সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-তে ২০২৬ সালে নতুন বিধান যুক্ত হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। নতুন আইনে এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে কোনো ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দান করার পরও নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের দান নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে করতে হবে। দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে, তবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
এই বিধানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ইসলামি উত্তরাধিকারব্যবস্থা বা মিরাসের সঙ্গে সম্ভাব্য অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন আইনটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে আইনটির পক্ষে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি হেবা বা প্রচলিত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিকে বাতিল বা সীমিত করছে না; বরং একটি অতিরিক্ত আইনি বিকল্প তৈরি করছে।
এখানে আবেগের বদলে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে আনা দরকার: জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার—এই দুই বিষয়কে আইন কীভাবে সমন্বয় করবে?
মিরাস কখন কার্যকর হয়?
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রশ্ন আসে। কিন্তু জীবিত ব্যক্তি যদি বৈধভাবে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করে দেন, তাহলে মৃত্যুর সময় সেই সম্পত্তি তাঁর মালিকানায় না-ও থাকতে পারে।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন মুসলিম ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর একটি বাড়ি তাঁর এক মেয়েকে নতুন আইনের অধীনে দান করলেন। দলিলে তিনি নিজের জীবনকাল পর্যন্ত বাড়িটি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করলেন। পরে তিনি মারা গেলেন।
তাঁর অন্য সন্তানরা যদি দাবি করেন যে বাড়িটি তাঁদের মিরাসের অংশ, তখন আদালতের প্রথম প্রশ্ন হবে—মৃত্যুর সময় বাড়িটির মালিক কে ছিলেন?
যদি আদালত মনে করে যে দানটি আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল এবং মালিকানা জীবদ্দশাতেই গ্রহীতার কাছে চলে গিয়েছিল, তাহলে শুধু উত্তরাধিকারী হওয়ার কারণে অন্য সন্তানদের ওই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দাবি কতটা কার্যকর হবে, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কারণ উত্তরাধিকার সাধারণত মৃত ব্যক্তির মৃত্যুকালীন সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়।
এই জায়গাতেই নতুন আইনের সঙ্গে মিরাসের বিতর্কের প্রকৃত যোগসূত্র।
আইনটি কি মিরাসের আইন বাতিল করেছে?
না, বরং সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের নতুন ১২২এ ধারায় বলা হয়েছে, জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে করা দান একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর-পদ্ধতি হবে। একই ধারার উপধারা (৪)-এ স্পষ্ট করা হয়েছে যে এই ব্যবস্থা প্রচলিত দান, হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত হস্তান্তর-পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত বা ক্ষুণ্ন করবে না। এমনকি ১২৩ ধারাতেও মুসলিম আইনের হেবাকে স্থাবর সম্পত্তির দানের ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অতএব, নতুন আইন সরাসরি মিরাসের বিধান বাতিল করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগতভাবে সতর্ক অবস্থান হবে না।
কিন্তু তাহলে তো আলেম-ওলামাদের এখানেই বিতর্ক শেষ করা উচিত ছিল!
কিন্তু আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেখলাম, এই বিষয়ে প্রশ্ন যেন থামছেই না।
একজন ব্যক্তি যদি জীবদ্দশায় এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন যে মৃত্যুর সময় ওই সম্পত্তি তাঁর মালিকানায় আর থাকে না, তাহলে সেই সম্পত্তি নিয়ে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার কী হবে?
আর ভবিষ্যৎ মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: দানটি সত্যিই দান কি না?
আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা হতে পারে এমন কোনো বিরোধ, যেখানে কোনো সন্তান বা অন্য উত্তরাধিকারী আদালতে গিয়ে বলবেন—দানটি আসলে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
তখন শুধু নিবন্ধিত দলিল থাকলেই সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যাবে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের সামনে তখন প্রশ্ন আসতে পারে—
দাতা কি আইনগত সক্ষম অবস্থায় দলিল করেছিলেন?
দানের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রহণযোগ্যতা ও অন্যান্য আইনগত শর্ত পূরণ হয়েছিল কি?
