চন্দন কান্তি নাথ
চন্দন কান্তি নাথ

মর্জি নয়, সাক্ষ্য আইনের ফ্রেমে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হয়

আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান শর্ত হলো গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য গ্রহণ করা। তবে কোনো সাক্ষ্য কেবল আদালতে উত্থাপিত হলেই তা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না; সেটিকে অবশ্যই আইনানুযায়ী ‘প্রাসঙ্গিক’ হতে হয়। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬ থেকে ৫৫ ধারায় কোন বিষয়গুলো আদালতে প্রাসঙ্গিক বলে গণ্য হবে, তার সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। ফলে বিচারক বা আইনজীবী—কারও জন্যই নিজস্ব মর্জি বা ইচ্ছামতো প্রাসঙ্গিকতা আবিষ্কার করার কোনো সুযোগ আইনে রাখা হয়নি।

আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, একটি মামলার মূল বিচার্য বিষয় এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর অস্তিত্ব বা অনুপস্থিতি প্রমাণের জন্যই কেবল সাক্ষ্য দেওয়া যায়। এর বাইরের কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ বা জেরা করার আইনগত ভিত্তি নেই।

ঘটনার আগে-পরে সংঘটিত কার্যক্রমও হতে পারে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য

সহজ কথায়, ঘটনা ঘটার সময়, তার আগে বা পরে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও কাজ আদালতে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য।

ধরুন, আব্বাস ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্কাসকে হত্যা করার অভিযোগে অভিযুক্ত। সে ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের দাগ বা ঘটনার পেছনের বিশেষ উপলক্ষ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আদালতে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।

আব্বাস যদি আক্কাসকে বিষ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং মৃত্যুর আগে সে একই ধরনের বিষ সংগ্রহ করে থাকে, তবে তা হত্যার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাসঙ্গিক। একইভাবে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আব্বাসের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আচরণও বিচারে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারবিরোধী বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির সংগৃহীত অর্থ, অস্ত্র কেনা বা গোপন চিঠি আদান-প্রদান—এসব কার্যক্রম ষড়যন্ত্র প্রমাণের জন্য প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণীয়।

নির্দোষতা প্রমাণেও সাক্ষ্য আইনে সুযোগ রয়েছে

আইনে নির্দোষতা প্রমাণেরও স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে। আব্বাস ঢাকায় আক্কাসকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, ঘটনার দিন ও সময়ে সে যদি কুড়িগ্রামে অবস্থান করে থাকে, তবে তার সেই উপস্থিতি (Alibi) আদালতে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য।

এ ছাড়া কোনো ব্যক্তির মানসিক বা শারীরিক অবস্থা বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হলে, তার আগের বা পরের আচরণ ও বক্তব্য থেকে তা অনুধাবন করা হয়। যেমন—

১. পূর্বে বিদ্বেষমূলক কোনো মন্তব্য বা প্রকাশনা থাকলে তা মানহানির মানসিকতা প্রমাণে প্রাসঙ্গিক।

২. উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুলি করার আগে অতীতেও যদি একই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা থাকে, তা ইচ্ছা বা মানসিক অবস্থা প্রমাণে গ্রহণযোগ্য। তবে ‘ওই ব্যক্তির মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সাধারণ স্বভাব রয়েছে’—এমন ঢালাও মনোভাব বিচারে প্রাসঙ্গিক নয়।

৩. নকল বা অচল মুদ্রা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্তের কাছে আরও অচল মুদ্রা পাওয়া গেলে বা পূর্বে একই অপরাধে দণ্ডিত হয়ে থাকলে তা প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার পূর্বের কোনো চুরির মামলার সাজা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে না।

দেওয়ানি মামলায় স্বীকারোক্তি ও প্রতিনিধির বক্তব্যের গুরুত্ব

আবার দেওয়ানি মামলায় আব্বাস আক্কাসের কাছ থেকে একটি জমি ক্রয় করল। জমিটি হস্তান্তরের আগে আক্কাস (সাবেক মালিক) যদি উক্ত জমির স্বত্ব বা সীমানা বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, তবে জমি ক্রয়ের পর সেই স্বীকৃতি আব্বাসের ওপরও আইনত বাধ্যকর হবে।

একইভাবে, আব্বাসের নিয়োজিত প্রতিনিধি বা এজেন্ট যদি তার দেওয়া এখতিয়ারের মধ্যে থেকে কোনো বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়, তবে তার জন্য আব্বাস নিজে দায়ী থাকবে।

কোনো ইলেকট্রনিক রেকর্ডের বিষয়বস্তু বা প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কিত মৌখিক স্বীকারোক্তি প্রাসঙ্গিক নয়, যদি না উক্ত রেকর্ডটির সঠিকতা বা সত্যতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।

