চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি ঘটনায় হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা আহসানুল করিমকে নিয়ে নগর পুলিশের স্ববিরোধী প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে অর্থায়ন ও অন্যান্য অনেক অনিয়মের প্রমাণ থাকার পরও তথ্য গোপন করে আহসানুল করিমকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে ১৭৩(এ) ধারায় অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা ও ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফ ফয়সাল।
অথচ ২০২৫ সালের জুনে এই মামলায় আহসানুল করিমের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে জানিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় সম্পদ অনুসন্ধান এবং তার বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) চিঠি দিয়ে গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিলেন এই একই তদন্ত কর্মকর্তা। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি আহসানুল করিমের সম্পদ অনুসন্ধানেও নেমেছে।
২০২৫ সালের ২২ মে আহসানুল করিমের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন দমনে অর্থায়ন, হত্যা মামলায় জড়িত থাকা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানান অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে একটি গোপন প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেন সিএমপির তৎকালীন ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) কাজী মো. বিধান আবিদ।
তদন্ত চলমান থাকাকালেই আদালতে পলাতক আসামিকে মামলা থেকে দায়মুক্তির প্রতিবেদন দেওয়ায় বিষয়টি সাংঘর্ষিক ও অনৈতিক সুবিধার ইঙ্গিত করে বলে মনে করেন নগর পুলিশের কর্মকর্তারা।
কাজী বিধান আবিদ বর্তমানে সিএমপির উত্তর বিভাগের চান্দগাঁও জোনে কর্মরত।
আরও পড়ুন : আইনজীবী মাসদার হোসেনের বিরুদ্ধে ১.২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিকেলে মনছুরাবাদ পুলিশ লাইনসের সামনে জনসাধারণ আনন্দ মিছিল করছিলেন। একপর্যায়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা ও গুলি চালায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন মোহাম্মদ আলম। তাকে উদ্ধার করে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে ডবলমুরিং থানায় মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, হাসান মাহমুদসহ ২২৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। অভিযুক্ত আহসানুল করিম এই মামলার ১১৯ নম্বর আসামি।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন বলছে, আহসানুল করিম চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। নিজ মালিকানাধীন এএনএফএল প্রোপার্টিস লিমিটেডের মাধ্যমে চান্দগাঁও এলাকায় আওয়ামী লীগের দাপট দেখিয়ে বহদ্দারহাটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভূমিদস্যুতা ও অন্যান্য অপকর্ম করতেন তিনি। ২০২১ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এএনএফএল ট্রেডিং নামে প্রতিষ্ঠান খুলে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
সিএমপি সূত্র জানায়, আহসানুল করিম ডবলমুরিং থানার হত্যা মামলার পাশাপাশি পাঁচলাইশ থানায় দায়ের হওয়া জুলাই আন্দোলনের আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি গা ঢাকা দেন।
হালিশহর সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিভিন্ন অনিয়মের উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তা সিএমপিতে পাঠানো হয়। সিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির এ অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে আট কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন কাজী বিধান আবিদকে।
২০২৫ সালের ২২ মে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে দেওয়া গোপন অনুসন্ধান প্রতিবেদনে কাজী বিধান আবিদ উল্লেখ করেন, আহসানুল করিম স্থানীয় আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ও অর্থায়নকারী। চান্দগাঁওয়ের পলাতক সাবেক কাউন্সিলর এসরারুল হক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পলাতক মেয়র রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন।
