ব্যারিস্টার নাজিয়া আমিন
ব্যারিস্টার নাজিয়া আমিন

মৌখিক তালাকের আইনগত ভিত্তি

নাজিয়া আমিন: তালাক নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা আছে। তালাক দেয়া এবং নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তালাক সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না—যার জন্য পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে হয়। কিছু অঞ্চলে এখনও মানুষ ‘তিন তালাক’ উচ্চারণ করে মনে করেন যে, তালাক সম্পন্ন হয়ে বিবাহিত জীবনের ইতি ঘটেছে। আইনগতভাবে এরূপ মৌখিক তালাকের কোনো ভিত্তি নেই। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, কেবল তালাক উচ্চারণ করে বিয়ের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়। এর জন্য বেশ কিছু ধাপ পার হতে হয়।

সাক্ষীর সম্মুখে মৌখিক তালাক বৈধ কি না?

২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর জামালপুরে তালাকের একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। যেখানে একজন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মৌখিক ভাবে তালাক প্রদান করার পর এলাকার মসজিদের মাইকে তা ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর সমালোচনার শিকার হলে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের লাইভে এসে বলেন যে, এলাকাবাসীকে তালাকের সাক্ষী হিসেবে রাখার লক্ষ্যে তিনি এভাবে তালাকের ঘোষণা দিয়েছেন।

তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় যে, সাক্ষীর সম্মুখে তালাক উচ্চারণ বিবাহ বিচ্ছেদকে বৈধতা প্রদান করে কি না। এর উত্তর হচ্ছে—এরূপ তালাকও আইনসম্মত নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন এমন তালাককে বৈধতা প্রদান করে না যা অনিবন্ধিত ও নোটিশ ব্যতীত প্রদান করা হয়।

তালাকের নোটিশ

লেখার শুরুতেই ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে তালাকের প্রতিটি ধাপ উল্লেখ আছে। উক্ত ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চান তাহলে তালাক ঘোষণার পর যথাশীঘ্র সম্ভব তালাকের নোটিশের এক কপি স্ত্রীর ঠিকানার সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এবং এক কপি স্ত্রীর ঠিকানায় প্রেরণ করবেন। অর্থাৎ, উক্ত নোটিশের দুটি অনুলিপি করতে হবে।

সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠানোর পর একটি সালিশি পরিষদ গঠন হবে। উক্ত সালিশি পরিষদ থেকে আপস-মীমাংসা বা সমঝোতার জন্য উভয় পক্ষকে নোটিশ দেয়া হবে। এর মধ্যে পক্ষদ্বয়ের মীমাংসা না হলে তালাক কার্যকর হবে। তবে পক্ষগণ যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তালাক তুলে নেয়া সম্ভব।

তালাক কার্যকরের সময়সীমা

তালাকের নোটিশ প্রদান করার পর নব্বই (৯০) দিন অতিবাহিত হলেই তালাক কার্যকর হবে। তবে এই নব্বই (৯০) দিন সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদে নোটিশ দেয়ার পর গণনা হয়। অনেকে কেবলমাত্র স্ত্রীর ঠিকানায় নোটিশ প্রেরণ করে মনে করেন যে, তালাকের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ হয়েছে যা সঠিক নয়।

তালাক নিবন্ধন

তালাক যেভাবে বা যেভাবেই উচ্চারিত করা হোক না কেন, পরবর্তীতে নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিকট থেকে তা নিবন্ধন করা আবশ্যক। আমাদের দেশের বাস্তব প্র্যাকটিস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অনেকে তালাক উচ্চারণ বা নোটিশ প্রেরণের সাথে সাথেই তালাক নিবন্ধন করে সার্টিফিকেট তুলে রাখেন। তবে আইন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে উল্লেখিত নব্বই (৯০) দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক নিবন্ধন করতে হয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর মাধ্যমে তালাক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

স্ত্রী কর্তৃক তালাকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন প্রযোজ্য কি না?

স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক-ই-তৌফিজ প্রদান করে থাকেন, তবে স্ত্রী একই ভাবে মৌখিক তালাক উচ্চারণ করে তালাকের নোটিশের এক কপি স্বামীর এলাকার সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এবং আরেক কপি স্বামীর ঠিকানায় প্রেরণ করবেন। চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেয়ার পর নব্বই (৯০) দিন পার হলে তালাক কার্যকর হবে। এক্ষেত্রেও তালাক নিবন্ধিত হবে। অর্থাৎ, তালাক স্বামী বা স্ত্রী যেই দিয়ে থাকুক না কেন আইনি বিধানগুলো অবশ্যই মানতে হবে।

মৌখিক তালাকের ওপর নির্ভর করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটালে তার ফলাফল

আইনের বিধান লঙ্ঘন করে মৌখিক তালাক একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা অনুযায়ী, উক্ত আইন অমান্যকারী ব্যক্তি এক (১) বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ (১০) হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায় যে, সমাজের অহেতুক বিবাহ বিচ্ছেদ রোধ করার উদ্দেশ্যে তালাকের বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি আইনের মাধ্যমে সংযোজন করা হয়েছে। তবে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। তালাকের ওপর আইন প্রণয়ন মানে এই নয় যে, তালাক একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অত্যাচার, সহিংসতা, মানসিক বনিবনা না হওয়া—এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই তালাক দেয়ার অধিকার আছে। এখানে বিষয় হচ্ছে যে, তালাকের সঠিক ধাপগুলো জেনে সে অনুযায়ী তালাক সম্পন্ন করতে হবে।

লেখক: নাজিয়া আমিন; আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ। বার-অ্যাট-ল, লিঙ্কনস ইন। Email: aminnazia@gmail.com