চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বরিশাল
চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বরিশাল

বরিশালে নার্সিং প্রশিক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ: বিএমপি কমিশনারকে অনুসন্ধানের নির্দেশ আদালতের

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল | বরিশাল মহানগরের কোতয়ালি থানাধীন সিএন্ডবি রোডে অবস্থিত ‘ডি ডাব্লিউ এফ নার্সিং কলেজ’-এর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি (The Code of Criminal Procedure, 1898)-এর ১৯০(১)(গ) ধারা অনুযায়ী একটি মিস কেস (মিস কেস নং-০২/২০২৬) দায়ের করে নথি খোলার নির্দেশ দিয়েছেন।

বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্যা পিস এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ্ এই ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেন।

আদেশের বিবরণে বলা হয়, গত ১১ মে, ২০২৬ তারিখে সময় টিভিতে “বরিশালে নার্সিং প্রশিক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রচারিত হয়। সংবাদ অনুযায়ী, ডি ডাব্লিউ এফ নার্সিং কলেজটি একটি ভাড়া ভবনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বিএসসি নার্সিং-এর প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণের নামে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে মোট ২৭,০০,০০০/- (সাতাশ লক্ষ) টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা মিছিল, অনশন এবং শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখলেও কোনো প্রতিকার পাননি।

সময় টিভির প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, কাগজে-কলমে বরিশাল, পটুয়াখালী ও মাদারীপুরে ১৫টিরও বেশি কলেজ দেখানো হলেও বাস্তবে এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। সরকারি তদন্ত এলেই এক প্রতিষ্ঠানে দুটি ভিন্ন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোঃ জহিরুল ইসলাম একসময় আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে এই নিয়মের রাজত্ব চালাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বেও আদালতে প্রতারণা, জালিয়াতি ও নারী কেলেঙ্কারির একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

টাকা আত্মসাতের বিষয়ে চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলামের দাবি, তিনি এই অর্থ শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার আইনি সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন : আমতলীতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর গনির সঙ্গে আইনজীবীদের মতবিনিময়

আদালত তাঁর আদেশে উল্লেখ করেন, প্রকাশিত সংবাদটি সঠিক হয়ে থাকলে তা একটি গুরুতর আইনের লঙ্ঘন যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সার্বিক বিবেচনায় আদালত বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনারকে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ADC) পদমর্যাদার নিচে নন—এমন একজন দক্ষ কর্মকর্তা দ্বারা পুরো ঘটনাটির বিস্তারিত অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে তাঁর প্রতিবেদনে অন্য বিষয়ের সাথে বিশেষ করে নিচের ৪টি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে: ১. ডি ডাব্লিউ এফ নার্সিং কলেজ কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কেউ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের নামে টাকা আদায় করেছে কি-না? ২. টাকা আদায় করে থাকলে: ক) উক্ত টাকা গ্রহণে আর্থিক বিধান অনুসরণ নাকি লঙ্ঘন করা হয়েছে? খ) কতজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট কত টাকা আদায় করা হয়েছে? গ) উক্ত টাকা আদায়ের সাথে সুনির্দিষ্টভাবে কে কে জড়িত বা সম্পৃক্ত ছিল? ঘ) এই লেনদেনের সাথে শের-ই-বাংলা হাসপাতালের কারও সম্পৃক্ততা আছে কি-না?

আদেশে বিচারক এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ্ এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেন—

প্রায়ই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য নামে বিধি বহির্ভূত বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা/স্নেহ, আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তা নষ্ট হচ্ছে। একই সাথে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আদেশে আরও বলা হয়, এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা দণ্ডবিধির (Penal Code) ৩৮৫, ৪০৬ ও ৪২০ ধারা সহ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আদালত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন, খসড়া মানচিত্র প্রস্তুত, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড এবং অপরাধের সাথে জড়িত ও সাক্ষীদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত উল্লেখপূর্বক আগামী ১৫/০৬/২০২৬ খ্রি. তারিখের মধ্যে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএমপি পুলিশ কমিশনার এবং সদয় অবগতির জন্য বরিশাল মহানগর দায়রা জজ, চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও বরিশালের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।