মোঃ জুনাইদ : মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষের উপস্থিতি সময়ের বিচারে হয়তো দীর্ঘ নয়, কিন্তু তাঁদের প্রভাব হয়ে থাকে আজীবন। আইন পেশায় আমার পথচলার প্রারম্ভে এমনই একজন অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল—প্রখ্যাত ট্রায়াল আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতির গর্ব, এডভোকেট আমিনুল গনি টিটো।
রসিকতার ছলে তিনি প্রায়ই নিজেকে “বটتলার উকিল” বলে পরিচয় দিতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন আদালতপাড়ার এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। অসাধারণ আইনি প্রজ্ঞা, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী দক্ষতা, জেরায় অনন্য নৈপুণ্য এবং গভীর মানবিক বোধ তাঁকে সমসাময়িক আইনজীবীদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আত্মপ্রচার থেকে তিনি সবসময় দূরে থেকেছেন; বরং যত বড় হয়েছেন, ততই হয়েছেন বিনয়ী। তাঁর কর্ম, সততা ও ব্যক্তিত্বই ছিল তাঁর প্রকৃত পরিচয়।
প্রায় এক দশক আগে একটি সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত মামলা বিচারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় একজন নবীন আইনজীবী হিসেবে মামলাটির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। আত্মসমর্পণের পর আকস্মিকভাবে আসামিদের জামিন বাতিল হয়ে যায় এবং তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁদের একজনের সামনে ছিল মেডিকেল কলেজের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পেশাগত দায়িত্ব, মক্কেলের প্রত্যাশা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে আমি তখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম।
সেই সংকটময় মুহূর্তে যাঁর সহযোগিতা ও পরামর্শ আমার জন্য आशीर्वाद হয়ে এসেছিল, তিনি ছিলেন এডভোকেট আমিনুল গনি টিটো। একজন নবীন আইনজীবীর প্রতি তিনি শুধু পেশাগত সহায়তাই প্রদান করেননি; বরং সাহস, আস্থা এবং আন্তরিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে জ্যেষ্ঠতার কোনো অহংকার ছিল না; ছিল একজন অভিজ্ঞ আইনযোদ্ধার উদারতা ও মানবিকতা। তাঁর সক্রিয় সহযোগিতায় পরদিনই আসামিদের জামিন মঞ্জুর হয় এবং পরবর্তীতে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে তাঁরা অব্যাহতি লাভ করেন।
আজ সেই দুই তরুণের একজন চিকিৎসক এবং অন্যজন প্রকৌশলী। তাঁদের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে যাঁদের অবদান রয়েছে, এডভোকেট আমিনুল গনি টিটো নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। তাই তাঁদের সাফল্যের ইতিহাসেও তাঁর অবদান নীরবে জড়িয়ে আছে।
আরও পড়ুন : জ্ঞানের সওদা কি সবাই করতে পারে? এক অনন্য আইনজীবীর প্রস্থান ও কিছু অনুচিন্তন
পরবর্তীকালে পেশাগত ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ হয়েছিল। দেশ, রাজনীতি, আইন এবং বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। তিনি কেবল মামলার আইনজীবী ছিলেন না; ছিলেন আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের একজন দৃঢ় বিশ্বাসী সৈনিক। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আদালতের মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, নীতিনিষ্ঠ ও আপসহীন।
বিচারক হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তাঁর মূল্যবান পরামর্শ, অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ চিন্তাভাবনা আমার বিচারিক জীবনের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ঢাকায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কখনো আমার আদালতে সওয়াল করতে আসেননি; তবে আদালতের পরিবেশ, আইনজীবীদের অভিজ্ঞতা এবং বিচারপ্রার্থীদের অনুভূতি সম্পর্কে নিয়মিত মতামত ও পর্যবেক্ষণ জানাতেন। বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর এই আন্তরিক আগ্রহ ও দায়বদ্ধতা একজন সচেতন নাগরিক এবং প্রকৃত আইনজীবীর পরিচায়ক।
আজ সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করেছে। তাঁর প্রস্থান দেশের আইনাঙ্গনের জন্য নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে আমার কাছে এ ক্ষতি আরও ব্যক্তিগত। কারণ আমি হারিয়েছি এমন একজন শুভানুধ্যায়ীকে, যিনি প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন এবং সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন।
মানুষ মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু তাঁর কর্ম, character, আদর্শ ও মানবিকতা কখনো মৃত্যুবরণ করে না। এডভোকেট আমিনুল গনি টিটো তাঁর প্রজ্ঞা, সততা, মানবিকতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন বড় আইনজীবী হওয়া অবশ্যই গৌরবের, কিন্তু একজন বড় মানুষ হওয়া তার চেয়েও মহৎ।
তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের এই শোক বহনের শক্তি দান করুন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আপনি আপনার কর্ম, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন।
লেখক : সিনিয়র সিভিল জজ (লিগ্যাল এইড অফিসার), সুনামগঞ্জ; (সাবেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা)।

