শামস নজীব অর্ক
শামস নজীব অর্ক

লিগ্যাল এইড অফিস কি আদালতের বিকল্প হবে, নাকি থানার সালিশ দরবারের আরেকটি সংস্করণ?

শামস নজীব অর্ক : বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলা জট দীর্ঘদিনের এক নির্মম বাস্তবতা। আদালতের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়েনি; বিভিন্ন আইন সংস্কার হয়েছে, কিন্তু মামলার চাপ কমেনি। এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়েই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) বিচারব্যবস্থার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ সংশোধনের মাধ্যমে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার আওতায় মধ্যস্থতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। পরবর্তীতে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনি পরামর্শ ও মধ্যস্থতা) বিধিমালা, ২০২৫’-এ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে প্রি-লিটিগেশন ও কোর্ট-রেফার্ড মধ্যস্থতার বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের ‘স্পেশাল মেডিয়েটর’ (Special Mediator) হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারা আদালতকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিরোধ মধ্যস্থতায় পাঠানোর ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—বিচারব্যবস্থার একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলা।

মধ্যস্থতাকারীর আসল শক্তি: ক্ষমতার চাপ নয়, বিশ্বাস

একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী এমন একটি বিরোধের সমাধান করতে পারেন, যা অন্যথায় বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকত। এতে বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও ভোগান্তি কমে এবং পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি দেখা দেয়—

যাঁরা স্পেশাল মেডিয়েটর হিসেবে নিয়োগ পাবেন, তাঁদের নির্বাচন কীসের ভিত্তিতে হবে?

পেশাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, সততা ও নিরপেক্ষতা—নাকি রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব?

প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এটি বাংলাদেশের এডিআর ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একজন মধ্যস্থতাকারীর হাতে বিচারকের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা সাজা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। তাঁর একমাত্র শক্তি হলো—বিশ্বাস (Trust)। বিরোধে জড়িত দুই পক্ষ তাঁর সামনে বসেন এই আস্থায় যে, তিনি আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ সমাধানের সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।

সামাজিক সালিশ, থানার দরবার বনাম আইনি মধ্যস্থতা

বাংলাদেশের সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে—গ্রামবাংলার সালিশ, পঞ্চায়েত কিংবা মাতব্বরের বৈঠক। সময়ের সঙ্গে এর রূপ বদলেছে। আজও বহু এলাকায় জমি বা পারিবারিক বিরোধে মানুষ প্রথমে আদালতের কথা ভাবেন না; খোঁজেন এমন একজনকে, যিনি ‘মীমাংসা করে দিতে পারবেন’।

এই বাস্তবতায় অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা থানার কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিক সালিশের অংশ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে থানাকেন্দ্রিক আপস-মীমাংসা আমাদের সমাজে এক বহুল পরিচিত চিত্র। ওসির কক্ষে বসে লিখিত মুচলেকা ও প্রভাবশালী সমাজের উপস্থিতিতে যে একপাক্ষিক নিষ্পত্তি ঘটে, সেখানে প্রশ্ন থেকে যায়—

  • সেখানে পক্ষগুলোর সম্মতি কতটা স্বাধীন ছিল?

  • ক্ষমতার ভারসাম্য কি সমান ছিল?

  • আইনগত অধিকার কি যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে?

  • সেখানে কি আইনের শাসন কাজ করেছে, নাকি প্রভাবের শাসন?

ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্র লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সালিশ হতে পারে সামাজিক, কিন্তু মধ্যস্থতা হতে হবে আইনভিত্তিক। আপস হতে পারে স্বেচ্ছায়, কিন্তু সেটি হতে হবে নিরপেক্ষ পরিবেশে।

রাজনৈতিক নিয়োগের ঝুঁকি ও ‘Perception of Neutrality’

যদি স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগেও সরকারি আইন কর্মকর্তা (পিপি বা জিপি) নিয়োগের মতো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক এই মৌলিক পার্থক্যটি বিলীন হয়ে যাবে।

মধ্যস্থতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে ‘Perception of Neutrality’ বা নিরপেক্ষতার প্রতি জনধারণা। একজন মধ্যস্থতাকারী বাস্তবে নিরপেক্ষ হলেও যদি পক্ষগুলোর মনে তাঁর রাজনৈতিক দলীয় পরিচয় নিয়ে কিঞ্চিৎ সন্দেহও জন্মায়, তবে সেই মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ এখানে শুধু প্রকৃত নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিরপেক্ষ বলে প্রতীয়মান হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের বহুমাত্রিক ক্ষতি: ১. বিচারপ্রার্থীদের আস্থাভঙ্গ: বিচারপ্রার্থীরা মনে করবেন, আদালতে যাওয়ার মতোই এখানেও রাজনৈতিক প্রভাবের হিসাব করতে হবে। ফলে মামলা জট না কমে আরও বাড়বে। ২. মেধাবী আইনজীবীদের আগ্রহহানি: যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ করেছেন, তারা যদি দেখেন মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড়—তবে পেশাদার আইনজীবীরা বিমুখ হবেন। ৩. প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ধ্বংস: লিগ্যাল এইড অফিস তখন আইনের আশ্রয়কেন্দ্র না হয়ে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বা রাজনৈতিক দর কষাকষির কেন্দ্রে পরিণত হবে।

বিশ্বমানের মানদণ্ড ও বাংলাদেশের করণীয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর ও স্বচ্ছ মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশেও স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত আবেদন, স্বচ্ছ বাছাই, নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন এবং নিয়মিত পারফরম্যান্স রিভিউ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

রাষ্ট্রের সামনে এখন সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

  • প্যানেলভুক্তির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্তাবলী প্রকাশ্যে প্রকাশ করতে হবে।

  • নির্বাচন প্রক্রিয়া হতে হবে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক।

  • সফল মধ্যস্থতার হার, পক্ষগুলোর সন্তুষ্টি এবং নৈতিক আচরণের ভিত্তিতে প্যানেল পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

শেষ কথা: রাজনৈতিক কার্যালয় নয়, এটি আইনের আশ্রয়

বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক আইনি নীতি রয়েছে—“Justice must not only be done, it must also be seen to be done.” মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।

লিগ্যাল এইড অফিস আদালতের বিকল্প হতে পারে; কিন্তু কখনোই রাজনৈতিক সালিশের বিকল্প হতে পারে না। এটি কোনো দলীয় কার্যালয় নয়, কোনো জনপ্রতিনিধির মীমাংসা কেন্দ্র নয়, কিংবা কোনো থানার ওসির সালিশ দরবারও নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনগত সহায়তা প্রদানকারী একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান।

স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগে তাই একটিই নীতি হওয়া আবশ্যক—রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, পেশাগত যোগ্যতা। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার ভবনে নয়, তার নিরপেক্ষতার ওপর জনগণের বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।

লেখক: শামস নজীব অর্ক, সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার, প্রথম আলো।