যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ নিশ্চিত করতে কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা-নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থমূলক রিট দায়ের করা হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ১৩২১১/২০২৬ দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।
রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটক শিল্পে প্রেম ও অতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের অবাধ প্রচার যুবসমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব কনটেন্টে পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো বিষয়কে স্বাভাবিক বা মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, এর ফলে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং সমাজের প্রচলিত নৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বাড়ছে। রিটে এমন কনটেন্টের সঙ্গে ধর্ষণ, পরকীয়া ও ব্যভিচার বৃদ্ধির অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
রিট আবেদনে হিন্দুস্তান টাইমস, ডেইলি সাবাহ ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, লাগামহীন রোমান্টিক ও উসকানিমূলক কনটেন্ট তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন : বিচারপতি-অ্যাটর্নি জেনারেলের নিরাপত্তা কমানোর পরিপত্র বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট
আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন রিটে উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। তার যুক্তি, জননৈতিকতা ধ্বংসকারী এবং সামাজিক অপরাধে প্ররোচনাদানকারী কোনো কনটেন্ট অবাধ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সুরক্ষা দাবি করতে পারে না।
এ ছাড়া সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিটে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩-এর ৫(২) ও ৮(১) ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং এর পরিপন্থী কনটেন্টের অনুমোদন বাতিল করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
একইভাবে কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬-এর ১৯ ও ২০ ধারার উল্লেখ করে আবেদনকারীর দাবি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করতে পারে—এমন সম্প্রচার বন্ধে কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বিবাদীরা তাদের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে রিটে অভিযোগ করা হয়েছে।
রিটে কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর কনটেন্ট নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের পাশাপাশি যুবসমাজের সৃজনশীল মেধার বিকাশ এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির আবেদন জানানো হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বিবাদীদের কাছে একটি Demanding Justice Notice পাঠানো হয়েছিল। তবে নোটিশের পরও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনস্বার্থে ও জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করা হয়েছে।

