আমতলী (বরগুনা) ব্যুরো | বরগুনা জেলার আমতলীতে জমি দখলবাজদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে সশরীরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ‘সামারি ট্রায়াল’ বা সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে এক অনন্য ও দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করেছেন আদালত। মাত্র ৮ দিনের মাথায় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে দুইজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় নারীর জমি উদ্ধার করে দখল বুঝিয়ে দিয়েছেন বিচারক।
জমি সংক্রান্ত বিরোধের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন বরগুনার আমতলী উপজেলা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ইফতি হাসান ইমরান। গতকাল সোমবার (৮ জুন) বিকেলে তিনি নিজেই সরেজমিনে বিরোধপূর্ণ জমিতে উপস্থিত হয়ে তাৎক্ষণিক সাক্ষ্য গ্রহণ ও সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্ন করেন।
আদালতের এই যুগান্তকারী আদেশে পূর্ব চুনাখালী গ্রামের অবৈধ জমি দখলকারী মোঃ ইসমাইল মাওলানা ও মোঃ মাহাবুব নামের দুই ব্যক্তিকে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে বেদখল হওয়া জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রকৃত মালিককে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
মাত্র ৮ দিনের মাথায় ঘটনাস্থলেই বিচার সম্পন্ন: আইনি টাইমলাইন
ভূমি অপরাধের বিরুদ্ধে আদালতের এই অবিশ্বাস্য গতির বিচারিক প্রক্রিয়ার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
-
১ জুন, ২০২৬: আমতলী উপজেলার পূর্ব চুনাখালী গ্রামের বাসিন্দা মোসাঃ রেবেকা তাঁর জমি অবৈধভাবে দখল করে ঘর তোলার অভিযোগ এনে আমতলী আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা (সি.আর মামলা নং-৭৪০/২০২৬) দায়ের করেন। আরজিদারে তিনি নতুন ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ এর আওতায় জমি উদ্ধারের আবেদন জানান।
-
৮ জুন, ২০২৬: অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট ইফতি হাসান ইমরান প্রথাগত দীর্ঘস্থায়ী বিচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ঘটনাস্থলেই সামারি ট্রায়ালের সিদ্ধান্ত নেন।
গতকাল সোমবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭:০০টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা বিচারক নিজে আমতলীর পূর্ব চুনাখালী গ্রামের ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে অবস্থান করেন। সেখানে ঘেরাটোপের মাঝেই উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে উন্মুক্তভাবে মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য গ্রহণ এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। ঘটনাস্থলেই অপরাধটি হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আসামিদের উপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডবিধি ও ভূমি অপরাধ আইনের যে ধারায় সাজা ও উচ্ছেদ
ম্যাজিস্ট্রেট ইফতি হাসান ইমরান তাঁর রায়ে অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি জমি পুনরুদ্ধারে দেশের প্রচলিত দুটি শক্তিশালী আইনের ধারা প্রয়োগ করেছেন:
১. কারাদণ্ড: দালিলিক প্রমাণে জমি দখল স্পষ্ট হওয়ায় ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ এর ৭ ধারায় অত্র মামলার ১ নম্বর আসামি মোঃ ইসমাইল মাওলানা এবং ৩ নম্বর আসামি মোঃ মাহাবুবকে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
২. স্থাপনা উচ্ছেদ ও দখল হস্তান্তর: একই সাথে উক্ত ভূমি আইনের ২০ ধারা এবং শতাব্দী প্রাচীন ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC), ১৮৯৮-এর ৫২২ ধারা মোতাবেক বিরোধপূর্ণ জমির ওপর অবৈধভাবে নির্মিত ঘর ও স্থাপনা অনতিবিলম্বে অপসারণ করে অভিযোগকারী মোসাঃ রেবেকাকে জমির প্রকৃত দখল ও মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) মো. আবু বকর সিদ্দিক এই বিশেষ জুডিশিয়াল অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে একজন বিচারক নিজে এজলাস ছেড়ে মাঠপর্যায়ে গিয়ে অসহায় নারীর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনায় পুরো আমতলী এলাকায় ব্যাপক প্রশংসার জোয়ার বইছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য থামাতে এবং সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইফতি হাসান ইমরানের এই সাহসী পদক্ষেপ একটি রোল মডেল বা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।

