ব্যারিস্টার নাজিয়া আমিন
ব্যারিস্টার নাজিয়া আমিন

প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে—এ ব্যাপারে আইন কী বলে?

আজকাল আমাদের সমাজে একটি আশঙ্কাজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তা হলো, বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অবিবাহিত পরিচয়ে পুনরায় বিয়ে করা। পত্রিকা এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় যে, প্রায়ই বিভিন্ন ব্যক্তি এ ধরনের বিয়ে সংক্রান্ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের কিছু মামলা দায়ের করার খবরও পাওয়া গেছে।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারা অনুসারে, এ ধরনের বিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুতরাং, কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ের পর জানতে পারেন যে, যে ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে তিনি আগেও বিয়ে করেছেন এবং বিষয়টি তাঁর থেকে গোপন রেখেছেন, তাহলে তিনি একজন ভুক্তভোগী হিসেবে উক্ত ধারার অধীনে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন।

একটি মামলার বাস্তব উদাহরণ

গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একটি মামলার রায় প্রদান করেন। মামলার বিষয়বস্তু ছিল এই যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক নারী ‘কুমারী’ পরিচয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী জানতে পারেন যে, সেই নারীর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁর একটি সন্তান আছে।

সেই নারী পূর্ববর্তী স্বামী ও সন্তানের বিষয়টি গোপন রেখে প্রতারণামূলকভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে দ্বিতীয় স্বামী আদালতের দ্বারস্থ হন।

মামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালত সেই নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে এক (১) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও দশ (১০) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

দায়েরকৃত রিট পিটিশন

বিয়ে সংক্রান্ত প্রতারণা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রিট পিটিশন দায়ের হয়েছে।

তার মধ্যে একটি রিট পিটিশনে পক্ষগণের পূর্ববর্তী বিয়ের তথ্য, সন্তানদের তথ্য, চলমান ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব—এসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে কাবিননামা সংশোধন এবং জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা পাসপোর্ট নম্বর যাচাইযোগ্য করার নির্দেশনা চাওয়া হয়। উক্ত রিট পিটিশনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করেছেন।

তাছাড়া, বিগত ২০২১ সালে বিয়ের সকল তথ্য ডিজিটাল করার লক্ষ্যে একটি রিট দায়ের হয়, যেখানে আদালত কর্তৃক ২০২৫ সালে এ মর্মে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পূর্ববর্তী বিবাহ বলবৎ না থাকলে দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারা প্রযোজ্য কি না

দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারার অধীনে অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ববর্তী স্বামী/স্ত্রী জীবিত থাকবে এবং সেই সঙ্গে বিবাহ বলবৎ থাকবে।

অর্থাৎ, পূর্ববর্তী স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় নিজেকে অবিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্ত দাবি করে দ্বিতীয় বিয়ে করলে উক্ত ধারায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।

তবে প্রথম বিয়ে যদি মৃত্যু বা তালাকের মাধ্যমে বলবৎ না থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে উক্ত ধারা প্রযোজ্য হবে না।

সাজা

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি অপর ব্যক্তির কাছে পূর্ববর্তী বিয়ের বিষয় গোপন করে তাঁর সঙ্গে বিয়ের চুক্তি সম্পাদন করে, তবে সেই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ (১০) বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

উপসংহার

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে করার বিষয়টি সমাজে প্রায়ই ঘটছে। বর্তমানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্রযুক্তির কারণে বিষয়গুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান হয়।

সুতরাং, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে অবশ্যই সঠিকভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া জরুরি।

বিয়ে সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিয়ের ডিজিটাল নিবন্ধন ও তথ্যের স্বচ্ছতার ওপর নির্দেশনা ও বিধিমালা আসবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আশা করা যায় যে, এ ধরনের পদক্ষেপ আমাদের সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

লেখক : নাজিয়া আমিন, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ; বার-এট-ল, লিঙ্কনস ইন। Email: aminnazia@gmail.com