দলিলটি স্বেচ্ছায় করা হয়েছিল, নাকি চাপ, প্রতারণা বা প্রভাবের কারণে?
দাতা কি প্রকৃতপক্ষে মালিকানা হস্তান্তর করেছিলেন?
নাকি শুধু কাগজে মালিকানা বদল হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রেখেছিলেন?
অর্থাৎ ভবিষ্যতের মামলায় “আমি উত্তরাধিকারী, তাই আমার অংশ চাই”—এই বক্তব্যের পাশাপাশি “হস্তান্তরটি আদৌ বৈধ ছিল কি না”—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘ভোগাধিকার’ কতটা?
নতুন আইনের আরেকটি বড় প্রশ্ন এখানেই।
১২২এ ধারায় দাতার জন্য “right of lifetime enjoyment” বা জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ভোগাধিকার বাস্তবে কতদূর বিস্তৃত—আইনে তার প্রতিটি দিক বিশদভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
দাতা কি শুধু ওই বাড়িতে বসবাস করতে পারবেন?
তিনি কি বাড়িটি ভাড়া দিতে পারবেন?
ভাড়া থেকে আয় নিতে পারবেন?
সম্পত্তির কোনো অংশ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করতে পারবেন?
বড় ধরনের সংস্কার করতে পারবেন?
অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দিতে পারবেন?
এমনকি সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, কর বা অন্যান্য ব্যয় কে বহন করবেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে একটি মৌলিক দ্বৈততা তৈরি হচ্ছে: মালিকানা এক ব্যক্তির, ভোগাধিকার আরেক ব্যক্তির।
আইনটি এই দুই স্বার্থকে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু তাদের পারস্পরিক সীমা সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট করেনি।
গ্রহীতা সম্পত্তি বিক্রি করলে কী হবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দানগ্রহীতা কি দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল রেখেই সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক রাখতে পারবেন?
ধরা যাক, বাবা ছেলেকে বাড়ি দান করলেন এবং বাবা আজীবন বাড়িটি ভোগ করার অধিকার রাখলেন। পরে ছেলে বাড়িটি তৃতীয় ব্যক্তির কাছে বিক্রি করলেন।
নতুন ক্রেতা কি বাড়িটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ভোগ করতে পারবেন?
নাকি বাবার জীবনকালীন অধিকার তাঁকে মেনে চলতে হবে?
আইনের ১২২এ ধারায় দাতা-সংরক্ষিত ভোগাধিকারের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বিধান আছে; এমনকি দানগ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলেও দাতার ভোগাধিকার বহাল থাকবে এবং সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে।
কিন্তু তৃতীয় পক্ষের ক্রেতা, বন্ধকগ্রহীতা বা ইজারাগ্রহীতার অবস্থান নিয়ে আরও বিস্তারিত বিধান থাকলে ভবিষ্যতের বিরোধ অনেকটাই কমানো যেত।
গ্রহীতা আগে মারা গেলে নতুন উত্তরাধিকার প্রশ্ন
আইনের ১২২এ(৩) ধারাটি আরও একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে।
ধরা যাক, বাবা ছেলেকে সম্পত্তি দান করলেন, কিন্তু বাবা জীবিত থাকতেই ছেলে মারা গেলেন। আইনের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পত্তি ছেলের উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে; তবে বাবার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
অর্থাৎ একই সম্পত্তির ক্ষেত্রে এক পর্যায়ে দাতা থেকে গ্রহীতার কাছে মালিকানা গেছে, পরে গ্রহীতার মৃত্যুর কারণে আবার তার উত্তরাধিকারীদের কাছে গেছে।
তখন প্রশ্ন হবে—গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে অংশ কীভাবে নির্ধারিত হবে? কোন ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে? দাতার ভোগাধিকার কীভাবে কার্যকর থাকবে?
এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতে আদালতের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে।
হেবা ও নতুন ব্যবস্থার সম্পর্ক
বাংলাদেশের মুসলিম নাগরিকদের জন্য হেবা একটি স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তর-পদ্ধতি। নতুন আইনের ১২২এ(৪) ধারায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থাটি হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত হস্তান্তর-পদ্ধতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
তাই প্রশ্নটি “হেবা থাকবে কি থাকবে না”—এমন নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, একজন মুসলিম ব্যক্তি একই ধরনের পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হেবা এবং ১২২এ—দুটি ভিন্ন আইনি পথ ব্যবহার করলে তাদের আইনগত ফলাফলের পার্থক্য কোথায় দাঁড়াবে।
বিশেষ করে দাতার দখল, ভোগাধিকার, গ্রহণযোগ্যতা, নিবন্ধন এবং উত্তরাধিকারীদের পরবর্তী দাবি—এসব বিষয়ে দুই ব্যবস্থার মধ্যে বিচারিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
আইনটির আরও একটি দুর্বল জায়গা: ‘genuine necessity’
১২২বি ধারায় নিবন্ধনের পর এই ধরনের দানকে সাধারণভাবে অপরিবর্তনীয় করা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো “genuine necessity”-এর কারণে পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো পক্ষের সম্মতি পাওয়া সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জেলা জজের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কিন্তু “genuine necessity” কী—তার বিস্তারিত মানদণ্ড নেই।
একজন দাতার চিকিৎসার জন্য সম্পত্তি বিক্রি করা কি genuine necessity?
কতটা চিকিৎসা ব্যয় হলে তা প্রযোজ্য হবে?
বিকল্প সম্পদ থাকলে কী হবে?
পুরো সম্পত্তি বিক্রি প্রয়োজন, নাকি আংশিক সম্পত্তিই যথেষ্ট?
এসব প্রশ্ন আদালতের সামনে আসতে পারে।
মিরাসের প্রশ্নে আইনপ্রণেতার আরও স্পষ্টতা দরকার
নতুন আইনটি একটি নতুন সম্পত্তি-হস্তান্তর ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশে সম্পত্তির মালিকানা, হেবা, মিরাস এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইন পাশাপাশি কার্যকর, তাই শুধু নতুন একটি transfer mechanism তৈরি করাই যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন ছিল অন্তত কিছু বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা—
প্রথমত, বৈধ ১২২এ হস্তান্তরের পর সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওপর পরবর্তী উত্তরাধিকার দাবির অবস্থান কী হবে।
দ্বিতীয়ত, দানের বৈধতা নিয়ে উত্তরাধিকারীদের চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রগুলো কী হবে।
তৃতীয়ত, জীবনকালীন ভোগাধিকারের সুনির্দিষ্ট পরিধি কী।
চতুর্থত, সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতার অধিকার কী।
পঞ্চমত, কর, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য দায় কার।
ষষ্ঠত, গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলে পরবর্তী উত্তরাধিকার এবং দাতার ভোগাধিকারের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে আদালতকে দিতে হলে বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
আইন করার পর আদালতের ওপর পুরো ভার না দেওয়াই ভালো
আইন পরিবর্তনের উদ্দেশ্য যদি হয় পরিবারের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরকে সহজ করা এবং দাতার জীবনকালীন ভোগের অধিকার নিশ্চিত করা, তাহলে সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর করার জন্য স্পষ্টতা জরুরি।
অন্যদিকে, উত্তরাধিকারব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে কোনো অনিচ্ছাকৃত সংঘাত তৈরি হলে সেটিও শুরুতেই চিহ্নিত করা দরকার।
কারণ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুধু আইনের বইয়ের প্রশ্ন নয়। একটি জমি বা বাড়ির সঙ্গে একটি পরিবারের বহু প্রজন্মের সম্পর্ক জড়িত থাকে। কোনো বিধানের অর্থ যদি পাঁচ-দশ বছর পর আদালতে গিয়ে নির্ধারণ করতে হয়, তাহলে সেই সময়ের মধ্যে একই ধরনের শত শত দলিল তৈরি হয়ে যেতে পারে। তখন একটি অস্পষ্টতা শুধু একটি মামলার সমস্যা থাকবে না; তা বহু পরিবারের সম্পত্তি-বিরোধে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই নতুন আইনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক এটি নয় যে আইনটি মিরাস বাতিল করেছে কি না। বরং প্রশ্ন উত্থাপন করা উচিত—জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের স্বাধীনতা এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের অধিকার—এই দুইয়ের সীমানা আইনটি যথেষ্ট স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছে কি না।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
আইনের নতুন বিধানটি আদালতে পরীক্ষা হবে—কেবল মিরাসের প্রশ্নে নয়; বরং মালিকানা, ভোগাধিকার, হেবা, উত্তরাধিকার, তৃতীয় পক্ষের অধিকার এবং পারিবারিক সম্পত্তি-বিরোধের বহু সংযোগস্থলে। সেই বিচারিক অভিজ্ঞতা আসার আগেই আইনটির অস্পষ্ট জায়গাগুলো নিয়ে আইনপ্রণেতা, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন।
তাহলে বিকল্প সমাধান কী হতে পারে?
