আদালতবিমুখ আওয়ামী লীগ সমর্থিত শীর্ষ আইনজীবী নেতারা
আইনজীবী (প্রতীকী ছবি)

‘বিচারপতির নাম ভাঙিয়ে’ ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ‘ভুয়া’ আইনজীবীর বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ‘ম্যানেজ’ করা এবং রায় নিজেদের পক্ষে এনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার সিটি প্লাজা মার্কেটের বেজমেন্টের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে। নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ভুয়া পরিচয় দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া মো. আবুল হাসেম মূলত ঢাকা বারের একজন আইনজীবী।

এই জালিয়াতির ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সমতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দায়েরের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) মামলা করেছেন।

রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার সিটি প্লাজা মার্কেটের বেজমেন্টের তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী এবং বেজমেন্ট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কেএম সোহেল এই ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ১৯৯৭ সাল থেকে সিটি প্লাজার বেজমেন্টে ৫৩১টি দোকানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বাসিন্দা এবং ‘আদি বাংলা’ গার্মেন্টসের মালিক কেএম সোহেল সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদে বেজমেন্টের দোকানগুলোর বৈধতা (কার পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান) নিয়ে আইনি দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তখন ব্যবসায়ীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেন।

মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে হাইকোর্টে আইনজীবী খুঁজতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনে চেম্বার করা মো. আবুল হাসেমের শরণাপন্ন হন। কেএম সোহেল বলেন, “উনি নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের একজন বড় ল’ইয়ার পরিচয় দেন। আমার সাথে মামলা পরিচালনার জন্য একটি লিখিত চুক্তি করেন। এরপর বলেন যে, আপনি যেহেতু মূল পিটিশনার নন, তাই আপনাকে মামলায় ‘অ্যাডেড পার্টি’ (পক্ষভুক্ত) করিয়ে দেব, তাহলে সমস্ত বেনিফিট পাবেন। এই কথা বলে নিজের প্যাডে লিখিত দিয়ে আমার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেন, কিন্তু কোনো দিন আমাকে মামলায় পক্ষভুক্ত করেননি।”

‘কোর্ট ম্যানেজ’ ও বিচারপতির নাম বিক্রি

মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে হাইকোর্টের বেঞ্চ ও বিচারক ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে হাসেম ধারাবাহিকভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন। ব্যবসায়ী নেতা কেএম সোহেল অভিযোগ করে বলেন, “হাসেম আমাদের বলত—আপনাদের এই বেজমেন্টে কার পার্কিং থাকার কথা, সেখানে দোকান টিকিয়ে রাখা স্বাভাবিক ব্যাপার না। এটার পক্ষে অর্ডার নিতে হলে কোর্ট ম্যানেজ করতে হবে। অমুক জায়গায় এক কোটি দিতে হবে, ওই স্যারকে ৫০ লাখ দিতে হবে। এইভাবে বিচারকদের নাম বিক্রি করে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। শুধু একটি রায়ের কথা বলে ১ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা নেয়, যার ডকুমেন্টসও আমার কাছে আছে। সবমিলিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৫ কোটি ২১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সে।”

তবে এই নোংরা লেনদেনে উচ্চ আদালতের কোনো বিচারপতির বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা ছিল না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন—

কোনো বিচারপতির সাথে আমার দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। তারা তো কোনো টাকা-পয়সা নেননি, তারা কোনো দুইনাম্বারি বা ঘুষ খাননি। সমস্ত ঘুষ ও দুইনাম্বারিটা করেছে অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম। সে বিচারপতিদের পবিত্র নাম বিক্রি করে আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মনে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য হাসেম একদিন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির খাস কামরায় (জাজেস চেম্বার) বিচারকের অনুপস্থিতিতে পেছনের দরজা দিয়ে কেএম সোহেলকে নিয়ে যান। সেখানে বসিয়ে চা খাইয়ে হাসেম দাবি করেছিলেন, “এই রুম আমাদেরই, সব আমি নিয়ন্ত্রণ করি।”

পরবর্তীতে আবুল হাসেমের একের পর এক প্রতারণা ও মিথ্যাচার বুঝতে পেরে ব্যবসায়ীরা তাকে মামলা থেকে বাদ দেন। এরপর ব্যবসায়ীরা নিজেদের খরচে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরকে নিযুক্ত করে আইনি লড়াই চালিয়ে যান এবং অবশেষে হাইকোর্ট থেকে নিজেদের পক্ষে চূড়ান্ত রায় লাভ করেন।

অভিযুক্ত হাসেমের পরিচয় ও প্রাপ্ত নথি

অভিযোগপত্র, হলফনামা ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, অভিযুক্ত মো. আবুল হাসেমের (জন্ম: ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩) বাবার নাম মৃত চাঁদ মিয়া, মাতা সুফিয়া খাতুন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের চান্দলা গ্রামের এই স্থায়ী বাসিন্দা বর্তমানে ঢাকার পল্টনের আউটার সার্কুলার রোডের ‘অমিত আলফা ক্যাসেল’-এর একটি ফ্ল্যাটে থাকেন।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নথিমতে, তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নন। তিনি মূলত ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) একজন সদস্য। ২০০৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা বারে তালিকাভুক্ত হন (সদস্য নম্বর: ১৯৯৬৮)। পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনে চেম্বার হলেও তিনি জালিয়াতি করে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের এনেক্স ভবনের ২১৬ নম্বর রুমে বসতেন এবং অঙ্গীকারনামায়ও তা ব্যবহার করতেন।

প্রাপ্ত একটি নথিতে দেখা যায়, ইব্রাহিম ম্যানশনের প্যাডে নিজ স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে তৈরি করা একটি বিলেই তিনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। ওই বিলে অ্যাডভোকেট সোহেল রানার নামে ২ লাখ, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম হিরার নামে ৩ লাখ এবং বিবিধ খরচের নামে ১ লাখ টাকা নেওয়ার হিসাব হাসেম নিজেই লিখে রেখেছেন। এই বিষয়ে বর্তমানে শাহবাগ থানায় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং শাহবাগ থানার এসআই আল মোমেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আবুল হাসেমের পাল্টা দাবি

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসেম ৫ কোটি টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। উল্টো কেএম সোহেলের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সে কি মামলার বাদী না বিবাদী? তার তো কোনো পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) নেই। তার থেকে আমি টাকা নিব কেন, আর তার সাথে আমি চুক্তি করব কেন?”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী না হয়েও কেন হাইকোর্টের মামলার কন্ট্রাক্ট নিলেন—এমন প্রশ্নে তিনি সুর নরম করে বলেন, “না না, আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নই, আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী, ঢাকা বারের। আর আমি হাইকোর্টে কোনো মামলার কন্ট্রাক্ট নিইনি। প্রমাণ থাকলে প্রকাশ করে দিন।”

বিচারপতির খাস কামরায় ব্যবসায়ীকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি উল্টো কেএম সোহেলের বিরুদ্ধে রায় চুরির পাল্টা অভিযোগ তোলেন। হাসেম দাবি করেন, “আমি কেন জজের রুমে নিব? সে তো নিজে বিচারপতির ওখান থেকে জাজমেন্ট (রায়) চুরি করে নিয়ে আসছিল। পরে আবার এনে ফেরত দিয়ে গেছে।”