মো: জাহিদ হোসেন : বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আইন অঙ্গনে একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি তৈরি করে আসছে। তাহলো— আর্থিক প্রতিষ্ঠান কি Power of Attorney ছাড়া শুধু বন্ধক দলিলের ভিত্তিতে আদালতের বাইরে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারে?
অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা, এমনকি আইনজীবীরাও মনে করেন— না, পারে না। কিন্তু আইনের ব্যাখ্যা এবং ২০১০ সালের সংশোধনী মিলিয়ে দেখলে উত্তর সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে।
অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ১২ মূলত তিনটি পথে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের সুযোগ দেয়। ১. আদালতের মাধ্যমে নিলাম। ২. আদালত-বহির্ভূত বিক্রয়। ৩. বিক্রয় ব্যর্থ হলে সম্পত্তির দখল ও স্বত্ব ডিক্রীদারের অনুকূলে ন্যস্তকরণ।
এর মধ্যে আদালত-বহির্ভূত বিক্রয়ের পথটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির শিকার।
ধারা ১২(৩) বলছে— কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেয় এবং বন্ধক প্রদানের সময় সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সম্পত্তি বিক্রয় না করে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঋণের সঙ্গে সমন্বয় না করে অথবা বিক্রয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ না হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রয়ের চেষ্টা করা শুধু সুবিধার বিষয় নয়, এটি মামলা দায়েরের পূর্বশর্ত। এই ধারার মূল বিতর্কটি ছিল ওই “বিক্রয়ের ক্ষমতা” কীভাবে প্রদান করতে হবে তা নিয়ে।
মূল আইনে ধারা ১২(৩)-তে “বিক্রয়ের ক্ষমতা” শব্দগুচ্ছের পরে “(Power of Attorney)” কথাটি ছিল। তার মানে বিক্রয়-ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যম হিসেবে Power of Attorney-কে আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে ব্যাংকিং অনুশীলনে Power of Attorney নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠিত চর্চায় পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি আবশ্যক বলে মনে করা শুরু হয়। কিন্তু ২০১০ সালে সংসদ অর্থ ঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ১৬ নং আইন)-এর ৩ ধারাবলে ধারা ১২(৩) থেকে “(Power of Attorney)” বন্ধনী ও শব্দগুলো সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দেয়। এটি কোনো অসাবধানতাবশত বাদ পড়া নয়; এটি সংসদের সুস্পষ্ট অবস্থান।
আরও পড়ুন : বাটোয়ারা মামলায় একটি ‘গাণিতিক জালিয়াতি’র এনালগ ব্যবচ্ছেদ!
এই সংশোধনীর আইনি তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। সংসদ মূলত বলেছে— বন্ধক দলিলেই যদি বিক্রয়-ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রদান করা হয়, তাহলে আলাদা Power of Attorney-এর আর কোনো আইনি আবশ্যকতা নেই। Transfer of Property Act, ১৮৮২-এর ধারা ৬৯ অনুযায়ী mortgagee-এর বিক্রয় ক্ষমতা একটি registered instrument-এ express power of sale থাকলেই কার্যকর হয়। বন্ধক দলিল যেহেতু নিজেই একটি registered instrument, তাই সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে বিক্রয়-ক্ষমতা লিপিবদ্ধ থাকলে Transfer of Property Act-এর শর্তও পূরণ হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, বন্ধক দলিলে বিক্রয়-ক্ষমতা বিষয়ে কী লেখা থাকবে বা এর ভাষা কেমন হওয়া উচিত। একটি ওয়েল ড্রাফটেড বন্ধক দলিলে সাধারণত এই ধরনের ভাষা থাকে: “ঋণগ্রহীতা কর্তৃক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা বা default-এর ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের private treaty বা auction-এর মাধ্যমে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের absolute এবং unfettered ক্ষমতা থাকবে যা ধারা ১২ অনুযায়ী আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াও এই ক্ষমতা প্রয়োগযোগ্য হবে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ অপর্যাপ্ত হলে অন্য সম্পদ থেকেও আদায়ের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।”
