ।” পুরো জনপদকে তিনি একটি রক্তপাতহীন বিজয়ের মাধ্যমে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন, যা বিশ্ব ইতিহাসে ক্ষমার মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
মজলুমের কষ্টে মহানবী (সা.) সর্বদাই ব্যথিত হয়েছেন। শাসক ও শোষকের মধ্যে শতাব্দীকাল ধরে চলা লড়াই ও দায়িত্বহীনতাকে সামনে রেখে নবী (সা.) এর চিরন্তন বাণী: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।”
তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে নির্মমভাবে রক্তাক্ত হয়েছিলেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কিন্তু তাৎক্ষণিক চরম প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তায়েফবাসীকে ধ্বংস না করে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। International Humanitarian Law (আন্তর্জাতিক মানবিক আইন)-এর একটি প্রধান বিষয়বস্তু হলো ‘Principle of Distinction’, যা যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিক এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে আলাদা করার নীতি নির্দেশ করে। তিনি কতিপয় উৎপাতকারী তায়েফবাসী যারা তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল, তাদের অপরাধের দরুন পুরো তায়েফবাসীর ওপর কোনো সম্মিলিত শাস্তি বা হত্যাযজ্ঞ চালাননি। বরং তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, “আমি আশা করি, এদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ এক আল্লাহর ইবাদত করবে।”
পরবর্তীতে ঠিক তা-ই ঘটেছিল। আবদ ইয়ালাইল ছিলেন তৎকালীন তায়েফের ছাকিফ গোত্রের অন্যতম প্রধান নেতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফে গিয়ে তাঁর কাছে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা চরম অপমানজনকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়নি; পরবর্তীতে ৯ হিজরিতে ছাকিফ গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল মদিনায় আসে, যার নেতৃত্বে ছিলেন এই আবদ ইয়ালাইল। তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিনম্র আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন এমনই এক দূরদর্শী নেতা, যিনি কোনোদিন হঠকারী বা ভুল সিদ্ধান্ত নেননি।
কেবলমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে তিনি ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র অসম মনে হওয়া শর্তাবলীতে স্বাক্ষর করেছিলেন। প্রধান প্রধান সাহাবিগণও প্রাথমিক পর্যায়ে এই চুক্তির কঠোর শর্তগুলোর ব্যাপারে ক্ষুব্ধ বা বিরূপ ছিলেন। কিন্তু সার্বিক শান্তি ও স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠায় পুরো নাজুক পরিস্থিতিকে অসাধারণ বিচক্ষণতায় সামাল দেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর এই রাজনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তকে ‘ফাতহুম মুবিন’ (প্রকাশ্য বিজয়) বলে মহাগ্রন্থে ঘোষণা করেছেন।
Muhammad (Sm.) is the perfect arbitrator in changing the decision based on philosophical identity and rationality. He never clarified the decision for personal achievement, rather establishing the decision for the collective development of the society.
হযরত আলী (রা.) যখন ইয়েমেনে বিচারক (কাজী) হিসেবে প্রেরিত হওয়ার সময় বিচারিক দায়িত্ব পালনে কিছুটা দ্বিধা ও সংকোচ প্রকাশ করেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক আইনি নীতি নির্দেশ করেন। তা হলো—বিচারকের সিদ্ধান্ত যেন কেবল প্রথম পক্ষের শোনানো বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে একপাক্ষিকভাবে প্রদত্ত না হয়। এখানে তিনি আধুনিক আইনশাস্ত্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি দাঁড় করিয়েছেন, যা Natural Justice (প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার)-এর দ্বিতীয় নীতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। অর্থাৎ ‘Audi Alteram Partem’ (No person should be condemned without being given an opportunity to be heard) — কোনো ব্যক্তিকে তার বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো দণ্ড বা সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।
এছাড়াও, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের নীতি হিসেবে কঠোরভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, যুদ্ধের ময়দানে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিরপরাধ সাধকদের কোনো অবস্থাতেই আঘাত করা যাবে না—যা আজকের আধুনিক Humanitarian International Law (আন্তর্জাতিক মানবিক আইন) ও জেনেভা কনভেনশনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
তিনি যুদ্ধের সময় পরিবেশের ক্ষতি না করার ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। বিশ্বরাজনীতিতে যুদ্ধের সময় পরিবেশ রক্ষার আন্তর্জাতিক নীতি বিস্তৃতভাবে গৃহীত হয় ১৯৯৮ সালে রেডমন্ড ও পরবর্তীতে বিভিন্ন কনভেনশনের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, Geneva Convention-এর Additional Protocol I (1977)-এর অনুচ্ছেদ ৩৫ ও ৫৫ অনুযায়ী—এমন যুদ্ধপদ্ধতি বা মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ, যার প্রত্যাশিত ফলাফল হলো পরিবেশের ব্যাপক, দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর ক্ষতি সাধন। অথচ আন্তর্জাতিক আইনের শত শত বছর পূর্বে মানবতার দিশারী মহানবী (সা.) যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষা, ফলজ গাছপালা কর্তন নিষেধ করা, শস্যক্ষেত্র দাহ করা এবং সুপেয় পানিতে বিষ মেশানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে গেছেন।
তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মহামানব। সত্য, ন্যায় ও শুভ্রতার এই প্রতিচ্ছবি সারা জীবন বিচারিক ক্ষেত্রে কালজয়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আইনশাস্ত্রে Burden of Proof (প্রমাণের দায়িত্ব) নিয়ে তিনি যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে গেছেন, তা আজও আধুনিক সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act) অন্যতম মূল ভিত্তি। তিনি স্পষ্ট নীতি ঘোষণা করেছিলেন: “প্রমাণের দায়িত্ব দাবিদারের (বাদী/অভিযোগকারী) ওপর এবং শপথের দায়িত্ব তা অস্বীকারকারীর (বিবাদী/অভিযুক্ত) ওপর।”
আমাদের আইনের শিক্ষার্থী, আইনজীবী, আইন শিক্ষক এবং বিচারকদের জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও বিচারিক আদর্শ অনুকরণীয় আলোকবর্তিকা। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন ন্যায়বিচারের এক পরিপূর্ণ ও কালজয়ী উপাখ্যান। আমাদের সবাইকে অনুসরণ করতে হবে সেই পরম আলোর পথ, যার চিরন্তন রাহবার স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
লেখক: ফাইজুল ইসলাম; লেকচারার, আইন বিভাগ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, এম.ফিল ফেলো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। Email: faijul.law@primeuniversity.edu.bd

