মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, হত্যা এবং যৌন নির্যাতনের উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ বিস্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, দেশে শিশুদের নিরাপত্তা আজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (২২ মে) ফ্রান্সের প্যারিস থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) এই প্রতিক্রিয়া জানায়।
বিবৃতিতে বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর একটি সাম্প্রতিক ও লোমহর্ষক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ১৬ মাসে বাংলাদেশে অন্তত ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে এবং ৪৮৩ জন শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে মোট ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে।
জেএমবিএফ মনে করে, এই পরিসংখ্যান কেবল কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; এগুলো বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা, বিচারহীনতার নগ্ন চিত্র এবং সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম সাক্ষ্য বহন করে।
বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট
সংস্থাটি সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করে, যার মধ্যে রয়েছে—রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর শিরশ্ছেদ করে হত্যা; মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সী আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা; ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ বছরের লামিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা; এবং সিলেটে শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণচেষ্টার পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা। জেএমবিএফ-এর মতে, এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও তদন্তে গাফিলতি
জেএমবিএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম বলেন,
আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় বহু ক্ষেত্রে তদন্তে গাফিলতি, আলামত নষ্ট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভিকটিম ব্লেমিং এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। অনেক পরিবার ভয়, চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ন্যায়বিচারের লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় এবং অপরাধীরা অপরাধ করতে কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা অনুভব করে না। এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক বাস্তবতা।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জেএমবিএফ-এর ৮ দফা জরুরি দাবি
বিবৃতিতে অপরাধীদের প্রতি সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয় বন্ধ করতে এবং বিচার বিভাগীয় সক্রিয়তা বাড়াতে সরকারের প্রতি ৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে:
১. দ্রুত ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত: শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
২. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. হস্তক্ষেপ বন্ধ: বিচার প্রক্রিয়ায় সকল প্রকার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৪. আইনের কঠোর প্রয়োগ: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও শিশু-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৬. ভিকটিম সাপোর্ট: ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারকে নিরাপত্তা, পুনর্বাসন, বিনামূল্যে চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা: শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় অবহেলা বা গাফিলতির জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
৮. জাতীয় জরুরি কর্মপরিকল্পনা: শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে অবিলম্বে একটি ‘জাতীয় জরুরি কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
জেএমবিএফ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF), জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশে শিশু অধিকার পরিস্থিতির এই ভয়াবহ অবনতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণের তাগিদ দিয়ে সংস্থাটি বলেছে—যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের সব দাবি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