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য যদি হয়—বাবা-মা জীবদ্দশায় তাঁদের সম্পত্তি সন্তানকে দিয়ে দেবেন, কিন্তু সেই সম্পত্তি থেকে তাঁদের উচ্ছেদ করা যাবে না—তাহলে প্রশ্ন হলো, এই সুরক্ষার জন্য নতুন করে ১২২এ ধারার প্রয়োজন আদৌ ছিল কি না।
বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই একটি বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেত।
ধরা যাক, বাবা বা মা তাঁদের কোনো জমি মেয়েকে দান করতে চান। দানপত্রে মালিকানা মেয়ের কাছে হস্তান্তর করা হলো। কিন্তু একই দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলো যে বাবা-মা তাঁদের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তিতে বসবাস, ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করবেন। একই সঙ্গে মেয়ের কাছ থেকে একটি নিবন্ধিত অপরিবর্তনীয় আমমোক্তারনামা নেওয়া যেতে পারে, যাতে বাবা-মায়ের সংরক্ষিত অধিকার বাস্তবায়ন, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকে।
প্রয়োজনে দানপত্রের সঙ্গে পৃথকভাবে নিবন্ধিত আমমোক্তারনামাও করা যেতে পারে। বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরিবর্তনীয় আমমোক্তারনামার জন্য বিদ্যমান আইনেই স্বীকৃতি ও নিবন্ধন কাঠামো রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। শুধু আমমোক্তারনামা বাবা-মায়ের আজীবন ভোগ বা বসবাসের অধিকার সৃষ্টি করে না। সেই অধিকার দানপত্রেই স্পষ্টভাবে সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করতে হবে। আমমোক্তারনামা হবে সেই অধিকার কার্যকর ও সুরক্ষিত রাখার একটি অতিরিক্ত আইনি উপায়।
অর্থাৎ একটি সুরক্ষিত কাঠামো হতে পারে—
দানপত্রে মালিকানা হস্তান্তর, যার সঙ্গে বাবা-মায়ের আজীবন বসবাস ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণ থাকবে, নিবন্ধিত অপরিবর্তনীয় আমমোক্তারনামার মাধ্যমে।
এ ব্যবস্থায় মেয়ে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন, কিন্তু দলিলে সংরক্ষিত বাবা-মায়ের অধিকার উপেক্ষা করে তাঁদের সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ সহজ থাকে না। বাবা-মায়ের হাতে থাকবে তাঁদের সংরক্ষিত অধিকার প্রয়োগের আইনি ক্ষমতাও।
এ ধরনের ব্যবস্থা আরও একটি সুবিধা দিতে পারে। এখানে উত্তরাধিকার বা মিরাসের ওপর নতুন কোনো statutory mechanism তৈরি না করেই জীবদ্দশার সম্পত্তি হস্তান্তর এবং বাবা-মায়ের সুরক্ষা—দুটি বিষয়কে আলাদা রাখা যায়।
তবে এর জন্য দলিলের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দানপত্রে শুধু “দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ব্যবহার করবেন”—এমন সাধারণ বাক্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। সেখানে স্পষ্ট করতে হবে—
বাবা-মায়ের বসবাসের অধিকার কী ধরনের;
সম্পত্তির আয় বা ভাড়া কে পাবেন;
কর, খাজনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার;
মালিক মেয়ের বিক্রয়, বন্ধক বা ইজারার ক্ষমতা কীভাবে বাবা-মায়ের সংরক্ষিত অধিকারের অধীন থাকবে;
বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া তাঁদের দখল বা ব্যবহার কীভাবে পরিবর্তন করা যাবে না;
