১.
ফজরের আজানটা তখনও শেষ হয়নি। কুয়াশায় ঢাকা নিস্তব্ধ গ্রাম। বাতাসে ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ঠিক তখনই কলিগ্রামের মণ্ডলাদের মেঠো উঠান চিরে ভেসে এলো এক বীভৎস চিৎকার।
উঠানের এক কোণে গোয়ালঘরের পাশে রাখা ছিল বিশালাকার গরুর পানি খাওয়ার পাত্র। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে ‘চাড়ি’। হাঁটুসমান ঘোলা পানিভরা সেই চাড়ির ভেতর উপুড় হয়ে পড়ে আছে সতেরো দিন বয়সী এক কন্যাশিশু। আমার ছোট্ট মনি।
তার পাশে মাটিতে স্থির হয়ে বসেছিলাম আমি—মিতু। শরীরজুড়ে কোনো কাঁপুনি ছিল না, চোখে ছিল না কোনো অশ্রু। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম ঘোলা পানিটার দিকে। আমি পালাচ্ছিলাম না, মনিকে লুকানোর চেষ্টা করছিলাম না, কাউকে কিছু বোঝানোরও চেষ্টা করছিলাম না।
প্রতিবেশীদের চেঁচামেচি আর গালিগালাজের মধ্যে হঠাৎ মস্তিষ্কে যেন বিদ্যুৎ চমকালো। মনিকে ওই চাড়ির ভেতর আমিই তো রেখে এসেছি!
কিন্তু কেন?
কীভাবে একজন মা তার সদ্যোজাত সন্তানকে নিজের হাতে পানিতে ডুবিয়ে দিতে পারে? আজও সেই প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে।
চোখের সামনে ভেসে উঠল স্বামী রায়হানের রাগে লাল হয়ে ওঠা মুখ। ততক্ষণে সে থানায় খবর দিয়ে দিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি এসে উঠানে থামল। পুলিশ শিশুটির দেহ ঘিরে জায়গাটি নিরাপদ করল। আমাকে যখন ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ কেউ মারতে তেড়ে আসছিল।
শাশুড়ি চিৎকার করে বলছিলেন, “মেয়েটা বিয়ের পর থেকেই কেমন পাগলামি করত! তখনই তো বুঝেছিলাম, মেয়েটার মাথায় গোলমাল আছে। জিন-ভূতে ধরেছে ভেবে কত কবিরাজ দেখালাম। কিন্তু এ যে রাক্ষসী, তা তো বুঝিনি!”
কারও কথায় আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। পুলিশ ভ্যানের লোহার গ্রিল ধরে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম নিজের ছেড়ে আসা গ্রামটার দিকে। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো পরিচিত পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি; যে পৃথিবীর মানুষগুলো আমাকে চিনত, অথচ আমি নিজেকেই তখন আর চিনতে পারছিলাম না।
২.
সিংড়া থানার ধূসর, দমবন্ধ ঘর। পুরোনো নথিপত্রের নোনাধরা গন্ধ।
আমাকে নীচতলার হাজতখানায় রাখা হলো। প্রকাণ্ড গ্রিল দেওয়া একটি কক্ষে বিভিন্ন মামলার কয়েকজন পুরুষ আসামি বসে ছিল। কারো চোখে ক্লান্তি, কারো চোখে হিংস্রতা। পাশেই ছোট্ট মহিলা হাজতখানা, যেখানে আমি একা।
কিছুক্ষণ পর গ্রিলের দরজা খুলে দুজন মধ্যবয়স্ক নারী আসামিকে সেখানে আনা হলো। মাদকসহ তারা গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা কৌতূহলী হয়ে আমার কাছে এগিয়ে এল, চোখেমুখে এক ধরনের রসিকতার ঝিলিক।
“কী রে বোন, কী মামলা তোর?”
আমি নিচু গলায় বললাম, “আমার সতেরো দিনের মেয়েকে হত্যার মামলা।”
কথাটা শুনেই তাদের মুখের হাসিটা যেন এক নিমেষে জমে গেল। তারা হঠাৎ কয়েক পা পিছিয়ে গেল, যেন আমার গায়ে ছোঁয়া লাগলেই কিছু একটা ছড়িয়ে পড়বে তাদের গায়ে। একজন চাপা স্বরে বলল, “মা হয়ে কচি ছাওয়াল মেরে ফেললি? নিশ্চয়ই পরকীয়া কেস!”
