বিচারের নামে অবিচার বন্ধ হোক

৫৭ বছর পর আদালতের নির্দেশে জমির দখল ফিরে পেল পরিবার, ঢাক পিটিয়ে সীমানা নির্ধারণ

আগে রাজা-বাদশা কিংবা জমিদাররা ঢোল পিটিয়ে সীমানা নির্ধারণ করতেন। সেই পুরোনো রীতির যেন পুনরাবৃত্তিই হলো ফরিদপুরে। ঢাক বাজিয়ে ও লাল পতাকা টাঙিয়ে আদালতের নির্দেশে একটি জমির সীমানা নির্ধারণ করে মালিককে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের চর নশিপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আদালতের নির্দেশে ৫৭ বছর আগে বন্ধক দেওয়া এক একর ৩২ শতক জমির দখল ফিরে পেয়েছে একটি পরিবার।

পাঁচ বছরের জন্য বন্ধক, দুই বছর পরই বিক্রি

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াজ উদ্দিন শেখ ১৯৬৯ সালে এক হাজার ৩০০ টাকার বিনিময়ে পাঁচ বছরের জন্য এক একর ৩২ শতক জমি সদর উপজেলার ডিক্রির চর এলাকার আলম খাঁর কাছে বন্ধক রাখেন।

তবে বন্ধক দেওয়ার মাত্র দুই বছর পরই আলম খাঁ ওই জমি অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন বলে জানা যায়।

পরবর্তীতে ওয়াজ উদ্দিন জমিটি ফেরত চাইলে শুরু হয় নানা টালবাহানা। নিজের জমি ফিরে পেতে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।

২০১০ সালে আদালতের দ্বারস্থ

জমি ফিরে পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন ওয়াজ উদ্দিন শেখ।

তবে নিজের শুরু করা আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি দেখে যেতে পারেননি তিনি। মামলা চলাকালীনই তার মৃত্যু হয়।

এরপর ছেলে মাজেদুর রহমান বাবার করা মামলাটি চালিয়ে যান।

নিম্ন আদালতে মাজেদুর রহমানের পক্ষে রায় আসে। কিন্তু প্রতিপক্ষ একের পর এক আপিল করতে থাকেন। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে আইনি লড়াই।

শেষ পর্যন্ত মামলা করার ১৬ বছর পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে চূড়ান্তভাবে মাজেদুর রহমানের পক্ষে রায় আসে।

আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ অবৈধ স্থাপনা

উচ্চ আদালতের রায়ের পর জমির দখল বুঝে পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে আদালতের নির্দেশে নাজির, সার্ভেয়ার, অ্যাডভোকেট কমিশনার ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

তারা জমিতে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন। এরপর জমির সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে লাল পতাকা টাঙানো হয়।

পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মাজেদুর রহমানকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এ সময় ঢাক পিটিয়ে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় কৌতূহল। অনেকের কাছে ঘটনাটি পুরোনো দিনের রাজা-বাদশা কিংবা জমিদারদের ঢাক পিটিয়ে জমির সীমানা ঘোষণার দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

‘দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ন্যায়বিচার পেয়েছি’

জমির দখল ফিরে পেয়ে মাজেদুর রহমান বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন।

তবে বাবাকে নিয়ে তার আক্ষেপ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, তার বাবা নিজের বন্ধক রাখা জমিটি আবার নিজের দখলে দেখে যেতে পারেননি।

বাবার শুরু করা আইনি লড়াইয়ের ১৬ বছর পর শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের মাধ্যমে সেই জমির দখল ফিরে পেয়েছে তার পরিবার।

মাজেদুর রহমানের ভাষায়, দীর্ঘ ৫৭ বছর পর পরিবারের জমির দখল ফিরে পাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।