দেওয়ানি মামলায়, যদি উভয় পক্ষের মধ্যে এই স্পষ্ট শর্ত থাকে যে সাক্ষ্য বা তথ্য গোপনীয় রাখা হবে অথবা আদালতের বাইরে মীমাংসার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তবে এমন কোনো স্বীকারোক্তি প্রমাণ করা যাবে না। তবে ব্যারিস্টার, আইনজীবী বা উকিলগণকে তাঁদের মক্কেলের দেওয়া গোপনীয় তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়

আবার পুলিশ কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত কোনো স্বীকারোক্তি কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যাবে না।

ফৌজদারি মামলায় কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রদত্ত স্বীকারোক্তি প্রাসঙ্গিক বা গ্রহণযোগ্য নয়, যদি তা কোনো প্রলোভন (Inducement), হুমকি (Threat) বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আদায় করা হয়—যা মামলার বিচারক বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বা মুক্তি দেওয়ার আশ্বাসস্বরূপ ছিল এবং অভিযুক্তের মনে যুক্তিসংগতভাবে এমন ধারণার সৃষ্টি করেছিল।

ফৌজদারি বিচারে আব্বাস আক্কাসকে হত্যা করার পর পুলিশের কাছে স্বীকার করল, ‘আমি আক্কাসকে খুন করেছি এবং খুনে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিটি আমার বাড়ির পেছনের পুকুরে লুকিয়ে রেখেছি।’

ধারা ২৫ অনুযায়ী, পুলিশের কাছে দেওয়া আব্বাসের এই স্বীকারোক্তি আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তবে ধারা ২৭-এর ব্যতিক্রম অনুযায়ী, আব্বাসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ যদি পুকুর থেকে সেই রক্তমাখা ছুরিটি উদ্ধার করে, তবে কেবল ‘ছুরিটি উদ্ধারের অংশটুকু’ আব্বাসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণীয় হবে।

যখন একই অপরাধে একাধিক ব্যক্তির যৌথ বিচার (Joint Trial) চলছে এবং তাঁদের মধ্যে একজন এমন একটি স্বীকারোক্তি দেয়, যা নিজের পাশাপাশি অন্য সহ-অভিযুক্তদেরও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে, তখন আদালত সেই স্বীকারোক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপর সহ-অভিযুক্ত উভয়ের বিরুদ্ধেই বিবেচনা করতে পারে।

যদি কোনো স্বীকারোক্তি পূর্বের কোনো প্রলোভন, হুমকি বা প্রতিশ্রুতির প্রভাব দূর হওয়ার পর (যুক্তিগতভাবে আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে) স্বাধীনভাবে প্রদান করা হয়, তবে তা প্রাসঙ্গিক এবং গ্রহণযোগ্য।

ধরুন, আব্বাস ও করিম যৌথভাবে আক্কাসকে হত্যার অপরাধে বিচারাধীন রয়েছে। বিচার চলাকালে আব্বাস যদি আদালতে দোষ স্বীকার করে এবং বলে, ‘আমি এবং করিম দুজনে মিলে আক্কাসকে হত্যা করেছি’, তবে আব্বাসের এই স্বীকারোক্তি করিমের বিরুদ্ধেও পারিপার্শ্বিক বিচার্য তথ্য হিসেবে আদালত বিবেচনা করতে পারেন।

মৃত্যুকালীন ঘোষণা ও পূর্ববর্তী বিবৃতি প্রাসঙ্গিক হতে পারে

যেসব ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, সাক্ষ্য প্রদানে তিনি অক্ষম হন অথবা সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হতে অতিরিক্ত বিলম্ব বা খরচের সম্মুখীন হন—সেসব ক্ষেত্রে তাঁর পূর্বে দেওয়া বিবৃতি (যেমন: মৃত্যুকালীন ঘোষণা বা Dying Declaration, ব্যবসার স্বাভাবিক ধারায় প্রদত্ত বিবৃতি ইত্যাদি) প্রাসঙ্গিক হিসেবে গণ্য হবে।

বিশেষ করে—

  • মৃত্যুর কারণ সম্পর্কিত বিবৃতি (মৃত্যুকালীন জবানবন্দি)।

  • ব্যবসার স্বাভাবিক বা নিয়মিত কার্যধারায় প্রদত্ত বিবৃতি।

  • নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রদত্ত বিবৃতি।

  • জনস্বার্থ বা প্রথা-সংক্রান্ত মতামত।

  • পারিবারিক সম্পর্ক বা রক্তসম্পর্ক-সংক্রান্ত বিবৃতি।

ধরুন, আব্বাস মারাত্মক জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় চিকিৎসকের সামনে বলে গেল, ‘আক্কাস আমাকে পেটে লাঠি দিয়ে আঘাত করে এই জখম করেছে।’ পরবর্তীতে আব্বাস মারা গেলে, তার এই মৃত্যুকালীন ঘোষণা আক্কাসের বিরুদ্ধে হত্যা বা আঘাতের মামলায় অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হবে।

আবার ব্যবসার হিসাবের বই, খাতা বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড—যেগুলো নিয়মিত ও স্বাভাবিক ধারায় রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়—সেগুলোর এন্ট্রি বা রেকর্ডসমূহ যেকোনো প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক।

পরবর্তী কোনো বিচার বা কার্যধারায় কোনো সাক্ষীর পূর্ববর্তী কার্যধারায় (যেমন: পূর্বের বিচার বা তদন্তে) প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রাসঙ্গিক হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি প্রথম সাক্ষী মৃত হন, সাক্ষ্য দিতে অক্ষম হন অথবা তাঁকে যুক্তিসংগত উপায়ে হাজির করা সম্ভব না হয়।

ধরুন, হিসাবরক্ষক রহিম নিয়মিত খাতা লিখতেন। রহিম মারা যাওয়ার পর তাঁর লিখিত খাতা থেকে দেখা গেল যে আব্বাস আক্কাসের কাছ থেকে নির্দিষ্ট দিনে টাকা গ্রহণ করেছে। রহিমের এই লিখিত হিসাব আদালতে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

আক্কাস দাবি করে যে আব্বাস তার পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি। আক্কাস তার ব্যবসায়ের নিয়মিত হিসাবের খাতা আদালতে পেশ করে। এটি প্রাসঙ্গিক, তবে কেবল হিসাবের খাতার ওপর ভিত্তি করেই আদালত রায় দেবেন না; এর সমর্থনে অতিরিক্ত সাক্ষ্য প্রয়োজন হবে।

জনগণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক সরকারি রেজিস্টার, বই বা ইলেকট্রনিক নথিতে সংরক্ষিত বিবৃতিগুলো প্রাসঙ্গিক এবং এগুলো প্রাথমিক বা জোরালো প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রকাশিত মানচিত্র, চার্ট বা প্ল্যান (যা সাধারণত জনসাধারণের বা পেশাদারদের জন্য প্রামাণিক হিসেবে বিক্রি বা প্রকাশিত হয়) কোনো সাধারণ বা ভৌগোলিক বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

সরকারি গেজেট, আইন ও পূর্ববর্তী রায়ও প্রাসঙ্গিক

সরকারি গেজেট বা সংসদীয় আইন ও বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা বিবৃতি প্রাসঙ্গিক। বিদেশি আইন বা আইনগত বইপত্র আদালত প্রাসঙ্গিক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

যখন কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত প্রাসঙ্গিক হয়, তখন সেই মতামতের ভিত্তি বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য বা ভিত্তিও প্রাসঙ্গিক হিসেবে গণ্য হয়।

পূর্ববর্তী কোনো মামলার রায়, আদেশ বা ডিক্রি প্রাসঙ্গিক, যদি তা আইনগতভাবে নতুন কোনো মামলা বা বিচার্য বিষয়কে বাধাগ্রস্ত করে (যেমন: Res Judicata বা পূর্বে মীমাংসিত বিষয়)।

ধরুন, আব্বাস আক্কাসের বিরুদ্ধে জমিসংক্রান্ত বিষয়ে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করল। আক্কাস আদালতে পূর্ববর্তী একটি চূড়ান্ত রায়ের প্রতিলিপি জমা দিয়ে দেখাল যে একই জমি ও একই বিষয় নিয়ে পূর্বেও আদালত আক্কাসের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ধারা ৪০ অনুযায়ী, এই পূর্ববর্তী রায়টি বর্তমান মামলাটি বার (Bar) করার জন্য প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য।

তবে যে কেউ পূর্ববর্তী কোনো রায় বা আদেশকে অপ্রাসঙ্গিক বা অকার্যকর প্রমাণ করতে পারে, যদি তা প্রতারণা (Fraud), যোগসাজশ (Collusion) কিংবা রায়দানকারী আদালতের এখতিয়ার না থাকার কারণে অর্জিত হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞের মতামত কখন প্রাসঙ্গিক?