তারা দূরে সরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগল, মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে। কেউ একজন নিচু গলায় অভিশাপ দিল। শব্দটা স্পষ্ট শুনতে না পেলেও ওজনটা ঠিকই টের পেলাম। আমি আবার একা হয়ে গেলাম, গ্রিলের ওপাশের অন্ধকারে চোখ রেখে।
সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝি—মানুষ কখনো কখনো অপরাধের সত্য জানার আগেই অপরাধীর পরিচয় তৈরি করে ফেলে।
বাইরে দিনের আলো ততক্ষণে তীব্র হয়ে উঠেছে। আমাকে একটা ছোট কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
এসআই সাহানা আক্তার টেবিলের ওপর একটি ভারী খাতা রেখে আমার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন, “মিতু, সোজা সত্য কথা বলবে। জলঘোলা করলে পরিণতি ভালো হবে না।”
আমার হাতের আঙুলগুলো টেবিলের কিনারা খামচে ধরল। আমি স্থির কণ্ঠে বললাম, “আমিই মনিকে চাড়ির পানিতে চুবিয়ে রেখে এসেছিলাম, ম্যাডাম।”
সাহানা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন—যেন কথাটার পেছনে আরও কিছু খুঁজছিলেন। আমার বক্তব্য ভিডিওতে ধারণ করা হলো এবং লিখিতভাবেও নথিবদ্ধ করা হলো।
ঘরের বাইরে তখন রায়হানও থানায় এসে ওসিকে চিৎকার করে বলছিল, “স্যার, ওকে এমনভাবে চার্জশিট দেন যেন ওর ফাঁসি হয়! ও ঠান্ডা মাথার খুনি!”
তার চিৎকার দেয়াল ভেদ করে ঘরের ভেতর পর্যন্ত এসে পৌঁছাল। আমি কথাগুলো শুনছিলাম, কিন্তু আমার ভেতরে তখন আর কোনো অনুভূতি পৌঁছাচ্ছিল না।
৩.
সেদিন ছিল শুক্রবার। ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও বেলা আনুমানিক তিনটার দিকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো নাটোরের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের খাসকামরায়।
সেখানে ঘরের ভেতর পাখা ঘুরছিল ধীরগতিতে, তবু ঘামছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেট টেবিলের ওপারে বসে কিছুক্ষণ কাগজপত্র উল্টালেন, তারপর চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, কোনো ঘৃণাও না। শুধু একধরনের অস্বস্তিকর মনোযোগ, যেন কিছু একটা মেলাতে পারছেন না।
তিনি জানতে চাইলেন সেদিন কী ঘটেছিল।
আমি উত্তর দিতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলাম। কথাগুলো ছিল অসংলগ্ন, ছেঁড়া ছেঁড়া। একবার বললাম, “আমি মনিকে বাঁচিয়েছি।” পরক্ষণেই বললাম, “আমি ওকে মেরে ফেলেছি।” আরেকবার বললাম, “আমি গায়েবি আওয়াজ শুনে ওকে চাড়িতে ফেলে দিয়েছি।”
আমার চোখের দৃষ্টি সামনের মানুষটির ওপর স্থির হচ্ছিল না। ম্যাজিস্ট্রেট আমার কথাগুলোকে নিছক স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখলেন না; আমার মানসিক অবস্থার স্বাভাবিকতা সম্পর্কে তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হলো। তিনি কলমটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন, ধীরে।
তিনি এসআই সাহানা আক্তারকে ডেকে বললেন, “এই আসামির কথাবার্তা ও আচরণ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তার মানসিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য অবিলম্বে মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা-পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।”
সাহানা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন, “কিন্তু স্যার, আমার কাছে সে সব দোষ স্বীকার করেছে। সেই বক্তব্যের ভিডিও-রেকর্ডও আছে। আপনি দেখতে চাইলে দেখাতে পারি।” তাঁর কণ্ঠে এক ধরনের অবিশ্বাস, যেন এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে এসব ক্ষেত্রে জটিলতার দরকার নেই।
ম্যাজিস্ট্রেট শান্তভাবে বললেন, “স্বীকারোক্তির আগে জানতে হবে, যে সময়ে সে কাজটি করেছে, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল।”
কথাটা ঘরের বাতাসে যেন একটু বেশিক্ষণ ঝুলে রইল। সাহানা আর কিছু বললেন না।
এরপর তিনি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে আমার মানসিক অবস্থা পরীক্ষা ও মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিলেন।
৪.
