(কেস স্টাডি–২ | দ্বিতীয় খণ্ড: একটি বাটোয়ারা মামলার আরজি, দলিল, রেকর্ড ও গাণিতিক হিসাবের আইনি বিশ্লেষণে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য)
বাংলাদেশে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তবে দলিল, খতিয়ান, রেকর্ড ও হিস্যার গাণিতিক অসংগতি সৃষ্টি করে অতিরিক্ত জমি দাবির অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিচারাধীন একটি বাটোয়ারা মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণে এমনই এক সংখ্যাগত অসামঞ্জস্যের বিষয় উঠে এসেছে।
এই অনুসন্ধানভিত্তিক কেস স্টাডিতে উঠে এসেছে ২২ বছর আগে দায়ের হওয়া গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন একটি বাটোয়ারা মামলায় (মামলা নং- ৫২/০৪) ‘Arithmetic Fraud’ বা গাণিতিক জালিয়াতির মাধ্যমে ১৬ শতকের কম জমিকে ২১ শতক দেখিয়ে অতিরিক্ত ৫ শতক দখলের চাঞ্চল্যকর অপচেষ্টা উন্মোচিত হয়েছে। আরজি দৃষ্টে, কবুলিয়ত দলিল, খতিয়ান, রেকর্ড, খাজনা রশিদ ও গাণিতিক হিসাব বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে—দলিল অনুযায়ী প্রায় ১৫.৫৬ শতক (১৬ শতকের কম) জমিকে ২১ শতক হিসেবে দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রায় ৫ শতক অতিরিক্ত জমির দাবির ভিত্তি কী—সেই প্রশ্নই মামলার কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
গাণিতিক অসংগতি: মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন?
নথি অনুযায়ী প্রকৃত জমির হিসাব:
-
১ম কবুলিয়ত দলিল (২ কাঠা ২ ছটাক ১০ গণ্ডা) = ৩.৫৬ শতক
-
২য় কবুলিয়ত দলিল = ১২ শতক
-
প্রকৃত মোট জমি = ১৫.৫৬ শতক
কিন্তু মামলার আরজিতে মোট ২১ শতক জমির দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৫.৫৬ শতক ও ২১ শতকের এই ৫ শতকের পার্থক্যই মামলার প্রধান গাণিতিক ও আইনি বিতর্ক।
পক্ষদ্বয়ের দলিল ও দখলের বাস্তব চিত্র
বিবাদীপক্ষের ০৮ শতক জমির মালিকানা
নথি অনুযায়ী, ২৪ শতক জোত জমির মধ্যে বিবাদীপক্ষের মৌরশ ময়েজ উদ্দিন মন্ডল গং ১৯৩৬ সালের কবুলিয়ত দলিলের মাধ্যমে ০৩ + ০৫ = ০৮ শতক জমির প্রজা স্বত্ব অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ, কবুলিয়ত, বসতবাড়ি, গুদামঘর এবং দীর্ঘদিনের ভোগদখলের তথ্য এই মালিকানার ধারাবাহিকতার সমর্থনে উপস্থাপিত হয়েছে।
বাদীপক্ষের দলিলভিত্তিক জমি
বাদীপক্ষের মৌরশ জফের মামুদ বেপারি ১৯৩৭ ও ১৯৩৯ সালের দুটি কবুলিয়ত দলিলে মোট ৩.৫৬ + ১২ = ১৫.৫৬ শতক জমি বন্দোবস্ত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে উত্তরাধিকার ও ক্রয়সূত্রে ওই জমির অংশ ভোগদখল করে আসছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিপত্র ও হিস্যা বণ্টনের ১২টি প্রধান অসংগতি
১. নালিশী জমির পরিচিতি
সাদুল্লাপুর মৌজা, জে.এল নং-৪১, দাগ নং-৫২৬-এর মোট ২৪ শতক জমি জমিদারি আমলের জোত জমি। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী জমির মালিক ছিলেন স্যার প্রদ্যুৎ কুমার ঠাকুর বাহাদুর ও কোর্ট অব ওয়ার্ডস। এই জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত।
২. ২১ শতকের দাবির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন
মামলার আরজিতে ২ কাঠা ২ ছটাক ১০ গণ্ডাকে ৯ শতক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রচলিত ভূমি পরিমাপ অনুযায়ী এর প্রকৃত পরিমাণ প্রায় ৩.৫৬ শতক। সেই হিসাবে মোট জমি ১৫.৫৬ শতক হলেও ২১ শতক দাবি করার বিষয়টি মামলার কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
৩. বিবাদীপক্ষের ০৮ শতক জমির দখল
