আসন্ন সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়ার দাবিতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর ২০২৬) জনস্বার্থে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এ আইনি নোটিশ পাঠান।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব (জন বিভাগ), জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর নোটিশটি পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানা নিশ্চিত করা ও বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের স্বার্থে ‘সমাজতন্ত্র’ এবং দেশের ইতিহাস ও সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়া প্রয়োজন বলে নোটিশদাতা মনে করেন।
বর্তমান সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০ অনুচ্ছেদে ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক এবং ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার উল্লেখ রয়েছে।
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেবে এবং পরবর্তীতে জনগণের অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় গণভোটে দেওয়া হবে। এই আসন্ন পুনর্মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে সংবিধানে থাকা নীতিগুলোর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
নোটিশে অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। নোটিশদাতার দাবি, বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র একটি ব্যর্থ ধারণা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়, সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ বহাল থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা থাকতে পারে যে, সমাজতান্ত্রিক নীতির দোহাই দিয়ে যেকোনো সময় ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ জাতীয়করণ করা হতে পারে।
নোটিশদাতার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের সুরক্ষার জন্য সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮ ও ১০ অনুচ্ছেদ থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বিলুপ্ত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন : শিশুর হেফাজত নিয়ে পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে হেবিয়াস করপাস রিট নয়
নোটিশে বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এলএল.বি. (অনার্স) কোর্সে ‘লিগ্যাল হিস্ট্রি’ বা আইনি ইতিহাস পড়ানো হয়। নোটিশে আইনবিদ ভি. ডি. কুলশ্রেষ্ঠের Landmarks in Indian Legal and Constitutional History গ্রন্থের সপ্তম সংস্করণ ও ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রণের উল্লেখ করে বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসকে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ যুগ এবং পাকিস্তান যুগ—এই চারটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
নোটিশদাতার দাবি, এই দীর্ঘ সামাজিক ও বিচারিক শাসনব্যবস্থায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামের কোনো মতবাদের চর্চা ছিল না। এমনকি ১৯৬৬ সালের ছয় দফাতেও ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান ছিল না বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিশেষ মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য হয়নি; বরং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য, লুণ্ঠন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল—এমন দাবি করা হয়েছে।
নোটিশে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। নোটিশদাতার মতে, সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যুক্ত থাকার কারণে এটি ৪১ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের দেওয়া ধর্ম অবলম্বন, পালন ও প্রচারের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সংবিধানের বর্তমান পাঠে ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার এবং কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর প্রতি বৈষম্য বা নিপীড়ন বিলোপের কথা বলা হয়েছে।
আইনি নোটিশে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সম্পূর্ণ অপসারণের প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যথায় দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন (PIL) দায়ের করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