আমার মানসিক অবস্থার পেছনের গল্পটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে আমার আগের জীবনে।
আমার নাম মিতু। বয়স ২৬ বছর। বাবা রাজশাহী শহরের একটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। এসএসসি ও এইচএসসি—দুটিতেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ-প্লাস পেয়েছিলাম।
স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার, কিন্তু মেডিকেলে সুযোগ হলো না। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলাম রাজশাহী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে। পড়াশোনায় আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। কোনো রকমে অনার্স শেষ করলাম।
এরপর বাবা-মা নাটোর জেলার সিংড়ার রায়হানের সঙ্গে আমার বিয়ে দিলেন। রায়হান ব্যবসা করত। বিয়ের প্রথম দিকে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ছোটখাটো বিষয়েও রায়হান আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করল।
আমার পাকা চুল নিয়ে খোঁটা দিত, রান্নায় লবণ কম হলে সবার সামনে অপমান করত। শাশুড়িও প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো খুঁত ধরে বলতেন, “শহরের মেয়ে বলে এত অহংকার!”
শহরের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে গ্রামে এসে নতুন সংসার, নিঃসঙ্গতা, অপমান আর নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন—সব মিলিয়ে আমি ধীরে ধীরে গভীর বিষণ্ণতা ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলাম।
ঠিক সেই সময় আমি গর্ভবতী হলাম। গর্ভধারণের পঞ্চম মাস থেকে আমার ভেতরে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন শুরু হলো। শুরুতে ঘুম কমে গেল। রাতের পর রাত চোখ বুজেও ঘুম আসত না। তারপর এল অকারণ ভয়। মনে হতো ঘরের সিলিংটা যেন প্রতিরাতে একটু একটু করে নিচে নেমে আসছে।
তারপর শুরু হলো সন্দেহ। রায়হান আর শাশুড়ি ফিসফিস করে কথা বললেই মনে হতো, তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
একদিন গোসলের পর আয়নায় নিজের মুখ দেখে চমকে উঠলাম। মনে হলো প্রতিবিম্বটা যেন এক মুহূর্তের জন্য অন্য একটা অচেনা, বিকৃত মুখ হয়ে গেছে। আমি চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। রায়হান শুধু বলল, “নাটক শুরু হলো আবার!”
তারপর এক রাতে প্রথমবার শুনলাম সেই গায়েবি কণ্ঠস্বর। কানের একেবারে কাছে কারও ফিসফিসানি। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী বলছে, শুধু শরীর শিউরে উঠেছিল। ধীরে ধীরে বাস্তবতা আর বিভ্রমের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
শাশুড়ি সবকিছু দেখে ঘোষণা দিলেন, “ওকে কোনো জিনে বা ভূতে ধরেছে।” আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কবিরাজের কাছে। তাবিজ দেওয়া হলো, ঝাড়ফুঁক হলো, গরম তেল মাথায় ঢেলে দেওয়া হলো। কবিরাজ বলল, “জিন তাড়ানো হয়েছে, এবার ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না। রায়হান একদিন রেগে বলল, “তুই ইচ্ছে করেই এসব নাটক করছিস!” কথাটা মাথায় গেঁথে গেল; নিজের অনুভূতিকেও সন্দেহ করতে শুরু করলাম।
তারপর পৃথিবীতে এলো আমার মনি। সন্তান জন্মের পর মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। প্রসব-পরবর্তী শারীরিক ও হরমোনগত পরিবর্তন, তীব্র নিদ্রাহীনতা এবং আগের অবনতিশীল মানসিক অবস্থার মধ্যে আমি ধীরে ধীরে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলাম।
ওর জন্মের পর টানা কয়েক রাত ঘুমাতেই পারিনি। দিন-রাতের পার্থক্য মুছে গিয়েছিল। কখনো মনে হতো মনি আমার সন্তান নয়; কখনো মনে হতো ওর ভেতরে অন্য কেউ আছে। এক রাতে রায়হানকে বলেছিলাম, “ওকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাও।” কিছুক্ষণ পর আবার মনিকে বুকে চেপে ধরে বলেছিলাম, “কেউ ওকে নিতে পারবে না।” কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি, এটি স্বাভাবিক আচরণের ওঠানামা নয়, বরং গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের লক্ষণ।
ঘটনার আগের রাতে একেবারেই ঘুমাইনি। মাথার ভেতর একাধিক কণ্ঠস্বর যেন আমাকে নির্দেশ দিচ্ছিল। কণ্ঠস্বরগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল— “ওকে সরিয়ে দাও।” “ও বিপজ্জনক।” “ওকে পানিতে রেখে দাও।”
আমি যেন নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। সতেরো দিনের অবুঝ মনিকে কোলে তুলে বাইরে এলাম। গোয়ালঘরের পাশে দাঁড়ানো চাড়ির ঘোলা পানির দিকে তাকালাম। তারপর মনিকে পানিতে রেখে দিলাম। পানি কিছুক্ষণ কেঁপে উঠে আবার স্থির হয়ে গেল। বিভ্রমের জগতে তখন মনে হচ্ছিল, আমি পৃথিবীকে একটি মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেছি।
তারপর কী হয়েছিল, ভাবলে আজও শিউরে উঠি। আমি পালাইনি, চাড়ির পাশেই বসে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটছিল, আর বিভ্রমের পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল।
৫.
ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড আমার মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করল। বোর্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, আমি প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকার (Postpartum Psychosis)-এ আক্রান্ত ছিলাম।
এটি সাধারণ প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা নয়; বরং বিরল হলেও অত্যন্ত গুরুতর একটি মানসিক জরুরি অবস্থা। এতে হ্যালুসিনেশন (hallucination – বাস্তবে নেই এমন কিছু দেখা বা শোনা), ভ্রান্ত বিশ্বাস (delusion – বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দৃঢ় বিশ্বাস), তীব্র মানসিক অস্থিরতা (severe mood disturbance) এবং বাস্তবতা-বোধের মারাত্মক বিকৃতি (distortion of reality) দেখা দেয়। মাতৃত্ব কখনো শুধু জন্ম নয়, কখনো তা হয়ে ওঠে অচেনা অন্ধকারের দ্বারপ্রান্ত। আমার ক্ষেত্রে মাতৃত্বের সেই অন্ধকারই বিভ্রমে রূপ নিয়েছিল, যেখানে আমি নিজের সন্তানকে শত্রু ভেবে পৃথিবীকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম।
আমাকে আদালত থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হলো। রিপোর্টের ভিত্তিতে বলা হলো, যতদিন না আত্মপক্ষ সমর্থন করার উপযোগী হবো, ততদিন বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
ওষুধ, পর্যবেক্ষণ, ঘুমের পুনঃস্থাপন এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে লাগল। প্রায় ছয় মাস পর চিকিৎসকরা জানালেন, আমি বিচার মোকাবিলার উপযোগী অবস্থায় ফিরেছি।
আমি আবার আদালতে ফিরলাম। এবার প্রশ্নটা ছিল ভিন্ন। আমি এখন চিকিৎসায় স্থিতিশীল কি না, সেটা এক বিষয়। কিন্তু অপরাধের সময় আমার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল—আইনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটাই।
৬.
