নীলফামারী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট
নীলফামারী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট

আদালতে মূল আসামির বদলে কাঠগড়ায় ‘প্রক্সি’; হাজতখানায় রহস্য ফাঁস, প্রক্সিদাতাও জেলে

নিজস্ব প্রতিবেদক, নীলফামারী | নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতে একটি মামলার শুনানিতে মূল আসামির পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ‘প্রক্সি’ দেওয়ার এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর আদালতের হাজতখানায় নাম-ঠিকানা মেলাতে গিয়ে খুলে যায় এই ছদ্মবেশের পুরো রহস্য, যা পুরো আদালতপাড়ায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতে গতকাল সোমবার (১৮ মে) চাঁদাবাজি ও অপহরণ সংক্রান্ত একটি মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ ও জামিন শুনানির নির্ধারিত দিনে এই ঘটনা ঘটে। বিচারক মো. মাহমুদুল হাসান শুনানির পর আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিলে হাজতখানায় গিয়ে মূল রহস্য উন্মোচিত হয়।

আদালত সূত্র ও মামলার নথি থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত এলজিইডির (LGED) আওতাধীন প্রায় দুই কোটি টাকার একটি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। মামলার বাদী মো. মনির হোসেন মিয়া (৫৩) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার নচিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মেসার্স এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।

বাদী মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, নীলফামারীর স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর এই উন্নয়নকাজে শ্রমিক সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু শ্রমিকদের প্রায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা বকেয়া রেখে তারা হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তীতে আরও অতিরিক্ত বেআইনি অর্থ দাবি করতে থাকেন।

আরও পড়ুন : একটি আমগাছ, কিছু জমি এবং দুই ভাসুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের গল্প!

২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর শ্রমিকদের বকেয়া অর্থ নিয়ে আলোচনার জন্য মনির হোসেন নীলফামারীতে গেলে অভিযুক্তরা তাঁকে ও তাঁর সহযোগীকে কৌশলে কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই গাংবের এলাকায় নিয়ে জিম্মি করে। সেখানে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদ ১১ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং ৪টি দামী মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জ থানায় পেনাল কোডের ৩৪২/৩৮৬/৩৪ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-৯, তারিখ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫; জি.আর নং-২৭৪/২০২৫) দায়ের করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আমিনুল ইসলাম তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন।

গতকাল সোমবার চার্জশিটভুক্ত আসামিরা তাদের নিযুক্ত আইনজীবী মো. মোরসালিন রায়হান (কাকন)-এর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন জানান। উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. মাহমুদুল হাসান ন্যায়বিচারের স্বার্থে সকল আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং সি-ডব্লিউ (CW) মূলে তাঁদেরকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশের পর আসামিদের যখন কোর্ট হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করার সময় এক ব্যক্তি হঠাৎ বুক ফাটানো কান্নাকাটি শুরু করেন। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সন্দেহ হলে তারা তাঁকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন যে, তাঁর নাম মো. সুমন এবং তিনি এই মামলার কোনো আসামিই নন! এই মামলার প্রকৃত আসামি হলেন তাঁর খালাতো ভাই মো. মাসুদ। মাসুদের অনুরোধে এবং জরুরি ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শুনে তিনি সরল বিশ্বাসে মাসুদের পরিবর্তে আদালতে ‘প্রক্সি আসামি’ হিসেবে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরও পড়ুন : পাথরঘাটা আদালতের এজলাসে দুই আইনজীবীর হাতাহাতি; উভয়ের সদস্যপদ স্থগিত, ওকালতিতে নিষেধাজ্ঞা

কোর্ট পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বিজ্ঞ বিচারককে অবহিত করলে সুমনকে পুনরায় আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। বিচারকের খাস কামরা ও এজলাসে জেরার মুখে সুমন অকপটে স্বীকার করেন, “হুজুর, আমি এই মামলার বিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু জানি না। খালাতো ভাইয়ের কথায় সম্পূর্ণ না বুঝে সরল বিশ্বাসে আদালতে দাঁড়িয়েছিলাম।” সুমনের বক্তব্যে জালিয়াতি ও প্রতারণার অকাট্য প্রমাণ পাওয়ায় আদালত ক্ষুব্ধ হন এবং আইনগত প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অপরাধে ছদ্মবেশী প্রক্সিদাতা সুমনকেও সরাসরি জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।

এই বিষয়ে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ মোরসালিন রায়হান কাকন বলেন, “আসামিরা আমাদের চেম্বারে যে তথ্য ও নথিপত্র দিয়েছিল, আমরা সেই অনুযায়ী হাজিরা ও জামিন আবেদন প্রস্তুত করেছিলাম। বিজ্ঞ আদালত জামিন নামঞ্জুর করার পরই আমরা জানতে পারি যে, মূল আসামি মাসুদের পরিবর্তে সুমন নামের অন্য এক ব্যক্তি প্রক্সি হিসেবে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন। একজন আইনজীবীর পক্ষে মক্কেলের এমন জালিয়াতি আগে থেকে ধরা কঠিন।”

অন্যদিকে, মামলার বাদী মনির হোসেন মিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আসামিরা আগে আমার টাকা ও মোবাইল ছিনতাই করেছে, আর এখন স্বয়ং আদালতের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতি করছে। এতেই প্রমাণিত হয় তারা কতটা দুর্ধর্ষ অপরাধী। আমি আদালতের কাছে এই জালিয়াতিরও কঠোর বিচার প্রত্যাশা করছি।”

বিচারক মো. মাহমুদুল হাসান মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।