কবুলিয়ত দলিল, খাজনা রশিদ এবং দীর্ঘদিনের ভোগদখলের তথ্য অনুযায়ী বিবাদীপক্ষ ০৮ শতক জমিতে বসতবাড়ি, গুদামঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে দখলে রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
৪. ১৫.৫৬ শতক বনাম ২১ শতক
দুটি কবুলিয়ত দলিলে মোট ১৫.৫৬ শতক জমির ভিত্তি পাওয়া গেলেও এসএ রেকর্ডে ২১ শতক দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই অতিরিক্ত প্রায় ৫ শতক জমির উৎস নিয়েই মামলার মূল বিরোধ।
৫. এসএ রেক্রেডে হিস্যা নিয়ে বিতর্ক
২৯১ নং এসএ খতিয়ানে ০.fifty (আট আনা) অংশ উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেটিকে পূর্ণ মালিকানার ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার অভিযোগ রয়েছে। নথি অনুযায়ী এই অংশের ভিত্তিতে ২১ শতক দাবি করার আইনগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৬. একক ক্রয়, একাধিক নাম
জফের মামুদ বেপারির নামে ক্রয়কৃত জমি পরবর্তী এসএ রেকর্ডে অন্য উত্তরাধিকারী ও আত্মীয়দের নামেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তির আইনগত বৈধতা নিয়েও বিরোধ বিদ্যমান।
আরও পড়ুন : বাটোয়ারা মামলায় একটি ‘গাণিতিক জালিয়াতি’র এনালগ ব্যবচ্ছেদ!
৭. রেকর্ড বঞ্চনার অভিযোগ
বিবাদীপক্ষের দাবি, তাদের বৈধ ০৮ শতক জমির মধ্যে মাত্র ০৩ শতক রেকর্ডভুক্ত হয়েছে; অবশিষ্ট ০৫ শতক রেকর্ডে প্রতিফলিত হয়নি, যা রেকর্ড বঞ্চনার অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
৮. ওয়ারিশ ও ক্রয়সূত্রে অতিরিক্ত দাবির অভিযোগ
নথি অনুযায়ী জোবেদা বেওয়ার দলিলসমর্থিত মালিকানা প্রায় ৭.৮০২ শতক, অথচ দাবি করা হয়েছে ৯.৫৮ শতক। অতিরিক্ত ১.৭৭৮ শতক দাবির সমর্থনে পৃথক দলিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯. পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনে দ্বিগুণ দাবির অভিযোগ
নথিপত্র বিশ্লেষণে পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনেও একাধিক অসংগতির অভিযোগ উঠে এসেছে। দুলা মিয়ার ওয়ারিশদের বৈধ ক্রয়কৃত ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির সঙ্গে অতিরিক্ত জমি যুক্ত করে দাবি উপস্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে সাহেব উদ্দিন পরিবারের স্বীকৃত হিস্যা অক্ষুণ্ণ থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অংশ দাবি করার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বণ্টন-হিস্যায় অভিযোগের বিশেষ দিকসমূহ:
উত্তরাধিকার হিস্যার অসংগতি: দুলা মিয়ার রেকর্ডীয় ১.৭৫ শতক জমি আইন অনুযায়ী স্ত্রী, ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে বণ্টিত হওয়ার কথা। নথিতে ৫ ছেলের মোট হিস্যা ০.৯৩৫ শতক উল্লেখ থাকলেও এর বাইরে অতিরিক্ত দাবির অভিযোগ রয়েছে।
ক্রয়কৃত জমিতে অতিরিক্ত দাবি: বৈধ কবলা মূলে ক্রয়কৃত ৩.৫০ শতক জমি দুলা মিয়ার ৫ ছেলের নামে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও সেই জমিও দাবির আওতায় আনা হয়েছে বলে অভিযোগ, যা দলিল ও বাস্তব দখলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসএ রেকর্ডের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন: এসএ খতিয়ানে ০.৫০ (আট আনা) অংশের ভিত্তিতে ২১ শতক ধরে চার ভাগে ৫.২৫ শতক করে হিস্যা নির্ধারণের দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। তবে এই হিসাবের সমর্থনে মূল কবুলিয়ত বা দলিলে সুস্পষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায় না।
১০. প্রকৃত মালিকানা বনাম দাবিকৃত পরিমাণ