বিজ্ঞান, শিল্পকলা (Art), বৈদেশিক আইন কিংবা হস্তলিপি বা আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণের বিষয়ে যখন আদালতের কোনো বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তখন এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বা বিশেষ পারদর্শী ব্যক্তিদের (বিশেষজ্ঞ বা Expert) মতামত প্রাসঙ্গিক।

সাধারণ নিয়মে সাক্ষী কেবল তাঁর দেখা বা জানা তথ্য বলবেন, মতামত দেবেন না। কিন্তু বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রাসঙ্গিক।

ধরুন, আব্বাস দাবি করে যে দলিলটিতে আক্কাসের স্বাক্ষর রয়েছে, কিন্তু আক্কাস তা অস্বীকার করে জাল দাবি করে। এ ক্ষেত্রে দলিলটি আসল কি না, তা প্রমাণের জন্য হস্তলিপি বিশেষজ্ঞ (Handwriting Expert) কিংবা আঙুলের ছাপ বিশেষজ্ঞের মতামত আদালতে প্রাসঙ্গিক।

চিঠিপত্রের ক্ষেত্রে রহিম যদি দীর্ঘদিন ধরে আব্বাসের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করে অথবা আব্বাসের অধীনে কাজ করার কারণে তার হাতের লেখা ভালোভাবে চেনে, তাহলে কোনো নথিতে আব্বাসের স্বাক্ষর আছে কি না, সে বিষয়ে রহিমের মতামতও আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য।

ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর বা ডিজিটাল স্বাক্ষর যাচাইয়ের জন্য সার্টিফাইং অথরিটি বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞের মতামত প্রাসঙ্গিক। বিশেষজ্ঞের মতামতের সপক্ষে বা বিপক্ষে দেওয়া অন্যান্য তথ্য বা ঘটনাও প্রাসঙ্গিক।

কোনো ব্যক্তির হস্তলিপি বা ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর পরিচিত কি না, সে বিষয়ে যিনি ওই ব্যক্তির লেখা দেখেছেন বা পরিচিত, তাঁর মতামত প্রাসঙ্গিক। সাধারণ প্রথা (General Custom) বা অধিকারের অস্তিত্ব সম্পর্কে যাঁদের জানার সুযোগ রয়েছে, তাঁদের মতামত প্রাসঙ্গিক।

পরিবারের রক্তসম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিষয়ে আত্মীয়-স্বজন বা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতামত প্রাসঙ্গিক। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বা প্রথার অস্তিত্ব সম্পর্কে মতামত প্রাসঙ্গিক হতে পারে, যদি তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ বা জীবনযাপনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

আবার বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো ব্যক্তির মতামত দেওয়ার পেছনে যে যুক্তি বা কারণ রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে এবং তা প্রাসঙ্গিক।

দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় চরিত্রের সাক্ষ্যের প্রাসঙ্গিকতা

বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামির বা পক্ষের চরিত্র কতটা প্রাসঙ্গিক, তা আইনে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।

দেওয়ানি মামলায় আব্বাস ভালো লোক না খারাপ লোক—তা নিয়ে আলোচনা সাধারণত অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় আব্বাস (আসামি) যে পূর্বে একজন ভালো ও সৎ চরিত্রের লোক ছিল, এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়া প্রাসঙ্গিক এবং তা আব্বাসের পক্ষে বিবেচনা করা যায়।

তবে আইনগত নিয়ম অনুযায়ী, আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন থেকে আগে থেকেই ‘আব্বাস একজন অসৎ বা খারাপ লোক’—এ কথা বলে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না। তবে ব্যতিক্রম হলো, আব্বাস যদি নিজে দাবি করে যে সে অত্যন্ত সৎ লোক, কেবল তখনই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারবে যে আব্বাসের পূর্ববর্তী চরিত্র অসৎ ছিল।

আব্বাস যদি পূর্বে অন্য কোনো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তবে সেই সাজা বা রেকর্ড তার খারাপ চরিত্রের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

আবার যৌন অপরাধের মামলায় চরিত্রের পূর্ব ইতিহাস বা যৌন প্রবৃত্তি অপ্রাসঙ্গিক। নির্দিষ্ট কিছু যৌন অপরাধের (যেমন ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানি) অভিযোগে ভুক্তভোগীর পূর্ববর্তী যৌন আচরণ বা নৈতিক চরিত্র বিচার্য বিষয় নির্ধারণের জন্য কিংবা তার সাক্ষ্যকে দুর্বল করার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।

সাক্ষ্য গ্রহণে বিচারকের ব্যক্তিগত মর্জির সুযোগ নেই

কোনটি বিচারে আসবে আর কোনটি বাদ যাবে, তার প্রতিটি রূপরেখা সংবিধিবদ্ধ আইনের মাধ্যমেই নির্ধারিত। ফলে আদালতের আসনে বসে বিচারকের নিজস্ব ইচ্ছা বা মর্জির কোনো স্থান নেই। নিরপেক্ষ ও নিখুঁত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাক্ষ্য আইনের এই বিধিনিষেধগুলো মেনে চলাই বিচারিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

লেখক : চন্দন কান্তি নাথ; অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, খাগড়াছড়ি।