বিপ্লব চন্দ্র দাস, আমতলী উপজেলা প্রতিনিধি : বরগুনার আমতলীতে আদালতের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশ থাকা একটি বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক পক্ষের তিনজনকে একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন।
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে আমতলী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খোন্তাকাটা হাজীবাড়ি মসজিদের পেছনে এ ঘটনা ঘটে।
ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে মামলার বাদী মো. খলিলুর রহমান হাওলাদার, মো. মিজান হাওলাদার, তারেক, আঞ্জুমানারা বেবিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে তাঁদের নির্মাণকাজে বাধা দিতে গিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ করেছেন মাসুদ রানা বাসাস। তিনি আমতলী পৌর যুবদলের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি বলে জানা গেছে।
জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমতলীর চাওড়া মৌজার সিএস খতিয়ান নম্বর ১০৩৭, পিএস খতিয়ান নম্বর ১৪৩, আরএস খতিয়ান নম্বর ১১৮ এবং এসএ খতিয়ান নম্বর ১৬০-এর অন্তর্ভুক্ত প্রায় ১ দশমিক ৫৭ একর জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
এ বিরোধের জেরে মো. খলিলুর রহমান হাওলাদার বাদী হয়ে মো. বাদল হাওলাদারসহ কয়েকজনকে বিবাদী করে আমতলী সিভিল জজ আদালতে দেওয়ানি মোকদ্দমা নম্বর ১৩২/২০২৬ দায়ের করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, বাদীপক্ষ ওই জমির ওপর নিজেদের স্বত্ব ও অধিকার দাবি করে আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে। অন্যদিকে বিবাদীপক্ষ বাদীপক্ষের দাবি অস্বীকার করে জমির জরিপ রেকর্ড ও নিজেদের দখলের পক্ষে অবস্থান নেয়।
উভয় পক্ষের বক্তব্য, দাখিল করা দলিলপত্র ও জমির নকশা পর্যালোচনা করে আমতলী সিভিল জজ আদালত গত ২৮ আগস্ট দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার সঙ্গে পঠিত আদেশ ৩৯-এর বিধি ১ ও ২ অনুযায়ী বিরোধপূর্ণ জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমির ভৌত দখল, অবস্থান ও প্রকৃতি বর্তমান অবস্থায় বজায় রাখার কথা। একই সঙ্গে কোনো পক্ষকে বলপূর্বক উচ্ছেদ না করা এবং জমির ভৌত প্রকৃতি পরিবর্তন হয়—এমন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থিতাবস্থা আদেশের পরও ঘর নির্মাণের অভিযোগ
বিবাদীপক্ষের অভিযোগ, আদালতের ওই আদেশের পরও বাদীপক্ষের লোকজন বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
খবর পেয়ে বিবাদী মো. বাদল হাওলাদারের বোন পারুল বেগম, ভাগ্নে মাসুদ রানা বাসাসহ তাঁর বোনজামাই নয়া মিয়া হাওলাদার ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজে বাধা দেন।
এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পারুল বেগম, মাসুদ রানা বাসাস ও নয়া মিয়া হাওলাদারকে একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মাসুদ রানা বাসাস।
পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের কক্ষ থেকে বের করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
‘মারধর করে আটকে রাখা হয়’, টাকা নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ
মাসুদ রানা বাসাস বলেন, সকালে তিনি তাঁর ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নজরুল ইসলাম তালুকদারের ইটভাটায় ইট কেনার জন্য যাচ্ছিলেন। পথে বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণ করতে দেখে তাঁরা সেখানে যান।
আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশের কথা জানিয়ে নির্মাণকাজে বাধা দিলে তাঁদের মারধর করে একটি কক্ষে আটকে বাইরে থেকে তালা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন মাসুদ রানা বাসাস।
তিনি বলেন, পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
‘রেকর্ড আমাদের পক্ষে’
মামলার বিবাদী মো. বাদল হাওলাদার বলেন, জমিটির সিএস, পিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ড তাঁদের পক্ষে রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন।
বাদল হাওলাদারের ভাষ্য, আদালতের আদেশ অমান্য করে জমিতে ঘর নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। আদালতের আদেশের কথা বলে নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার সময় তাঁর বোন, বোনজামাই ও ভাগ্নে মাসুদ রানা সেখানে ছিলেন।
বাদীপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অন্যদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী খলিলুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার আগে পৌরসভার সাবেক ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর মর্জিনার সঙ্গে কথা বলার কথা জানান। পরে তিনি সেখান থেকে চলে যান।
ফলে ঘর নির্মাণ ও আটকে রাখার অভিযোগের বিষয়ে বাদীপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা
ঘটনার বিষয়ে আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াকুব হোসাইন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ থাকা অবস্থায় বিরোধপূর্ণ জমিতে নির্মাণকাজ এবং এরপর এক পক্ষের লোকজনকে আটকে রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে বিরোধ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