মামলার নথি অনুযায়ী বাদীপক্ষের মৌরশের দুটি কবুলিয়ত দলিলে মোট জমির পরিমাণ ১৫.৫৬ শতক। কিন্তু আরজি ও পরবর্তী রেকর্ডে ২১ শতক জমির দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫ শতক অতিরিক্ত জমির উৎস কী—সেই প্রশ্নই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
১১. নথি, রেকর্ড ও গাণিতিক হিসাবের অসংগতি
দলিল, খতিয়ান, এসএ রেকর্ড, কবুলিয়ত ও গাণিতিক হিসাব পর্যালোচনায় একাধিক অসংগতির অভিযোগ প্রতীয়মান হয়েছে। এসএ খতিয়ানে ০.৫০ (আট আনা) অংশ উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ মালিকানার ভিত্তিতে হিসাব উপস্থাপন এবং বিবাদীপক্ষের দাবি অনুযায়ী ৮ শতকের মধ্যে মাত্র ৩ শতক制造 রেকর্ডভুক্ত হওয়া—এসব বিষয়ই বিরোধকে জটিল করেছে।
১২. শতবর্ষ পর বাটোয়ারা মামলা—প্রশ্ন কোথায়?
বিবাদীপক্ষের দাবি অনুযায়ী, প্রায় একশ বছর ধরে ০৮ শতক জমি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখলে থাকার পর ২০০৪ সালে ৫২/০৪ নং বাটোয়ারা মামলা দায়ের করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—স্বীকৃত দখল, কবুলিয়ত ও দীর্ঘদিনের ভোগদখল বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এত দীর্ঘ সময় পরে নতুন করে বাটোয়ারার দাবি কেন উত্থাপিত হলো? তবে এই প্রশ্নের চূড়ান্ত মূল্যায়ন আদালতের বিষয়।
আদালতের সামনে মূল আইনি প্রশ্নসমূহ
এই মামলায় আদালতের বিবেচনার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—
১. দলিলে ১৫.৫৬ শতক জমির ভিত্তি থাকলেও রেকর্ড ও আরজিতে ২১ শতক দাবি কীভাবে সৃষ্টি হলো?
২. এসএ খতিয়ানের ০.৫০ (আট আনা) অংশকে পূর্ণ মালিকানার ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা আইনসম্মত কি না?
৩. স্বীকৃত ভোগদখল, কবুলিয়ত, খাজনা রশিদ ও মূল দলিলের বাইরে অতিরিক্ত জমি দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না?
৪. ওয়ারিশ হিস্যা, ক্রয়সূত্রে অর্জিত জমি এবং রেকর্ডের গাণিতিক হিসাব প্রকৃত দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
এই প্রশ্নগুলোর আইনসম্মত নিষ্পত্তিই মামলার প্রকৃত সত্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপসংহার ও সমাপনী পর্যবেক্ষণ
সমগ্র নথিপত্র, দলিল, কবুলিয়ত, খতিয়ান, রেকর্ড, খাজনা রশিদ এবং গাণিতিক হিসাব বিশ্লেষণে দলিলভিত্তিক জমির পরিমাণ ও দাবিকৃত জমির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের অভিযোগ প্রতীয়মান হয়েছে। দীর্ঘ ২২ বছর (২০০৪-২০২৬) ধরে চলমান এই মামলা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তির কারণ হয়েছে।
একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য বিচারাধীন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া নয়; বরং নথিতে প্রতীয়মান তথ্য, সংশ্লিষ্ট আইনি প্রশ্ন এবং উত্থাপিত অসংগতিগুলো তথ্যভিত্তিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। মামলার অভিযোগের সত্যতা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভরশীল।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন ৫২/০৪ ও ৭৬/০৬ নং মামলার নথিপত্র, দলিল, খতিয়ান ও রেকর্ড বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত। পরবর্তী খণ্ডে প্রকাশিত হবে—কবলা দলিল, ওয়ারিশ হিস্যা এবং নতুন কৌশলে জমি আত্মসাতের অভিযোগের আরও বিস্তারিত আইনি বিশ্লেষণ।
লেখক : মো. জিল্লুর রহমান পলাশ, গণমাধ্যমকর্মী | এম.এ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), এলএলবি, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, জেলা জজ কোর্ট, গাইবান্ধা।