এবং তাঁদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। বাবা-মায়ের সুরক্ষাকে শুধু আমমোক্তারনামার ওপর নির্ভর না করে এর পাশাপাশি দলিলে একটি সুস্পষ্ট life interest বা right of residence/use হিসেবে তৈরি করা হলে তাঁদের অবস্থান অনেক বেশি পরিষ্কার হবে। কারণ মালিকানা এবং ভোগের অধিকার যে একই বিষয় নয়, নতুন আইনটি মূলত সেটিই দেখিয়েছে।
আইন করার আগে বিদ্যমান আইনকে আরও কার্যকর করা যেত কি?
নতুন ১২২এ ধারার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের শুরুতে এখানেই।
সমস্যাটি যদি হয়—বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর যাতে সেই সন্তান তাঁদের সম্পত্তি থেকে বের করে দিতে না পারে—তাহলে প্রথমে দেখা দরকার ছিল, বিদ্যমান সম্পত্তি হস্তান্তর ও আমমোক্তারনামা-সংক্রান্ত আইনকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যবহার করে একই সুরক্ষা দেওয়া যায় কি না।
কারণ নতুন একটি সম্পত্তি-হস্তান্তর পদ্ধতি তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে মিরাস, হেবা, উত্তরাধিকার, তৃতীয় পক্ষের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ মামলা—সবকিছুর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রচলিত ব্যবস্থার অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট দলিল কাঠামো তৈরি করা গেলে সমস্যাটি অনেকাংশে contractual protection এবং reserved property rights-এর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হতে পারে।
অবশ্যই এই বিকল্প ব্যবস্থাটিও আইনগতভাবে নিখুঁত করতে হবে। শুধু একটি অপরিবর্তনীয় আমমোক্তারনামা দিয়ে বাবা-মায়ের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে—এমন ধারণা নিরাপদ নয়। তাঁদের জীবনকালীন ভোগ ও বসবাসের অধিকার মূল দানপত্রেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
শেষ কথা
সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন করার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু কে জমির মালিক হবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো মালিকানা হস্তান্তরের পর যিনি সেই সম্পত্তির ওপর নির্ভরশীল, তাঁর অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং একই সঙ্গে উত্তরাধিকার আইনের কাঠামো কীভাবে অক্ষুণ্ন থাকবে।
নতুন আইন যদি এই সমস্যার সমাধান করতে চায়, তাহলে তার প্রতিটি শব্দের অর্থ স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মিরাস, হেবা, আজীবন ভোগাধিকার, তৃতীয় পক্ষের অধিকার এবং সম্পত্তি বিক্রির প্রশ্নে অস্পষ্টতা রেখে দিলে আজকের সমাধানই আগামী দিনের মামলা হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে যদি দানপত্রে বাবা-মায়ের আজীবন ভোগ ও বসবাসের অধিকার সংরক্ষণ এবং তার সঙ্গে যথাযথ নিবন্ধিত আমমোক্তারনামার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সেটিও আইনপ্রণেতাদের বিবেচনার যোগ্য একটি বিকল্প।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন একটি জটিলতা তৈরি করা নয়; বরং সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পরও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এবং একই সঙ্গে মিরাসের বিধানকে অযথা নতুন বিতর্কের মধ্যে না ফেলা।
লেখক: শামস আর্ক, আইনজীবী ও কলামিস্ট।

