কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা ও ক্রয় কার্যক্রমে নজিরবিহীন অনিয়ম, জালিয়াতি এবং কার্যাদেশের শর্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ও শাস্তিমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে আসল তোশিবা ব্র্যান্ডের ফটোকপি মেশিনের বদলে ‘ক্লোন’ বা নকল ও জালিয়াতিপূর্ণ মেশিন সরবরাহের চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted) করা হয়েছে। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ বাতিল এবং দরপত্রের সিকিউরিটি জামানত বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রোববার (২১ জুন) অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান (চলতি দায়িত্ব) মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি সতর্কীকরণ ও অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মেসার্স সুখতারা ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির বিবরণ অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ‘কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়’ খাতের বাজেট বরাদ্দ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি বিশ্বখ্যাত ‘তোশিবা’ (Toshiba) ব্র্যান্ডের ফটোকপি মেশিন কেনার লক্ষ্যে অফিশিয়াল দরপত্র (Tender) আহ্বান করা হয়েছিল। উন্মুক্ত এই দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ‘মেসার্স সুখতারা ইন্টারন্যাশনাল (অফিস ইক্যুইপমেন্ট সলিউশন)’-এর সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব বিবেচনা করে গত ১০ জুন তাদের অনুকূলে মেশিনটি সরবরাহের চূড়ান্ত কার্যাদেশ (Work Order) দেওয়া হয়।
আসল স্পেসিফিকেশনের বদলে ‘ক্লোন’ মেশিন গছানোর চেষ্টা
কার্যাদেশের সুনির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী মেসার্স সুখতারা ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে শতভাগ আসল (Original) এবং সম্পূর্ণ নতুন (Brand New) তোশিবা ফটোকপি মেশিন সরবরাহ করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ও গুণগত মানসম্পন্ন জেনুইন পণ্য দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এর বদলে তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি ‘ক্লোন’ বা নকল ও রিফারবিশড মেশিন সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে গছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় পণ্যটি গ্রহণের সময় প্রাথমিক যাচাইয়ে এই জালিয়াতি ধরে ফেলে এবং পুরো ঘটনাকে কার্যাদেশের মৌলিক শর্তের চরম লঙ্ঘন ও ‘সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা’ বলে অভিহিত করে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের অধীনে কঠোর ব্যবস্থা
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মেশিন সরবরাহের এই গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যালয়ের ক্রয় ও টেন্ডার কমিটির চেয়ারম্যানের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টিগোচর করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ঘটনার ভয়াবহতা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্রয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের অংশ হিসেবে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে দেশের প্রচলিত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ধারা ৬৪(৫) ও ৬৪(৬) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৩৪(৩) ও ১৪৯-এর সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান কার্যকর করা হয়। এই বিধিমালা অনুযায়ী:
-
মেসার্স সুখতারা ইন্টারন্যাশনালের অনুকূলে ইস্যুকৃত ফটোকপি মেশিন সরবরাহের কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দরপত্রটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
-
অ্যাটর্নি জেনারেলের সরাসরি নির্দেশক্রমে প্রতিষ্ঠানটির জমাকৃত দরপত্র জামানতের (Earnest Money) সম্পূর্ণ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
-
ভবিষ্যতে এই দপ্তরের কোনো প্রকার টেন্ডারে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রদ করে বিধি মোতাবেক প্রতিষ্ঠানটিকে চিরতরে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ বা ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়েছে।
সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো ঠিকাদারি বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যেন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইনি দপ্তরের সাথে এ ধরনের জালিয়াতি করার সাহস না পায়, সেজন্য অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের এই কঠোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় সব গুরুত্বপূর্ণ ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানকে অফিশিয়ালি অবহিত করা হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

