ভূমিকা
আঠারোশতকের বাংলার সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং পেশাগত শ্রেণিবিন্যাস বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমে তৎকালীন মানুষের জীবিকা, সামাজিক অবস্থান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করা জরুরি। তখন পেশা কেবল মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম ছিল না; বরং তা সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতার কাঠামো এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এই পেশাগত বিন্যাসের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনুসন্ধান করলে বাংলায় আধুনিক আইন পেশার উদ্ভব ও বিকাশের সামাজিক পটভূমি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পেশাগত শ্রেণিবিন্যাস
তৎকালীন বাংলার জনসমাজকে বৃহত্তরভাবে দেশি ও বিদেশি, এই দুই শ্রেণিতে বিবেচনা করা যায়। দেশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তর বিদ্যমান ছিল। একদিকে ছিল উচ্চবর্গ বা অভিজাত শ্রেণি, অন্যদিকে ছিল নিম্নবর্গ বা সাবঅলটার্ন জনগোষ্ঠী। এই শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সম্পদ, শিক্ষা, সামাজিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্পর্ক ছিল।
নিম্নবর্গের মানুষের জীবিকা প্রধানত উৎপাদনমূলক শ্রম ও দৈনন্দিন পেশার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কৃষিকাজ, কৃষিশ্রম, তাঁত বোনা এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরি কাজ ছিল তাঁদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে উচ্চ সামাজিক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রশাসনিক কাজ, বিদ্যাচর্চা এবং অন্যান্য মর্যাদাসম্পন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রবণতা দেখা যেত।
তৎকালীন শ্রমজীবী সমাজ
বাংলার তৎকালীন পেশাগত কাঠামো কেবল কৃষি ও তাঁতশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নোল্যান্ড ও স্ক্রাইনের গবেষণায় আলোচিত পেশাগুলোর ভিত্তিতে তৎকালীন সমাজের জীবিকা ও শ্রমবিভাজনের একটি বিস্তৃত চিত্র অনুধাবন করা যায়। কৃষিজীবী, কৃষিশ্রমিক, কারিগর, মজুর এবং ভিক্ষুক, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এই সমাজের অংশ ছিলেন।
কারিগর শ্রেণির মধ্যে কামার, কাঠমিস্ত্রি, মুচি, স্বর্ণকার ও কুমোরের মতো পেশাজীবীরা উল্লেখযোগ্য ছিলেন। তাঁরা কৃষি, গৃহস্থালি ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ উৎপাদন এবং মেরামতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো সচল রাখতেন।
এ ছাড়া পেশাগত জীবনের পরিসরে গাঁজার দালাল, স্ট্যাম্প বিক্রেতা, বই বিক্রেতা, স্কুলের পণ্ডিত, তেল বিক্রেতা, কুলি, দর্জি এবং ভুষি বিক্রেতার মতো পেশারও উল্লেখ পাওয়া যায়। গৃহভৃত্য হিসেবে সারা বছর গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করা ব্যক্তিরাও এই পেশাগত কাঠামোর অংশ ছিলেন। এসব পেশার বৈচিত্র্য থেকে বোঝা যায়, বাংলার অর্থনৈতিক জীবন কৃষিনির্ভর হলেও তার সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্ষুদ্র কারিগরি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত সেবার স্বল্প ক্ষেত্র।
শিক্ষা, প্রশাসন ও অধিকার আদায়ের সীমাবদ্ধতা
পেশাগত শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো কিংবা অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া সব সময় সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ক্ষমতাবান শ্রেণির প্রভাব তাঁদের অধিকার আদায়ের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারত।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মতো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ছিল ক্ষমতার অসমবণ্টনের দ্বারা প্রভাবিত। কোনো কৃষক, তাঁতি বা শ্রমজীবী ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হলে তাঁর পক্ষে অভিযোগ দায়ের করা, বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া কিংবা প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাস্তব বাধা থাকত।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বিরোধ ও অধিকারসংক্রান্ত দাবিগুলো কীভাবে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করল? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গেলে বাংলার বিচারব্যবস্থার পরিবর্তন এবং আইন পেশার ক্রমবিকাশের দিকে নজর দিতে হয়।
বাংলায় দেওয়ানি মোকদ্দমার বিকাশ