বাবা আমার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ করলেন। পুলিশ ইতোমধ্যে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের চার্জশিট দাখিল করায় মামলাটি বিচারার্থে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে গেল।
দুই বছর ধরে বিচার চলল। রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলেন। প্রতিটি তারিখে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতাম চোখ নামিয়ে, অথচ কানে বাজত রায়হান আর শাশুড়ির প্রতিটি শব্দ।
রায়হান ও তার মা আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বললেন, আমি নাকি পরিকল্পিতভাবে তাদের একমাত্র সন্তানকে হত্যা করেছি। শাশুড়ি সাক্ষ্য দেওয়ার সময় একবারও আমার দিকে তাকাননি; শুধু বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলে গেলেন, যেন আমি এজলাসে নেই।
অন্যদিকে আমার বাবা, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং আমি আদালতের সামনে মানসিক অবস্থার ধারাবাহিকতা তুলে ধরলাম। চিকিৎসক ব্যাখ্যা করলেন রোগের লক্ষণগুলো কখন শুরু হয়েছিল, কীভাবে তা ক্রমশ মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল এবং ঘটনার সময় প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকারের প্রভাব কতখানি তীব্র ছিল। বিচারক মাঝেমধ্যে কলম থামিয়ে চিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে থাকতেন যেন প্রতিটি টার্মের ওজন মেপে নিচ্ছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে শুরু হলো যুক্তিতর্ক।
সেদিন এজলাসের প্রতিটি বেঞ্চ ভর্তি ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সারোয়ার হোসেন উঠে দাঁড়ালেন, কণ্ঠস্বর তুলে বললেন, “মাননীয় আদালত, আসামি নিজের সন্তানকে হত্যা করেছে। কাজটি তার হাতেই সংঘটিত হয়েছে। এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, তাই দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় তিনি সর্বোচ্চ শাস্তির যোগ্য।”
কথাগুলো এজলাসে যেন একটা ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে গেল। দ্বিতীয় সারিতে বসা রায়হান মাথা নাড়ালেন সায় দিয়ে। আমার বাবা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
আমার আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এতটাই চুপ যে এজলাসে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
তারপর শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে শুরু করলেন, “মাননীয় আদালত, শিশুটিকে পানিতে রাখার বিষয়টি আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু ফৌজদারি দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক কার্যটি আসামির দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এটুকু যথেষ্ট নয়; বরং পেনাল কোডের ৮৪ ধারার মূল কথা হলো, অপরাধ সংঘটনের মুহূর্তে আসামি যদি মানসিক অপ্রকৃতিস্থতার কারণে তার কাজের প্রকৃতি অথবা এটি যে ভুল কিংবা আইনের পরিপন্থী তা অনুধাবন করতে অক্ষম হয়, তবে সেই কাজ কোনো অপরাধ বলে গণ্য হবে না।”
বিচারক সামনে ঝুঁকে এলেন। কলম নামিয়ে রাখলেন।
এরপর তিনি ঐতিহাসিক আইনি নজিরগুলো তুলে ধরলেন। “মাননীয় আদালত! আজকের এই স্পর্শকাতর মামলার সঙ্গে দিল্লি হাইকোর্টের ঐতিহাসিক ‘শ্রীমতী শান্তি দেবী বনাম রাষ্ট্র, AIR 1968 DELHI 177’ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। ১৯৬৫ সালের ওই মামলায় শান্তি দেবী নামের এক মা তাঁর ১ বছরের শিশুর গলা কেটে হত্যা করেন। বিচারিক আদালত তাকে ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।”
এজলাসে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। পেছনের সারিতে বসা জুনিয়র আইনজীবীরা দ্রুত কিছু লিখে নিলেন।
“ঘটনার পর তাঁর মাঝে কোনো অনুতাপ বা পালানোর চেষ্টা ছিল না। দিল্লি হাইকোর্ট চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে পায় যে, অপরাধের সময় শান্তি দেবী গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। এর ফলে তিনি তার কাজের পরিণতি বুঝতে অক্ষম ছিলেন। আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৮৪ ধারার সুবিধা দিয়ে তাকে খালাস দেয়।”
