জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে আলোচনায় উঠে আসছে একঝাঁক নারী আইনজীবীর নাম। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠপর্যায়ে অংশগ্রহণ, মামলা-হামলা, কারাভোগ এবং রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের অনেকের। কেউ কেউ আবার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্রে এমপি মনোনয়নের প্রত্যাশায় রয়েছেন। আবার অনেকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যক্তিগত অবদানের ভিত্তিতেই দলের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছেন।
ফাহিমা নাসরিন মুন্নি
এমন নারী আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি। বিএনপি সরকারের সময় তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য।
বার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সুপ্রিম কোর্ট বারকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে অগ্রভাগে ছিলেন। আইনজীবী সমাজে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি একাধারে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ল’ অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং তার পরিবারও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। দুর্দিনে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি টেলিভিশন টকশোতেও বিএনপির পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন তিনি। মানবাধিকার ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতেও তার সক্রিয় অবস্থান রয়েছে।
শাকিলা ফারজানা
সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় রয়েছে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার নামও। তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত। তার পিতা মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ ছিলেন।
২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তাকে উগ্রবাদীদের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। পরে জননিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক। তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন-প্রত্যাশী ছিলেন। যদিও তার মনোনয়ন বাতিল হয়, পরে তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে।
সালিমা তালুকদার আরুনি
ব্যারিস্টার সালিমা তালুকদার আরুনির নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি বিএনপির মরহুম মহাসচিব ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের কন্যা। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পিতার নির্বাচনী এলাকা জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন-প্রত্যাশী হন। আইনজীবী হিসেবে তিনিও সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
সামিরা তানজিন চৌধুরী
সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরীর নামও রয়েছে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব এবং প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ হারিছ চৌধুরীর কন্যা। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং বিএনপির রাজনীতির প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
মিনা বেগম মিনি
এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন অ্যাডভোকেট মিনা বেগম মিনি। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মসূচিতে সুপ্রিম কোর্ট বারকেন্দ্রিক আন্দোলনে তাকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে। রাজপথের আন্দোলনে তিনি ‘স্লোগান কন্যা’ হিসেবেও পরিচিতি পান। এসব আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন এবং গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেছেন।
ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত অ্যাডভোকেট মিনা বেগম মিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর ডিগ্রি কলেজে ছাত্রদলের সহ-ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বর্তমান সরকারের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরিফা সুলতানা রুমা
ঢাকা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমার নামও আলোচনায় রয়েছে। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তিনি একাধিক হামলা-মামলার শিকার হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কয়েকবার কারাবরণ করেন।
পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় অ্যাডভোকেট রুমা। বর্তমানে তিনি চাটমোহর পাইলট গার্লস হাইস্কুলের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বগুড়া জেলা থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
জেসমিন সুলতানা জুই
সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় ঢাকা বারের অ্যাডভোকেট জেসমিন সুলতানা জুইয়ের নামও রয়েছে। তিনি ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
পিরোজপুর থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা জেসমিন সুলতানা জুই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে তিনি চীন থেকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৮ সালে তিনি ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের অধীনে মাস্টার ট্রেইনার প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন প্রশিক্ষিত ফার্স্ট এইডার হিসেবেও কাজ করেছেন।
এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের আলোচনায় আরও রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা, নিপুণ রায় চৌধুরী, সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম, অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ এবং অ্যাডভোকেট মরিয়ম মনসুর।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন, নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ছয়টি আসন এবং স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য দল পেয়েছে সাতটি আসন।
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন মোট ৫০টি। আসন অনুপাতে বিএনপির প্রাপ্যতা ৩৫টি। বাকি ১৫টি আসন পাবে জামায়াত, স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য দল।
এই ৩৫টি আসনের জন্য রাজনীতিক, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্প-সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী নারীদের মধ্য থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। ফলে সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের মধ্যে তদবির ও লবিং জোরালো হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই আইনাঙ্গনের বেশ কয়েকজন পরিচিত নারী আইনজীবীর নাম বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।

