ইব্রাহীম খলিল মুহিম
ইব্রাহীম খলিল মুহিম

৫০০ উপজেলা বনাম ৩৬২ বিচারক: উল্টা পিরামিডে বন্দি দেশের বিচার বিভাগ

ইব্রাহীম খলিল মুহিম : সম্প্রতি দেশে ৫০০তম উপজেলা সৃজিত হয়েছে। অচিরেই হয়তো এই তালিকায় যুক্ত হবে আরও কয়েকটি নতুন নাম। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন উপজেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে প্রায় ২৫টি সরকারি অফিস। তৈরি হবে আলিশান সব প্রশাসনিক ভবন, বরাদ্দ হবে নতুন নতুন সরকারি যানবাহন এবং নিয়োগ পাবেন শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী। নতুন উপজেলাকে ঘিরে রাতারাতি আলোর মতো ডালপালা মেলবে নতুন শহর, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজ আর হাসপাতাল।

কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই আলোর পিছু পিছু হাজির হয় অন্ধকার। এই নতুন শহরগুলোকে কেন্দ্র করে সমান্তরালে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে অপরাধের এক নতুন জগৎ। মাদক ব্যবসা, মারামারি, ইভটিজিং, অবৈধ ইটভাটা, খাদ্যে ভেজাল, সরকারি খাস জমি দখল, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি গ্রাস কিংবা শরিকদের ঠকানোর মতো দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধের মহোৎসব শুরু হবে।

রাষ্ট্র এই অন্ধকার দমনের জন্য অত্যন্ত তৎপর। ৫০০টি উপজেলায় ৫০০-এর বেশি থানা রয়েছে, আছে পুলিশ ফাঁড়ি। পুলিশের পাশাপাশি কাজ করছে র‍্যাব, ডিবি, এসবি কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো বিশেষায়িত বাহিনী। অপরাধীদের ধরে আইনের মুখোমুখি করার জন্য এই বাহিনীগুলো রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু গলদটা রয়ে গেছে অন্য জায়গায়।

ফানেলের প্রশস্ত মুখ ও সরু বোতলের কূটাভাস

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই বিপুল তৎপরতার সমান্তরালে, দেশে অপরাধী এবং মামলার আনুপাতিক হারে বিচার বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক কিংবা অবকাঠামো নেই। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি দাঁড়িয়েছে একটি ফানেলের মতো। ফানেলের প্রশস্ত মুখ দিয়ে পুলিশ বা সাধারণ জনগণের মাধ্যমে লাখ লাখ মামলা বিচার বিভাগে অনায়াসে প্রবেশ করছে; কিন্তু বিচার বিভাগের আউটপুট বা বোতলের মুখটি এতটাই সরু যে, একবার মামলা ঢুকলে তা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর, এমনকি দশক পার হয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য বিচার বিভাগে অতি সম্প্রতি জেলা জজ পদমর্যাদার কিছু পোস্ট সৃজন হওয়ায় উচ্চ আদালতে বা জেলা জজ আদালতের মামলার জট কিছুটা কমতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সারাদেশে ৭২টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় থাকায় ‘আছিয়া হত্যা’ বা ‘রামিসা হত্যা’র মতো বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রায় অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে পাওয়া গেছে।

মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় যথার্থই বলেছেন—“বিচার বিভাগে এখন একটি উল্টা পিরামিড তৈরি হয়েছে।” অর্থাৎ ওপরের স্তরে (জেলা জজ বা উচ্চ আদালত) পদ ও কাঠামোর সংখ্যা বাড়লেও, একদম মাঠ পর্যায়ে (সহকারী জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট) যেখানে মামলার মূল উৎপত্তি, সেখানে তীব্র জনবল সংকট। রাষ্ট্র চাইলে মাত্র ২২০০ কোটি টাকা (কিংবা তার চেয়েও কম) অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে এই উল্টা পিরামিডকে সোজা করে দিতে পারে। চলমান ক্রমবর্ধমান অপরাধের যুগে এই পদগুলো যে কতটা জরুরি, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত।