আমি কাঠগড়ার শিক শক্ত করে ধরে রইলাম। বুকের ভেতর একটা কিছু আটকে ছিল। আশা, নাকি ভয়, নিজেও বুঝতে পারছিলাম না।
আমার উকিল সাহেব থামলেন না। এবার দ্বিতীয় নজিরটি উপস্থাপন করলেন, কণ্ঠস্বর আরও একধাপ উঁচু করে: “মাননীয় আদালত! বিশ্বসেরা ফৌজদারি আইনি নজিরের দিকে নজর দিলে আমরা টেক্সাসের ঐতিহাসিক ‘অ্যান্ড্রিয়া ইয়েটস (Yates, Andrea Pia v. The State of Texas, 2006)’ মামলাটি দেখতে পাই।
“উক্ত মামলায় পাঁচ সন্তানের মা অ্যান্ড্রিয়া ইয়েটস প্রসব-পরবর্তী তীব্র মানসিক বিকার (Postpartum Psychosis) এবং সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাথটাবের পানিতে ডুবিয়ে তাঁর সন্তানদের হত্যা করেন।”
তিনি আরও বললেন, “চিকিৎসকদের মেডিকেল রিপোর্টে দেখা যায়, চরম মানসিক বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশনের বশবর্তী হয়ে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, সন্তানদের রক্ষা করতেই তিনি এটি করছেন। ২০০৬ সালের পুনর্বিচারে আদালত তাঁর প্রসবোত্তর তীব্র মানসিক অপ্রকৃতিস্থতার প্রমাণ আমলে নিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ আইনি অব্যাহতি প্রদান করেন।”
এজলাসে তখন এমন নীরবতা যে দেয়ালের পাখাটার ঘুরঘুর শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
“মাননীয় বিচারক! শান্তি দেবী এবং অ্যান্ড্রিয়া ইয়েটস—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নজিরের আলোকে স্পষ্ট যে, ঘটনার সময় মিতু নিজের কাজের প্রকৃতি ও পরিণাম বুঝতে সম্পূর্ণ অক্ষম ছিলেন। প্রসবোত্তর তীব্র মানসিক বিভ্রমের কারণেই এমন ট্র্যাজেডি ঘটেছে। ফলস্বরূপ, দণ্ডবিধির ৮৪ ধারার সুবিধা পেয়ে তিনি খালাস পাওয়ার অধিকারী।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সারোয়ার হোসেন তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর গলার স্বর কেঁপে উঠল রাগে। “মাননীয় আদালত, বিজ্ঞ আসামিপক্ষের উপস্থাপিত নজিরগুলো এই মামলায় কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। এসব বিদেশি ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা আমাদের আইনি বাস্তবতায় অগ্রহণযোগ্য। আসামির এই নৃশংস অপরাধের জন্য আমি তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।”
রায়হান পেছনের সারিতে অস্ফুটে কিছু একটা বললেন, শাশুড়ি মাথা নাড়লেন সমর্থনে।
আমার আইনজীবী এবার আর তর্কে জড়ালেন না। তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর কণ্ঠটা হঠাৎ গভীর ও নিচু হয়ে এল। এত নিচু যে এজলাসের সবাইকে সামনে ঝুঁকে শুনতে হলো, “মাননীয় আদালত, এই মামলার সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, মিতু তার সন্তানকে হত্যা করেছে, কিন্তু সম্ভবত যে মুহূর্তে কাজটি করেছে, তখন সে আর সেই মিতু ছিল না।”
কথাগুলো এজলাসে থেমে রইল অনেকক্ষণ। বিচারক কিছু লিখলেন, তারপর চশমা খুলে চোখ কচলালেন। আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শুধু বুঝতে পারলাম, আমার নিজের শ্বাসটাই আটকে আছে।
৭.
অবশেষে এলো রায়ের দিন।
কাঠগড়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছি আমি। হাতের তালু ঘামছিল, অথচ শরীরটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা।
সামনের বেঞ্চে রায়হান ও তার মায়ের চোখে বিষাক্ত আক্রোশ। শাশুড়ি একবারও চোখ সরাননি আমার দিক থেকে, যেন তাকিয়ে থেকেই আমাকে পুড়িয়ে দিতে চাইছেন।
অন্যদিকে, আমার বৃদ্ধ বাবার চোখে ব্যাকুল প্রার্থনা; তাঁর ঠোঁট নড়ছিল নিঃশব্দে, কিছু একটা আউড়ে যাচ্ছিলেন। বাইরে সাংবাদিকদের বেশ কয়েকটি ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে। সবাই যেন অপেক্ষা করছে—এই বুঝি আমার ফাঁসির রায় ঘোষণা হবে।
এজলাস ভর্তি ছিল, কিন্তু কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু সিলিং ফ্যানের ঘুরঘুর শব্দ আর কারো একজনের পায়ের অস্থির নড়াচড়া কাঠের মেঝেতে মৃদু শব্দ তুলছিল।
এজলাসে আসন গ্রহণ করে জেলা ও দায়রা জজ রায়ের সারসংক্ষেপ পড়তে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল সমান, নির্লিপ্ত। অথচ প্রতিটি শব্দ যেন হাতুড়ির মতো পড়ছিল আমার বুকে।
