দীর্ঘ ৭৮ বছর ধরে চলছে মামলা, বেঁচে নেই বাদী-বিবাদীও
জেলা জজ আদালত, বগুড়া

বগুড়ায় জেলা জজের আদালত বর্জন নিয়ে আইনজীবীদের দুই পক্ষের হট্টগোল

বগুড়ায় দুই বছর আগে প্রত্যাহার হওয়া বিচারক মো. মনিরুজ্জামান পুনরায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর আদালত বর্জনকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল, ধাক্কাধাক্কি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।

পদায়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ

এর আগে বিচারক মো. মনিরুজ্জামানের পদায়ন বাতিলের দাবিতে আদালতের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন আইনজীবীরা। জেলা অ্যাডভোকেটস বার সমিতির ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে তাঁর পদায়ন বাতিলের দাবি জানানো হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বগুড়া আদালতের কর্মচারী ও আইনজীবীদের একাংশ তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান এবং জেলা ও দায়রা জজ মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। পরে দুজনকেই বগুড়া থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে জেলা ও দায়রা জজ মোজাম্মেল হককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

এর মধ্যে মনিরুজ্জামান জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতি পেয়ে বগুড়ায় বদলির আদেশ পান। বুধবার তিনি বগুড়ায় যোগ দিয়ে দুপুরে এজলাসে বসেন।

এজলাসে দুই পক্ষের হট্টগোল

এ সময় বগুড়া বার সমিতির নেতারা তাঁর আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়ে এজলাসে মামলার শুনানিতে বাধা দেন। তবে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আরেকটি পক্ষ মামলার শুনানি চালিয়ে যেতে চাইলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁরা ধাক্কাধাক্কি ও ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় চলে যান। পরে আদালত পুলিশ এসে দুই পক্ষকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

বার সমিতির সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ

বগুড়া অ্যাডভোকেটস বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, মনিরুজ্জামান বগুড়ায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। বিএনপির নেতাকর্মীদের জামিন না দিয়ে মাসের পর মাস কারাগারে রাখার অভিযোগে ৫ আগস্টের পর আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়া থেকে প্রত্যাহার হওয়ার পর তিনি সরকারদলীয় কোনও নেতাকে ম্যানেজ করে আবার বগুড়ায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলির আদেশ নিয়েছেন—এমন খবর পেয়ে আমরা সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর বদলির আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছিলাম। একই সঙ্গে তিনি বগুড়ায় যোগ দিলে আদালত বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।’

আইনজীবী নেতা বলেন, ‘আজ তিনি এজলাসে বসে মামলার শুনানি শুরু করলে আমরা সেখানে বাধা দিতে যাই। এ সময় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ও শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী আমাদের সঙ্গে হট্টগোলে জড়ান। একপর্যায়ে তাঁরা বার সমিতির সভাপতি রেজাউর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেন।’

পাল্টা বক্তব্য আব্দুল ওয়াহাবের

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী আব্দুল ওয়াহাব জানান, আদালত বর্জনের কর্মসূচির সঙ্গে তাঁরাও একমত ছিলেন। জেলা ও দায়রা জজ যোগদানের পর বার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁর খাসকামরায় যান। পরে বিচারক এজলাসে বসেন।

আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘একটি মামলার শুনানি শেষে বার সমিতির নেতারা এসে আবার বাধা দেন। আদালত বর্জনের কর্মসূচি থাকলে বার সমিতির নেতারা বিচারকের খাসকামরায় ঢুকলেন কেন? তাঁরা বের হওয়ার পর বিচারক এজলাসে বসলে আমরা জুনিয়র আইনজীবীরা মামলার শুনানি শুরু করি। এরপর বার সমিতির নেতারা বাধা দিতে এলে হট্টগোল হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তিন মাস ধরে বগুড়ায় জেলা জজ না থাকায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। আইন মন্ত্রণালয় ও প্রধান বিচারপতির অনুমতিতে সরকার নতুন জেলা জজ পাঠিয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে আমরা শুনানিতে অংশ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বার সমিতির সেক্রেটারি হট্টগোল সৃষ্টি এবং সাধারণ আইনজীবীদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন। বিচারিক প্রক্রিয়া সচল রাখতেই আমরা শুনানিতে অংশ নিয়েছি।’

খাসকামরায় যাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য

তবে বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের দাবি, বিচারকের খাসকামরায় তাঁরা আদালত বর্জনের কর্মসূচির বিষয়টি তাঁকে জানাতে গিয়েছিলেন। বিচারক নিয়ম রক্ষার জন্য একটি মামলার শুনানি করে কার্যক্রম স্থগিত রাখবেন বলে জানান। তাঁর সম্মানে একটি মামলার শুনানি করতে দেওয়া হলেও পরে আব্দুল ওয়াহাব একটি হত্যা মামলায় আসামির জামিন করান এবং আরও মামলার শুনানি শুরু করেন।

রফিকুল বলেন, ‘আমি ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করেছি। বগুড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহসভাপতিও ছিলাম। এখনও সংগঠনটির উপদেষ্টা। অথচ আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী বার সমিতির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এজলাসে হট্টগোল করেছেন এবং সভাপতিকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন।’

পুলিশের বক্তব্য

বগুড়া আদালত পুলিশের পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাস কক্ষে আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল শুরু হলে পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।’