আইন ও আদালত
আইন ও আদালত

শেবাচিমে ভুল ইনজেকশনে দুই নারীর মৃত্যু: স্বপ্রণোদিত মামলা নিল আদালত, তদন্তে বিএমপিকে নির্দেশ

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে অপারেশনের আগে ভুল চিকিৎসায় দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বপ্রণোদিত (সু-মোটো) মামলা গ্রহণ করেছেন অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস, বরিশাল আদালতের বিচারক এস. এম. শরিয়ত উল্লাহ The Code of Criminal Procedure, 1898 এর ধারা ১৯০(১)(গ) অনুযায়ী “মিস কেস নং-১/২০২৬” রুজু করে গত সোমবার (১৬ মার্চ) এ আদেশ দেন।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে—বরিশাল মহানগরের কোতয়ালি থানাধীন শেবাচিম হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগে অপারেশনের আগে ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের ফলে দুই নারী রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে গত ১৫ মার্চ প্রকাশিত একটি অনলাইন সংবাদে বলা হয়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ভাল্লুগঞ্জ গ্রামের মান্নানের স্ত্রী শেফালী বেগম (৬০) এবং বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার মৃত বাবু হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৫) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে শেফালী বেগম মহিলা ইএনটি ওয়ার্ডের ৭ নম্বর বেডে এবং হেলেনা বেগম ১০ নম্বর বেডে ভর্তি ছিলেন।

দুই রোগীরই ওইদিন অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকালে সিনিয়র স্টাফ নার্স মলিনা রানী হাওলাদার তাদের শরীরে ভুলক্রমে অপারেশনের আগে দেওয়ার পরিবর্তে এনেস্থেসিয়া ইনজেকশন পুশ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ইনজেকশন দেওয়ার ২ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যেই দুই রোগী মৃত্যুবরণ করেন বলে স্বজনরা জানান।

আরও পড়ুনঅযৌক্তিকভাবে আইন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী

ঘটনার পর স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং অভিযোগ করেন, রোগীরা পূর্বে সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। অভিযুক্ত নার্স নিজের ভুল স্বীকার করে কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি বলে জানা যায়।

হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীরও প্রাথমিকভাবে নার্সদের গাফিলতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, অপারেশনের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে আগে এনেস্থেসিয়া প্রয়োগ করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে ইএনটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আমিনুল হককে। অন্য সদস্যরা হলেন উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহনাজ পারভীন এবং আবাসিক সার্জন ডা. আল মামুন খান।

আদালত তার আদেশে বলেন, যদি প্রকাশিত সংবাদ সঠিক হয়ে থাকে, তবে এটি গুরুতর আইনের লঙ্ঘন এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলার শামিল, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে আদালতের নজরে এসেছে।

এ অবস্থায় জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে আদালত মত দেন।

এ কারণে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে ঘটনাটি অনুসন্ধান করে আগামী ৯ এপ্রিল এর মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে।

আদালত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করার নির্দেশ দেন, যার মধ্যে রয়েছে—

  • ইনজেকশন প্রদানকারী নার্সের ডিগ্রি, সনদ ও অভিজ্ঞতা যাচাই,
  • অপারেশনের সময় দায়িত্বরত চিকিৎসকের উপস্থিতি বা তত্ত্বাবধান ছিল কি না,
  • প্রি-এনেস্থেসিয়া চেকআপসহ নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না,
  • চিকিৎসক, নার্স বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো প্রশাসনিক বা পেশাগত গাফিলতি ছিল কি না।

এছাড়া, এ ঘটনায় কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে কি না, হাসপাতালের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সংগ্রহ, প্রয়োজন হলে সিভিল সার্জনের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, চিকিৎসা অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু একটি গুরুতর বিষয়। একজন রোগী চিকিৎসকের ওপর আস্থা রেখে নিজের শরীরের ওপর চিকিৎসা হস্তক্ষেপের অনুমতি দেন। সেই আস্থার অপব্যবহার বা অবহেলা শুধু প্রতারণা নয়, এটি জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করে।

এ ধরনের অবহেলা দণ্ডবিধির ৩০৪ক, ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।