যে মামলা নিষ্পত্তি হতে এখন ১০ বছর লাগছে, তা মাত্র ২ বছরে নামিয়ে আনার ফর্মুলা অত্যন্ত সহজ। বিচার বিভাগের বার্ষিক বরাদ্দ এই বছর ২২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৪০০ কোটি টাকা বা অন্তত এক বছরের জন্য ৩৫০০ কোটি টাকা করুন। পরের বছর থেকে আবার তা ২৫০০ বা ৩০০০ কোটির ঘরে নামিয়ে আনলেও চলবে। রাষ্ট্র যদি বিচার বিভাগে ১ গুণ বেশি বাজেট বরাদ্দ দেয়, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রকে ৫ গুণ বেশি ‘রেজাল্ট’ বা আউটপুট ফেরত দেবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে কোটি কোটি টাকার কোর্ট ফি ও রাজস্ব আদায় হবে, মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা ও অর্থ বাঁচবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে শতভাগ।

মাঠ পর্যায়ের নির্মম গাণিতিক বাস্তবতা

আসুন, মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত দেওয়ানি, ফৌজদারি ও আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড) খাতের সংখ্যার দিকে তাকানো যাক:

১. দেওয়ানি আদালত (Civil Courts):

দেশে উপজেলা ৫০০টি হলেও দেওয়ানি মামলার মূল চালিকাশক্তি তথা সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদ আছে মাত্র ১০৬টি এবং সিনিয়র সহকারী জজ পদ আছে ২৫৬টি। অর্থাৎ, সারাদেশে টোটাল দেওয়ানি বিচারক আছেন মাত্র ৩৬২ জন! এর অর্থ হলো, দেশের অন্তত ১৩৮টি উপজেলার জন্য কোনো ডেডিকেটেড সিভিল জজ নেই। এই ৩৬২ জন বিচারকের ঘাড়েই চাপানো আছে অতিরিক্ত ১৩৮টি উপজেলার দায়িত্ব।

বর্তমানে গড়ে প্রতিজন সিভিল বিচারকের কাঁধে ৩ থেকে ৪ হাজার মামলার পাহাড় সম্বলিত ভার চেপে আছে, যা আদর্শগতভাবে হওয়া উচিত ছিল বড়জোর ১ হাজার। এই বিপুল জট কাটাতে এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে দেশে অবিলম্বে আরও অন্তত ৭০০ জন সিভিল/সিনিয়র সিভিল জজ প্রয়োজন। মামলার এই ওভারলোডের কারণে প্রতিদিন প্রতিটি আদালতে মিনিমাম ১ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এই নষ্ট হওয়া সময়টুকু মূলত কেবলই দীর্ঘমেয়াদি দিন ধার্য বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পেছনে যায়, যা চূড়ান্ত বিচারে কোনো উপকার বয়ে আনে না। এর ফলে মুহুরি, আইনজীবী, কোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে বিচারক—সবারই প্রতিদিনের মূল্যবান উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হচ্ছে।

২. ফৌজদারি আদালত (Magistracy):

৫০০টি উপজেলার জন্য কাগজে-কলমে ৫০০ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পোস্ট থাকলেও, প্রায় ১০০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। এই তীব্র ম্যাজিস্ট্রেট স্বল্পতার কারণে স্পেশাল কোর্ট যেমন—সামারি ট্রায়াল, পরিবেশ আদালত, খাদ্য আদালত, বন আদালত কিংবা সদ্য প্রবর্তিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আদালতের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তার ওপর, সাম্প্রতিক আইনি ও আর্থিক এখতিয়ার পরিবর্তনের ফলে যুগ্ম জেলা জজ আদালত থেকে হাজার হাজার আর্থিক দেওয়ানি বা ফৌজদারি (যেমন- চেকের মামলা) সিআর মামলা বদলি হয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে এসেছে। বর্তমানে প্রতিজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাঁধে প্রায় আড়াই হাজার মামলার বোঝা। মানসম্পন্ন ও দ্রুত বিচারের জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে সর্বোচ্চ ১ হাজার মামলা থাকা উচিত। এই ঘাটতি পূরণে দেশে আরও অন্তত ৫০০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা জরুরি।

৩. সরকারি আইনি সহায়তা (Legal Aid):

বর্তমানে ৫০০টি উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সব মিলিয়ে লিগ্যাল এইড অফিসার আছেন মাত্র ১০০ জনের মতো। অথচ প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) বা মিডিয়েশন সেবা পৌঁছে দিতে প্রতি উপজেলায় ১ জন করে লিগ্যাল এইড অফিসার এবং জেলা/মহানগর অফিসে অতিরিক্ত ৩/৪ জন কর্মকর্তা প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশে আরও অন্তত ৫০০ জন লিগ্যাল এইড অফিসার প্রয়োজন।

১৭০০ বিচারক নিয়োগের আর্থিক খসড়া: রাষ্ট্র কি আসলেই অক্ষম?

