বিপ্লব চন্দ্র দাস : বরগুনার আমতলীতে জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের হাতাহাতির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মামলায় হামলা, মারধর, হত্যাচেষ্টা, বসতবাড়িতে প্রবেশ, স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া ও নারীকে লাঞ্ছিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দ্বিতীয় আসামি মোছা. খালেদা। একই সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যেও মামলার অভিযোগের সঙ্গে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।
ঘটনাটি আমতলী উপজেলার পূর্ব কৃষ্ণনগর এলাকার।
মামলায় হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর একটি বাড়ির উঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১৮ ডিসেম্বর আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন মো. সিদ্দিকুর রহমান।
মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৭ থেকে ৮ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগে হামলা, মারধর, হত্যাচেষ্টা, বসতবাড়িতে প্রবেশ, স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া এবং নারীকে লাঞ্ছিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
খালেদার বিরুদ্ধে লোহার রড দিয়ে আঘাতের অভিযোগ
মামলার অভিযোগে বলা হয়, হামলার সময় দ্বিতীয় আসামি মোছা. খালেদা লোহার রড দিয়ে সেকান্দার আকনের মাথায় আঘাত করেন।
তবে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আঘাতটি মাথায় না লেগে তার পায়ের পাতায় লাগে। এতে পায়ের তৃতীয় মেটাটারসাল হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়। পরে তাকে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া সেকান্দার আকনের স্ত্রী মরিয়মের কানের এক জোড়া স্বর্ণের দুল খুলে নেওয়া এবং তাকে টানাহেঁচড়া করে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও করা হয়েছে।
‘ঘটনাস্থলেই ছিলাম না’
মামলার এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন দ্বিতীয় আসামি মোছা. খালেদা।
তার দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন তার স্বামীর বাড়ি রায়বালা গ্রামে। পরে স্বজনের ফোনে ঘটনার কথা জানতে পারেন। এরপর ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, সেকান্দার আকনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
খালেদার প্রশ্ন, তিনি যদি ঘটনাস্থলেই না থাকেন, তাহলে সেকান্দার আকনের পায়ে আঘাত করবেন কীভাবে?
তার দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর দুই পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন খালেদা। তবে নির্ধারিত সময়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানান তিনি।
এদিকে মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে ১, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর আসামি আদালতের আদেশে জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সেকান্দারের পায়ের আঘাত নিয়ে প্রশ্ন
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি উঠেছে সেকান্দার আকনের পায়ের আঘাত নিয়ে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনার দিন দুই পক্ষের মধ্যে জমি নিয়ে হাতাহাতি হলেও সেকান্দার আকন ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, তার পায়ের আঙুলে আঘাতটি ঘটনার আগেই লেগেছিল।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় ১২ থেকে ১৩ দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সেকান্দার আকনের পায়ের আঙুলে আঘাত লাগে। পরে তিনি এ বিষয়ে চিকিৎসাও নেন।
এমনকি ওই পুরোনো চিকিৎসার কাগজপত্র পরবর্তী সময়ে মামলার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, এক্স-রে রিপোর্ট এবং হাসপাতালের রেজিস্টার পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ঘটনাস্থল নিয়েও ভিন্ন তথ্য
শুধু আঘাতের বিষয়েই নয়, মামলার ঘটনাস্থল নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মামলার লিখিত অভিযোগে ঘটনাস্থল হিসেবে পূর্ব কৃষ্ণনগরের একটি বসতবাড়ির পশ্চিম ভিটির একতলা ভবনের সামনের উঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মামলার প্রথম সাক্ষীর আপন ছোট ভাইয়ের দাবি, ঘটনাটি ঘটেছিল ধানি জমির সীমানার আইলে।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা স্থান এবং আহত ব্যক্তির আপন ভাইয়ের বক্তব্যে এই পার্থক্য কেন—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তদন্তেই মিলবে প্রকৃত সত্য
তবে কোনো মামলায় অভিযোগ আনা মানেই তা প্রমাণিত হওয়া নয়। একইভাবে আসামিপক্ষের দাবি সত্য—এটিও এই পর্যায়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে চিকিৎসা নথি, এক্স-রে রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দায়ের করা এই মামলায় একদিকে রয়েছে মামলার নথিতে উল্লেখিত গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে আসামিপক্ষের সরাসরি অস্বীকার এবং স্থানীয়দের ভিন্ন বক্তব্য। ফলে ঘটনাটি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর মিলবে তদন্ত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায়।