আরও পড়ুন : জামিনের পরও ২৫ ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ: চট্টগ্রাম কারাকর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ
২০০৫ সালে আহসানুল করিম বহদ্দারহাটের একটি মার্কেটে তার ভাইয়ের বুক গার্ডেন নামে একটি দোকানে চাকরি করতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে এএনএফএল প্রোপার্টিজ নামে আবাসন কোম্পানি খুলে জমি দখল ও প্লট-ফ্ল্যাট দেওয়ার নামে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আহসানুল করিমের ‘বিএস খতিয়ানকে’ ‘বঙ্গবন্ধু খতিয়ান’ নামকরণের প্রস্তাবকারী এবং এ বিষয়ে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিয়ে আলোচনায় আসেন।
কাজী বিধান আবিদ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডবলমুরিং থানার তদন্ত কর্মকর্তা আরিফ ফয়সাল এবং সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে, ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ ও তদন্ত করে দেখা গেছে যে আহসানুল করিম প্রত্যক্ষভাবে এ হত্যায় জড়িত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার বিশেষ পুলিশ সুপার এসবি’র ইমিগ্রেশন বরাবর ২০২৫ সালের ৫ মে চিঠি দেন। তবে, আহসানুল করিমের দেশত্যাগ ঠেকাতে এসবিতে চিঠি দেওয়ার আগেই তিনি থাইল্যান্ডে চলে যান।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কাজী বিধান আবিদ বলেন, ‘আমার কাছে প্রতিবেদন চাইলে আমি সেটি নিজে তদন্ত করেছি। যা পেয়েছি তাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময় তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এটা তৈরি করা হয়েছিল।’
এই প্রতিবেদনের পর ২০২৫ সালের ২ জুন আহসানুল করিমসহ আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে অনুসন্ধানের জন্য সিআইডিতে চিঠি পাঠায় সিএমপি। বর্তমানে এটি সিআইডি চট্টগ্রাম অনুসন্ধান করছে।
এর এক বছরের মাথায় হত্যা মামলায় আহসানুল করিমের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিয়েছেন সেই একই তদন্ত কর্মকর্তা আরিফ ফয়সাল।
প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আহসানুল করিম হত্যা মামলায় জড়িত বলে বাদী কোনো সাক্ষী ও দালিলিক প্রমাণ উত্থাপন করতে পারেননি।
আরও পড়ুন : হাম টিকা দুর্নীতি অভিযোগে ড. ইউনূসসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে আবেদন
গত ১৯ মার্চ আদালতে তিনি এই প্রতিবেদন জমা দেন। তবে আহসানুল করিমের বিরুদ্ধে সম্পদ অনুসন্ধান ও এসবিতে পাঠানো চিঠির বিষয়ে কোনো কিছুই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেননি তিনি।
প্রতিবেদনে অসঙ্গতি ও পলাতক আসামির অব্যাহতি পত্রের আবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ ফয়সাল বলেন, ‘১৭৩(এ) এর অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আমি নিজ থেকে দিতে পারি না। এটি কমিশনার অফিস থেকে বললে করা হয়। ডিসি ক্রাইম এটি পর্যালোচনা করেন। সবকিছু মেনেই সেটা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত নয়। সামনে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে অভিযোগপত্রে আনা হবে।’
কাজী বিধান আবিদের প্রতিবেদনের বিষয়টি জানতে চাইলে আরিফ ফয়সাল বলেন, ‘সেটা আমার জানা নেই।’
আহসানুল করিমের ১৭৩(এ) ধারার প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির ডিসি ক্রাইম রইস উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে যেহেতু আনলেন, আমি এটি খতিয়ে দেখব। এমন হওয়ার কথা না।’
নাম প্রকাশে না করার শর্তে সিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকে সম্পৃক্ত না থাকার পরও প্রতিহিংসার কারণে জুলাই আন্দোলনের মামলা আসামি হয়েছেন। তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকলেও ১৭৩(এ) ধারায় প্রতিবেদন পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। কিন্তু একজন চিহ্নিত আসামিকে নিয়ে এই ধরনের প্রতিবেদন দেওয়া হলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং হত্যাকাণ্ডগুলোর সঠিক বিচার পাওয়াও ব্যাহত হবে।’
থানা সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত আলম হত্যা মামলায় তদন্তে ২৭৬ জনের নাম এসেছে। এর মধ্যে ৪৩ জনের নাম-ঠিকানা অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