বিচার বিভাগকে পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচাতে এই মুহূর্তে মোট ($৭০০ + ৫০০ + ৫০০ = ১৭০০$) জন নতুন বিচারক নিয়োগ করা রাষ্ট্রের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই ১৭০০ জন অফিসারের পেছনে রাষ্ট্রের বার্ষিক ও এককালীন খরচ কত হতে পারে, তার একটি আনুমানিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

  • বেতন-ভাতা (বার্ষিক): ১৭০০ জন অফিসারের মাসিক এভারেজ বেতন ৬০,০০০ টাকা ধরলে, বছরে মোট খরচ হবে আনুমানিক ১২০ কোটি টাকা

  • সহায়ক জনবল (বার্ষিক): প্রতি বিচারকের জন্য ৩ জন করে সহায়ক স্টাফ (মোট ৫১০০ জন) নিয়োগ দিয়ে তাঁদের গড় বেতন ২৫,০০০ টাকা ধরলে, বার্ষিক খরচ হবে আনুমানিক ১৭৮ কোটি টাকা

  • অবকাঠামো ও যানবাহন (এককালীন): প্রতি অফিসারের অফিস, এজলাস ও লজিস্টিকস বাবদ এককালীন ৫০ লাখ টাকা ধরলে (যা আগামী ২৫-৩০ বছরে শুধু পরিচালনা ব্যয় ছাড়া আর কোনো খরচ বাড়াবে না) মোট খরচ হবে আনুমানিক ৮৫০ কোটি টাকা

  • আনুষঙ্গিক ব্যয় (বার্ষিক): বইপত্র, কম্পিউটার, আইটি ল্যাব ও স্টেশনারি বাবদ বছরে খরচ হবে আনুমানিক ৫১ কোটি টাকা

বাকি ২২টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) ভবন নির্মাণ, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, জুডিসিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং একাডেমির উন্নয়ন ইত্যাদি সব মিলিয়ে প্রথম বছর রাষ্ট্রের মোট খরচ হবে ১২০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকা (সর্বোচ্চ ২০০০ কোটি)। আর পরবর্তী বছরগুলোতে এর পরিচালন ব্যয় হবে মাত্র ৩৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা

রাষ্ট্র যদি প্রথম বছরে একসাথে ১৭০০ জন বিচারক বিসিএস (জুডিসিয়াল) বা জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিকল্প পথও খোলা আছে। আইনজীবী বা আইনি গবেষকদের মধ্য থেকে ৫ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক ‘অ্যাড-হক’ নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এই ৫ বছরের মধ্যে কমিশন স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে চুক্তিভিত্তিক বিচারকরা বিদায় নেবেন। তবে এই অর্থবছর থেকেই অবকাঠামো নির্মাণের মাস্টারপ্ল্যান ও বিনিয়োগ শুরু করা দরকার।

শেষ কথা

একটি রাষ্ট্র কেবল রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ফ্লাইওভার আর নতুন নতুন প্রশাসনিক উপজেলা দিয়ে উন্নত হয় না। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার আইন ও বিচার ব্যবস্থা। উপজেলা ৫০০টি করে আমরা যদি সেখানে অপরাধ দমনের জন্য ডজনখানেক বাহিনী নামাতে পারি, তবে সেই অপরাধের সুচারু বিচারের জন্য ১৭০০ জন বিচারক নিয়োগ দিতে রাষ্ট্রের কার্পণ্য কেন?

রাষ্ট্রের নিকট আকুল আবেদন—আসন্ন বাজেটে দেশের বিচার বিভাগকে কার্যকর ও গতিশীল করার জন্য অন্তত ৫০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দিন। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যাত্রায় বিচার বিভাগকে সবার আগে না হলেও, অন্তত সবার সাথে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে চলুন। বিচারহীনতা কিংবা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার অন্ধকার ঘুচে গেলেই কেবল আলোর সুফল পাবে সাধারণ মানুষ।

লেখক : মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, খুলনা।