অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

ডিএনএ রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কী করবেন?

সিরাজ প্রামাণিক : ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে মামলায় এখন ডিএনএ পরীক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। অনেক ভুক্তভোগী পরিবার মনে করেন, ডিএনএ রিপোর্ট হাতে এলেই মামলার ফল ঠিক হয়ে গেল। আবার রিপোর্ট নিজেদের বিপক্ষে গেলে অনেকে ভেঙে পড়েন, ভাবেন আর কিছুই করার নেই।

বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ডিএনএ রিপোর্ট শক্তিশালী প্রমাণ, কিন্তু সেটি নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠলে আদালত তা আবার যাচাই করার পথ খোলা রাখতে পারেন। আমাদের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায় এ বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দেয়।

আবদুল বাসেত খান বাচ্চু মামলায় কী হয়েছিল?

আবদুল বাসেত খান বাচ্চু বনাম রাষ্ট্র (ফৌজদারি আপিল নং ৫৯৯১/২০১৮) মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ডিএনএ পুনঃপরীক্ষার আবেদন করেছিলেন। বিচারিক ট্রাইব্যুনাল প্রথমে সেই আবেদন নাকচ করে দেন।

এরপর বিষয়টি হাইকোর্টে যায়। হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী দুজনেরই ডিএনএ পরীক্ষা করে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেন।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির প্রধানের স্বাক্ষরে পুনঃপরীক্ষার রিপোর্ট আদালতে জমা হয়। আদালত সেই রিপোর্ট গ্রহণ করেন, আপিলটি নিষ্পত্তি করেন এবং আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। রায়টি হয় ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি।

১. প্রথম রিপোর্টই সবসময় শেষ কথা নয়

ডিএনএ রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আদালতের সামনে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠলে, আদালত প্রয়োজন মনে করলে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে আবার পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারেন।

২. কিন্তু অসন্তুষ্ট হলেই দ্বিতীয় পরীক্ষা পাওয়া যায় না

রিপোর্ট পছন্দ হয়নি বলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃপরীক্ষার অধিকার পান না। আদালত দেখবেন, ন্যায়বিচারের জন্য সত্যিই পুনঃপরীক্ষা দরকার কি না। সিদ্ধান্ত আদালতের।

৩. নিয়ম দুই পক্ষের জন্যই সমান

এই মামলায় পুনঃপরীক্ষা চেয়েছিলেন অভিযুক্ত। একইভাবে ভুক্তভোগী পক্ষও যদি মনে করেন রিপোর্টে গুরুতর ত্রুটি আছে, তাঁরাও যথাযথ কারণ দেখিয়ে আদালতের কাছে আবেদন করতে পারেন।

৪. পুরো প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ

শুধু রিপোর্টের ফল নয়; নমুনা কখন, কীভাবে সংগ্রহ হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হয়েছে, আদালতের নির্দেশ কী ছিল এবং পরের রিপোর্ট কীভাবে নথিতে এসেছে—সবকিছুই বিচারে বিবেচ্য।

কী করবেন?

দেরি করবেন না।
ঘটনার পর যত দ্রুত সম্ভব থানায় জানান ও চিকিৎসা পরীক্ষা করান। দেরি হলে আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আলামত সংরক্ষণ করুন।
ঘটনার সময়ের কাপড়চোপড় ধুয়ে ফেলবেন না; পরিষ্কার কাগজের ব্যাগে আলাদা করে রাখুন এবং পুলিশ বা চিকিৎসকের কাছে দিন।

কাগজপত্রের কপি রাখুন।
মেডিকেল রিপোর্ট, নমুনা সংগ্রহের তারিখ, জব্দ তালিকা ও ডিএনএ রিপোর্টের কপি সংগ্রহ করে রাখুন।

রিপোর্ট বুঝে নিন।
রিপোর্টে কী লেখা আছে, তা আইনজীবীর কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিন।

প্রশ্ন থাকলে চুপ থাকবেন না।
নমুনা সংগ্রহ বা পরীক্ষায় অনিয়মের সন্দেহ থাকলে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে বিষয়টি তুলুন।

হতাশ হবেন না।
একটি রিপোর্ট বিপক্ষে গেলেই মামলা শেষ নয়। সাক্ষ্য, মেডিকেল প্রমাণ ও অন্যান্য তথ্যও বিচারে গুরুত্ব পায়।

বিনা খরচে আইনি সহায়তা নিন।
আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে সরকারি আইনগত সহায়তার জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৪৩০ নম্বরে ফোন করতে পারেন।

শেষ কথা

ডিএনএ রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠলে আদালতের মাধ্যমে তা আবার যাচাই করার পথ খোলা থাকতে পারে।

সূত্র: Abdul Baset Khan Baccu vs. The State, Criminal Appeal No. 5991 of 2018, High Court Division, রায়ের তারিখ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৪।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।