বাংলায় দেওয়ানি মামলার বিস্তার মূলত ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিজমা ও ভূমিস্বত্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমির মালিকানা, খাজনা আদায়, দখল, উত্তরাধিকার এবং প্রজাস্বত্ব নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ দেখা দেয়। এসব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দেওয়ানি আদালতের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় আইন পেশার জন্য একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে এ. আর. দেশাই তাঁর Social Background of Indian Nationalism গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিজমাসংক্রান্ত জটিলতাই আইন ব্যবসার পথ খুলে দেয়। তাঁর মতে, আইন পেশা ক্রমেই লাভজনক ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ১৮৬৪ থেকে ১৮৭৩ সালের মধ্যে কলকাতা থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন ৭০৪ জন, তৎকালীন সময়ের বিচারে যা ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যা।
আবার ১৮৮১ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, সমগ্র বাংলা প্রদেশে প্রায় পাঁচ কোটি আঠারো লাখ টাকার মামলার বিষয়বস্তু ছিল, যা সমগ্র ভারতের মামলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ভারত ছিল একটি বিশাল ভূখণ্ড; সেই দেশের মোট মামলার এক-তৃতীয়াংশ যদি বাংলা প্রদেশে সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে বাংলায় দেওয়ানি বিরোধের ব্যাপকতা সহজেই অনুমান করা যায়।
আরও পড়ুন : CPC-এ নতুন Section 94A-এর সন্নিবেশ: একটি পর্যালোচনা
তবে এই পরিসংখ্যানকে বাংলার সাধারণ মানুষের সর্বব্যাপী মামলাবাজির প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। আব্দুল মওদুদ তাঁর আঠারো শতকের বাংলাদেশে বিচার ও শান্তিরক্ষা গ্রন্থে লিখেছেন, আইন ব্যবসার এই প্রসারের কারণেই হয়তো অনেকেই, বিশেষ করে ইংরেজ সিভিলিয়ানরা, বাঙালিদের মামলাবাজ ও ধূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু বাংলার গ্রামীণ বাসিন্দাদের সংখ্যার অনুপাতে মামলার সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম।
১৮৬৪ সালে বাংলার লোকসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি, আর দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ছিল ১,৩৪,৩৯৩টি; অর্থাৎ গড়ে ২০৭ জনে একটি মামলা। মানুষের গড় আয়ু সর্বোচ্চ ৩৫ বছর ধরে হিসাব করলেও দেখা যায়, সাতজনের মধ্যে ছয়জন তাঁদের জীবদ্দশায় দেওয়ানি আদালতের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ সংশ্রব ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দিতেন।
সুতরাং বাংলায় দেওয়ানি মামলার বিস্তার ছিল বাস্তব, কিন্তু তা সমগ্র সমাজের সমানভাবে মামলায় জড়িয়ে পড়ার ফল নয়। বরং জমিদারি ব্যবস্থা, ভূমিস্বত্ব, খাজনা, দখল ও উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক জটিলতাই আদালত ও আইন পেশার প্রসারের প্রধান ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই পরিস্থিতির ফলে মানুষের মধ্যে আইন, আদালত এবং আইনজীবীদের প্রতি আগ্রহ ও নির্ভরতা ক্রমে বৃদ্ধি পায়। আইন পেশা তখন কেবল একটি জীবিকা নয়; সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
উপসংহার
অতএব, বাংলায় আইন পেশার উদ্ভবকে কেবল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফল হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পেছনে ছিল ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিজমা ও ভূমিস্বত্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা, দেওয়ানি আদালতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং সেই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনি প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন। জমি, খাজনা, দখল, উত্তরাধিকার ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ যত বাড়তে থাকে, আইন পেশার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও নির্ভরতাও ততই বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বাংলায় আধুনিক আইন পেশার সামাজিক ভিত্তি গড়ে ওঠে এবং আইনজীবী শ্রেণি ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী পেশাগত গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
লেখক: মোঃ রওশন জাদীদ, সিনিয়র এসোসিয়েট, এমএনপি লিগ্যাল, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। Reach writer at: rawsan.zadid@yahoo.com