এই ধরনের ভাষা ধারা ১২(৩)-এর শর্ত, T.P. Act ধারা ৬৯-এর শর্ত এবং ২০১০ সংশোধনীর আলোকে সম্পূর্ণ কার্যকর। এতে অস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে ব্যাংকিং অনুশীলনে একটি বাস্তব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বিক্রয় দলিল নিবন্ধনের সময় Power of Attorney না থাকলে জটিলতা তৈরি হয়। কিন্তু ধারা ১২(৮) এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান দিয়েছে। এই উপধারায় বলা হয়েছে যে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে ভিন্নরূপ যা-ই থাকুক না কেন, এই ধারার অধীনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক mortgage-এর অধীনে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে কোনো জামানতী সম্পত্তি বিক্রয় করা হলে উক্ত বিক্রয় ক্রেতার অনুকূলে বৈধ স্বত্ব সৃষ্টি করবে এবং ক্রেতার ক্রয়কে কোনোভাবেই তর্কিত করা যাবে না।
আরও পড়ুন : তারেক রহমানের বই পড়ার ডাক: মেধাভিত্তিক জাতি গঠনে পাঠাগার স্থাপন ও জাতীয় পাঠ্যতালিকার আবশ্যকতা
আবার একই আইনের ধারা ৩-এর overriding provision অনুযায়ী এই আইনের বিধান অন্য সব আইনের উপর প্রাধান্য পাবে। ফলে Registration Act-সহ অন্য যেকোনো আইনগত বাধা এই ধারার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
এই প্রসঙ্গে ধারা ১২(৮)-এর proviso-টিও মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার। সেখানে বলা হয়েছে— আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিক্রয় কার্যক্রমে কোনো অবৈধতা বা পদ্ধতিগত অনিয়ম থাকলে ঋণগ্রহীতা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন। এখানে “অবৈধতা” বলতে বোঝায় বিক্রয়ের মূল আইনি ভিত্তিতে ত্রুটি। যেমন: বন্ধক দলিলে বিক্রয়-ক্ষমতাই ছিল না, অথবা ঋণ আসলে পরিশোধ হয়ে গিয়েছিল, অথবা যে সম্পত্তি বন্ধক ছিল না সেটি বিক্রয় করা হয়েছে।
আর “পদ্ধতিগত অনিয়ম” বলতে বোঝায় ভিত্তি সঠিক ছিল কিন্তু প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল। যেমন: যথাযথ নোটিশ না দেওয়া, ধারা ৩৩-এর নিলাম বিজ্ঞপ্তির শর্ত পালন না করা বা অস্বাভাবিক কম মূল্যে সম্পত্তি বিক্রয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— উভয় ক্ষেত্রেই আইন কিন্তু বিক্রয় বাতিল হওয়ার সুযোগ দেয়নি, কেবল ক্ষতিপূরণের পথ খোলা রেখেছে। এটিও সংসদের একটি স্পষ্ট অবস্থান যে ঋণগ্রহীতার প্রতিকারের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ না করা।
সুতরাং সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০১০ সংশোধনীর পর অর্থ ঋণ আদালত আইনের অধীনে আদালত-বহির্ভূত বিক্রয়ের জন্য Power of Attorney আর আইনগতভাবে আবশ্যক নয়, যদিও এটি নেওয়া যেতে পারে। বন্ধক দলিলে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বিক্রয়-ক্ষমতা লিপিবদ্ধ থাকলে, দলিলটি নিবন্ধিত হলে, default প্রমাণিত হলে এবং ধারা ১২(৪) অনুযায়ী ধারা ৩৩-এর notice ও বিজ্ঞপ্তি যথাযথভাবে দেওয়া হলে— আর্থিক প্রতিষ্ঠান আদালতের দ্বারস্থ না হয়েই বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারবে এবং সেই বিক্রয় সম্পূর্ণ বৈধ ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে। ব্যাংকিং আইন অনুশীলনে যে বিভ্রান্তি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, আইনের সঠিক ব্যাখ্যা ও সংশোধনীর মিলিয়ে দেখলেই তা নিরসন হয়ে যাবে।
লেখক: মো: জাহিদ হোসেন, আইন কর্মকর্তা, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি। যোগাযোগ: zahidhossainlaw@gmail.com