“আদালতের সামনে প্রমাণিত হয়েছে যে, আসামির কার্যকলাপের ফলে তার শিশুসন্তানের মৃত্যু হয়েছে।”
রায়হান সামনে ঝুঁকে এলেন, যেন এখনই লাফিয়ে উঠবেন। শাশুড়ি ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন তাঁর কানে কানে।
“কিন্তু কেবল কার্যটি সংঘটিত হয়েছে—এটুকু প্রমাণ করলেই দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অধীনে অপরাধমূলক দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। দণ্ডবিধির ৮৪ ধারার ক্ষেত্রে আদালতের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে অপরাধ সংঘটনের সময় আসামির মানসিক অবস্থার ওপর।”
আমার বাবা হঠাৎ মাথা তুলে তাকালেন। বিচারকের দিকে না, আমার দিকে।
“এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ডাক্তারি ভাষায় মানসিক রোগী হওয়া (Medical Insanity), আর আইনি চোখে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে ছাড় পাওয়া (Legal Insanity)—দুটো এক কথা নয়। মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টে স্পষ্ট যে মিতু প্রসবোত্তর মানসিক রোগে ভুগছিলেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে অসুস্থতা। কিন্তু কেবল অসুস্থতার রিপোর্ট থাকলেই আইন কাউকে অপরাধ থেকে মুক্তি দেয় না। আইন দেখে অন্য এক জায়গায়। ঘটনাটি ঘটানোর ঠিক সেই মুহূর্তে মানসিক অসুস্থতার কারণে মিতু কি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি কী করছেন, কিংবা কাজটি যে চরম ভুল ও অপরাধ তা বোঝার ক্ষমতা তার ছিল কি না।”
এজলাসে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে থেকে কেউ একজন চেয়ার নড়াচড়া করলেন। শব্দটা যেন বিস্ফোরণের মতো শোনাল সেই নীরবতায়।
“আদালত চিকিৎসা-প্রতিবেদন, ঘটনার পূর্বাপর আচরণ, আসামির বিভ্রমের ইতিহাস এবং সাক্ষীদের বক্তব্য সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করেছে। প্রমাণিত হয়েছে যে, অপরাধ সংঘটনের সময় আসামি মারাত্মক প্রসব-পরবর্তী মানসিক বিকারের মধ্যে ছিলেন এবং তাঁর বাস্তবতা-বোধ সম্পূর্ণরূপে বিকৃত হয়েছিল। সেই মুহূর্তে তিনি তাঁর কাজের প্রকৃতি অথবা কাজটি যে ভুল বা আইনের পরিপন্থী তা অনুধাবন করার সক্ষমতা হারিয়েছিলেন।”
বিচারক এক মুহূর্ত থামলেন। কাগজ উল্টালেন। এই ছোট্ট বিরতিটুকু যেন এক যুগের মতো দীর্ঘ মনে হলো। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
“অতএব, দণ্ডবিধির ৮৪ ধারায় বর্ণিত সুবিধা তিনি পাওয়ার উপযুক্ত। আসামি মোছাঃ মিতু খাতুনকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অভিযোগ থেকে খালাস প্রদান করা হলো।”
এক মুহূর্তের জন্য এজলাসে কোনো শব্দ হলো না। তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া ফেটে পড়ল—শাশুড়ির তীক্ষ্ণ চিৎকার, রায়হানের চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ানোর শব্দ, পেছনের সারিতে সাংবাদিকদের ফিসফিসানি, ক্যামেরার শাটারের খটাখট শব্দ। কেউ একজন এজলাসের দরজার দিকে ছুটে গেল।
বিচারক থামলেন।
কাঠগড়ার লোহার শিক ধরে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। শুধু নিজের বুকের ধুকপুকানি ছাড়া চারপাশের এত শব্দের মধ্যেও আমার কানে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছিল না।
কেউ আমাকে অভিনন্দন জানাল না। আমার বাবা কাঁদছিলেন। তাঁর কান্নার শব্দটুকুই এজলাসের হট্টগোলের মধ্যে একমাত্র শব্দ যা আমি সত্যিকারের অনুভব করলাম।
আমি শুধু ভাবছিলাম, আইন আমাকে মুক্তি দিল, কিন্তু আমার মনি কোথায়?
বিভ্রমের কাঠগড়ায় সেদিন একা আমি দাঁড়াইনি। আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল সমাজের অজ্ঞতা, প্রজন্ম-লালিত কুসংস্কার এবং মানসিক রোগকে ‘পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার পুরোনো অভ্যাস।
কিন্তু একটি অবুঝ শিশুর মৃত্যুর নৈতিক দায় থেকে কি মুক্তি পেয়েছে এই সমাজ?
কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে, আমরা কি একবারও তাকাই তার মস্তিষ্কের নিঃশব্দ যুদ্ধের দিকে?
লেখক: সাইফুল ইসলাম পলাশ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ।

