চ্যাটজিপিটির তৈরি সম্পূর্ণ কাল্পনিক পুলিশি জবানবন্দি ও মনগড়া সাক্ষীদের বক্তব্য আদালতে দাখিলের ঘটনায় কঠোর শাস্তির মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক আইনজীবী। আদালতের নিয়ম লঙ্ঘন এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে চরম ব্যর্থতার দায়ে স্টিফেন অ্যারন্স নামের ওই আইনজীবীকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করেছে নিউ মেক্সিকো সুপ্রিম কোর্ট।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) নিউ মেক্সিকো সুপ্রিম কোর্টের একটি প্যানেল এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
আদালতের নথি অনুযায়ী, একটি হত্যা মামলায় নিজের মক্কেলের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার সময় আইনজীবী স্টিফেন অ্যারন্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ও সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেন।
নথিতে ছিল মনগড়া সাক্ষীদের বক্তব্য
আদালত জানিয়েছে, অ্যারন্সের দাখিল করা আবেদনে ‘সম্পূর্ণরূপে মনগড়া সাক্ষীদের ভুয়া সাক্ষ্য’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি নথিতে হত্যাকারী ‘কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরে ছিল’—এমন কাল্পনিক বিবরণও যুক্ত করা হয়েছিল বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
শুধু নথি তৈরির ক্ষেত্রেই নয়, শুনানির সময়ও অ্যারন্স ‘নিজের মক্কেলের প্রতি উদাসীনতা ও ঘটনার জন্য কোনো অনুশোচনা না থাকার মনোভাব’ দেখিয়েছেন বলে আদালত মন্তব্য করেছে।
এসব কারণে আদালত তাকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি আরও তদন্ত ও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শৃঙ্খলা বোর্ডের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘চ্যাটজিপিটি নির্ভুল সারসংক্ষেপ তৈরি করবে ভেবেছিলাম’
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন স্টিফেন অ্যারন্স। তিনি জানান, গত বছর মক্কেলের আপিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারিক কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্তসার তৈরির জন্য তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিলেন।
তখন এআই কীভাবে তথ্য বা ঘটনা ‘হ্যালুসিনেট’ করতে পারে কিংবা সম্পূর্ণ মনগড়া তথ্য তৈরি করে উপস্থাপন করতে পারে—এ বিষয়ে তার বাস্তব ধারণা ছিল না বলেও জানান তিনি।
অ্যারন্স বলেন, “আমি অনুতপ্ত, তবে আশা করি শৃঙ্খলা বোর্ড বিষয়টি বিবেচনা করবে যে এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল। এ শক্তিশালী অথচ কখনও কখনও অস্থির প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল সব পেশাজীবীদের জন্য এটা বড় শিক্ষা।”
তবে এ ঘটনার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ওপেনএআই।
হত্যা মামলার আপিলে এআইয়ের ব্যবহার
সান্তা ফে-ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনজীবী স্টিফেন অ্যারন্স অস্কার রেনে স্যান্ডোভাল নামের এক ব্যক্তির হত্যা মামলার আপিল পরিচালনা করছিলেন।
স্যান্ডোভাল গত বছর তার সন্তানদের মাকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন।
মামলাটির আপিল কার্যক্রম বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি নিউ মেক্সিকোর পাবলিক ডিফেন্ডার কিম শ্যাভেজ কুকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে কিম শ্যাভেজ কুক ও ডোনা আনা কাউন্টির জেলা কৌঁসুলির কার্যালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
কম্পিউটার-জেনারেটেড ট্রান্সক্রিপ্ট দিয়েছিলেন চ্যাটজিপিটিতে
গত মাসে নিউ মেক্সিকোর সুপ্রিম কোর্ট অ্যারন্সের কাছে জানতে চেয়েছিল, কীভাবে তার দাখিল করা নথিতে ওই ভুয়া তথ্যগুলো যুক্ত হলো।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত শুনানিতে অ্যারন্স আদালতকে জানান, তিনি আদালতের একটি কম্পিউটার-জেনারেটেড ট্রান্সক্রিপ্ট এবং মামলার অন্যান্য নথিপত্র চ্যাটজিপিটিতে ইনপুট করেছিলেন।
তার ধারণা ছিল, চ্যাটজিপিটি এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাকে একটি ‘নির্ভুল সারসংক্ষেপ’ তৈরি করে দেবে।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় এআইয়ের তৈরি সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্যও তিনি যথাযথভাবে যাচাই না করে আদালতে দাখিল করেন।
আইনজীবীর এআইয়ের ভুল তথ্য তৈরির সক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞতা দেখে শুনানির সময় বিচারকরা বিস্ময় প্রকাশ করেন।
বিচারপতি সি. শ্যানন বেকন অ্যারন্সকে বলেন, “কাউন্সেল, আপনি কি খবরের কাগজ পড়েন না? আপনি কি রেডিও শোনেন না? বিশ্বে কী ঘটছে সে বিষয়ে কি আপনার কোনো ধারণা নেই?”
তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদের এআইয়ের ‘হ্যালুসিনেশন’-এর ওপর নির্ভর করার সমস্যা এখন প্রতিদিনই খবরের কাগজের প্রধান পাতায় উঠে আসছে।
এআই ব্যবহারে আইনজীবীদের জন্য সতর্কবার্তা
আইন পেশায় এআইয়ের যত্রতত্র ও অপরিপক্ব ব্যবহার রোধে নিউ মেক্সিকো সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলমান সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল আদালতের বিচারকরা পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া এআই টুল দিয়ে তৈরি নথি আদালতে দাখিল করায় বেশ কয়েকজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।
চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহারের কারণে ভুয়া কেস সাইটেশন, অস্তিত্বহীন মামলা বা আইন সম্পর্কে বিকৃত তথ্য আদালতে উপস্থাপনের ঘটনাও এর আগে একাধিক আইনজীবীকে শাস্তির মুখে ফেলেছে।
তবে নিউ মেক্সিকোর আইনজীবী স্টিফেন অ্যারন্সের ঘটনাটি তুলনামূলকভাবে আরও গুরুতর। কারণ, তার দাখিল করা নথিতে শুধু ভুল আইনি তথ্য বা ভুয়া কেস সাইটেশন নয়, বরং একটি ফৌজদারি আপিল মামলার জন্য মনগড়া সাক্ষীর বক্তব্য ও কাল্পনিক ঘটনার বিবরণও যুক্ত হয়েছিল।
এ ঘটনা আদালতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের তথ্য যাচাই, পেশাগত দায়িত্ব ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।

