আনিছুর রহমান মোল্লা
আনিছুর রহমান মোল্লা

আগাম জামিনে দায়রা জজ আদালতের এখতিয়ার: ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার পুনর্মূল্যায়ন

আনিছুর রহমান মোল্লা : ফৌজদারী কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure, 1898)-এর ৪৯৮(১) ধারায় আইন প্রণেতা সুস্পষ্ট ভাষায় High Court Division এবং Court of Session—উভয় আদালতকেই জামিন প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। আইনটির শব্দচয়ন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এ ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে আইন প্রণেতা কোনো আদালতকে অপর আদালতের অধীনস্থ বা গৌণ হিসেবে বিবেচনা করেননি। এমনকি আগাম জামিনের আবেদন কেবলমাত্র হাইকোর্ট বিভাগেই দাখিল করতে হবে—সংবিধিবদ্ধ আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও সংযোজন করা হয়নি।

উচ্চ আদালতের নজির ও বিচারিক অনুশীলন

মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ State vs. Abdul Wahab Shah Chowdhury [51 DLR (AD)] মামলায় আগাম জামিনকে একটি অসাধারণ (Extraordinary) প্রতিকার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আদালত সেখানে পর্যবেক্ষণ করেন যে, এ ক্ষমতা অত্যন্ত সংযম, সতর্কতা এবং ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা উচিত।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিচারিক অনুশীলনে (Judicial Practice) আগাম জামিনের আবেদন সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। তবে উক্ত রায়ে কোথাও Court of Session-এর সংবিধিবদ্ধ আইনগত এখতিয়ার বিলুপ্ত, স্থগিত বা অকার্যকর ঘোষণা করা হয়নি।

পরবর্তীকালে Atiquallah Khan Masud vs. The State [15 BLD (AD) 14] এবং State vs. Professor Dr. Morshed Hasan Khan and others মামলাসহ অন্যান্য সিদ্ধান্তে আপিল বিভাগ আগাম জামিন বিষয়ে একই বিচারিক নীতিমালা পুনর্ব্যক্ত করেন। এসব রায়ের মূল প্রতিপাদ্য ছিল:

  • আগাম জামিন প্রদানের মৌলিক নীতিমালা ও শর্তাবলী নির্ধারণ,

  • বিচারিক সংযম (Judicial Restraint) বজায় রাখা, এবং

  • ৪৯৮ ধারায় Court of Session-কে প্রদত্ত সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতাকে কোনোভাবে অস্বীকার না করা।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি দ্বন্দ্বে উদ্ভূত প্রশ্ন

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১১ অনুযায়ী আপিল বিভাগের ঘোষিত আইন অধস্তন আদালতের জন্য সমভাবে বাধ্যতামূলক। তবে একই সঙ্গে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি যে—যেখানে কোনো সংবিধিবদ্ধ আইন স্পষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে বা আদালতকে ক্ষমতা অর্পণ করেছে, সেখানে সেই ক্ষমতাকে অপ্রয়োগযোগ্য ঘোষণা করার জন্য সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি বা সুনির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক বিচারিক ঘোষণা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে আসে:

যখন ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা নিজেই Court of Session-কে জামিন প্রদানের সমান্তরাল ক্ষমতা দিয়েছে, তখন কেবল দীর্ঘদিনের ‘বিচারিক অনুশীলনের’ অজুহাতে দায়রা জজ আদালত আগাম জামিনের আবেদন ফেরত দেবেন বা গ্রহণ করবেন না—এমন অবস্থান কি আইনের নিজস্ব ভাষা ও আইন প্রণেতার অভিপ্রায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এখতিয়ার বনাম বিচারিক প্রয়োগ: একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য

এ প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান প্রদান করা একমাত্র মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এখতিয়ার। তবে বিদ্যমান আইনি কাঠামো, ৪৯৮ ধারার মূল গঠন এবং উচ্চ আদালতের ঘোষিত নজিরসমূহ বিশ্লেষণ করলে বলা যায়—Court of Session-এর আইনগত এখতিয়ার (Legal Jurisdiction) এবং সেই এখতিয়ারের বাস্তব প্রয়োগ (Exercise of Jurisdiction)—এই দুটি বিষয় কখনোই অভিন্ন নয়।

  • এখতিয়ার নির্ধারিত হয় সংবিধিবদ্ধ আইন দ্বারা।

  • প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হয় সুনির্দিষ্ট বিচারিক নীতিমালা ও সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশনা দ্বারা।

সময়োপযোগী সংস্কারের দাবি ও উপসংহার

জেলা বিচার বিভাগে আগাম জামিনের সুযোগ সৃষ্টি বা এর স্পষ্টীকরণ কেবল একটি আইনি বিতর্ক নয়, বরং এটি সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মৌলিক অধিকারের বিষয়।

দায়রা জজ আদালতে আগাম জামিনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে যেসব সুফল পাওয়া যাবে: ১. সহজ বিচারপ্রাপ্তি: সাধারণ বিচারপ্রার্থীর জেলা পর্যায়েই তাৎক্ষণিক আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

২. সময় ও অর্থ সাশ্রয়: ঢাকার হাইকোর্টে আসার বিশাল আর্থিক চাপ ও শারীরিক ভোগান্তি থেকে প্রান্তিক মানুষ রক্ষা পাবেন।

৩. হাইকোর্টের মামলা জট হ্রাস: মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ওপর থেকে অযাচিত ও অতিরিক্ত মামলার চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।

অতএব, ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় Court of Session-এর ক্ষমতার পরিধি ও প্রয়োগ বিষয়ে মহামান্য আপিল বিভাগ থেকে একটি সুস্পষ্ট, অভিন্ন এবং সময়োপযোগী বিচারিক ব্যাখ্যা প্রদান এখন ন্যায়বিচারের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: আনিছুর রহমান মোল্লা; আইনজীবী, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত।