প্রথাগত শাস্তির বাইরে আদালতের ভিন্নধর্মী রায় ও প্রবেশন সিস্টেম
খুরশিদ কামাল তুষার; শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথাগত শাস্তির বাইরে আদালতের ভিন্নধর্মী রায় ও প্রবেশন সিস্টেম

ঘটনা ১

গত ২৯ আগস্ট, ২০২২ গাঁজা সহ আটক হওয়া দুই ব্যক্তির দোষ স্বীকার ও প্রথমবার অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কাজী শরীফুল ইসলাম এক বছরের কারাদণ্ডের পরিবর্তে এক বছর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ও দুটি এতিমখানায় বাংলা অনুবাদসহ পবিত্র কুরআন শরীফ দান করার আদেশ দেন।

এর আগে গত ১৪ জুন মানহানি মামলায় এক কণ্ঠশিল্পীকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ডের বদলে বিনাবেতনে ৬ মাস নজরুল সঙ্গীত শেখানোর নির্দেশ দেন একই আদালত।

ঘটনা ২

বিদেশ পাঠাতে ভিসা বিক্রির চুক্তিপত্র করেও প্রতারণা করার অভিযোগে ২০১১ সালের নভেম্বরে কক্সবাজারে দায়ের করা মামলায় ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ স্থগিত রেখে আসামিকে ১২টি শর্তে মুক্তির রায় দেন চকরিয়ার তৎকালীন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব কুমার দেব।

ঐ ১২ শর্তের মধ্যে ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বই পড়া, গাছ লাগানো, এতিমদের খাওয়ানো, নিয়মিত  নামাজ পড়া ও মাদক থেকে দূরে থাকার নির্দেশ।

ঘটনা ৩

গত ২০২০ সালের ৯ মার্চ গাঁজা বিক্রি করা অবস্থায় ধরা পড়া নয়জন তরুণকে মাগুরার বিচারক মোস্তফা পারভেজ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তিন মাস কারাদণ্ডের পরিবর্তে আসামীদের সৎ জীবনযাপনে প্রত্যেককে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চারটি বই পড়তে, দুটি চলচ্চিত্র দেখতে ও পাঁচটি চারাগাছ রোপণ করার নির্দেশ দেন।

কেন এমন রায়?

আলোচিত তিনটি ঘটনায় রায় দেওয়ার প্রক্রিয়া একই ধাঁচের। এই প্রক্রিয়াই প্রবেশন সিস্টেম নামে পরিচিত। প্রবেশন হলো দোষী সাব্যস্ত হওয়া অপরাধীদের একটি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অপরাধীকে সরাসরি শাস্তি প্রদান স্থগিত রেখে কিছু শর্ত সাপেক্ষে স্বাভাবিক সমাজ জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

সাধারণত কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁকে শাস্তি পেতে হবে এটাই নিয়ম। দন্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী সে শাস্তি হয় কারাবাস নয়তো আর্থিক জরিমানা কিংবা উভয়ই। হত্যা, ধর্ষণের মত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে।

অপরাধ বিজ্ঞানী গারল্যান্ড এর মতে, “শাস্তি হলো এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ফৌজদারী আইন ভঙ্গকারীরা নির্দিষ্ট আইনি ধারা ও পদ্ধতির মাধ্যমে দন্ডিত হয়।”

প্রবেশনের ইতিহাস

এই শাস্তি স্থগিত রেখে প্রবেশনে পাঠানোর বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন মনে হলেও এ ধারণাটি অনেক পুরনো। প্রবেশন শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ “Probatio” থেকে যার আক্ষরিক অর্থ হল পরীক্ষাকাল। বহু বছর আগে ১৮৪১ সালে ফিলাডেলফিয়ার জন অগাস্টাস নামের একজন সু মেকার (মুচি) এক মাতালকে শাস্তি না দিয়ে আচরণ সংশোধনের একটি সুযোগ দেয়ার বিষয়ে আদালতের বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। বিচারক বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেন। শর্ত ছিল মদ্যপান করে আর কখনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবেনা। মাতাল শুধরে গিয়েছিলো। ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ১৯৪৬ জন ব্যক্তি এইভাবে শর্তসাপেক্ষে মুক্ত হয়েছিলেন যাদের মধ্যে মাত্র ১০ জন শর্ত ভঙ্গ করেছিলেন, যা শতকরা হিসেবে মাত্র ০.৫১%।

প্রবেশনের উদ্দেশ্য 

প্রবেশনের উদ্দেশ্যই হলো পুণঃ পুণঃ সংঘটিত অপরাধ থেকে সমাজকে সুরক্ষিত রাখা এবং অপরাধীকে একজন প্রবেশন কর্মকর্তার অধীনে তদারকিতে রেখে তাঁকে স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেয়া। তবে মোটা দাগে সব ধরনের অপরাধের জন্য প্রবেশন প্রযোজ্য নয়। যে অপরাধীরা প্রথমবার অপরাধে জড়িয়েছে এবং অপরাধ তুলনামূলক কম ক্ষতিকর অথবা লঘু দণ্ডর অপরাধে অভিযুক্ত তাদর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামো

প্রবেশনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে দ্য প্রবেশন অফ অফেন্ডার অর্ডিন্যান্স, ১৯৬০ এএই অধ্যাদেশের ধারা ৪ মতে, আগে কখনো দণ্ডিত হয়নি অথবা অপরাধের মাত্রা এমন যে তাতে দুই বছরের বেশি মেয়াদে দণ্ড হবে না এমন ক্ষেত্রে শাস্তি না দিয়ে প্রবেশনে পাঠানো যাবে। তবে এক্ষেত্রে আসামীর বয়স, চরিত্র, পারিবারিক প্রেক্ষাপট, দৈহিক কিংবা মানসিক অবস্থা ও অপরাধের ধরণ বিবেচনা করা হয়।

একই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, লঘু অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বা প্রথমবার করা অপরাধে অভিযুক্ত যেকোনো বয়সের ব্যক্তি নিজে দোষ স্বীকার করলে আদালত দণ্ড স্থগিত রেখে প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিবার ও সমাজে রেখে সংশোধন ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ দিতে পারেন।

অধ্যাদেশের অধীন প্রবেশন অফিসার হয়ে থাকেন মূলত সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তিনি প্রধান ভূমিকা পালনের সাথে সাথে সার্বক্ষণিক দেখভালের ব্যবস্থা করে থাকেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রম শাখার পরিচালকের নেতৃত্বে একজন উপ পরিচালক, একজন সহকারী পরিচালক, সদর দপ্তর পর্যায়ে এবং মাঠ পর্যায়ে ৪৪ জন প্রবেশন অফিসার এবং ৪৮৮ জন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যারা মূলত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট।

মন্তব্য

অপরাধীকে প্রথাগত কারাদণ্ড বা জরিমানা না করে প্রবেশন অফিসারের অধীনে রেখে শর্তসাপেক্ষে সমাজে চলতে দেয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই নেতিবাচক মনে হলেও এই প্রক্রিয়ায় আসলে ইতিবাচক দিকই দৃশ্যমান।

যেহেতু একজনের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয় তাই অপরাধ পুনরায় করার সুযোগ কম। সবচেয়ে বড় কথা হলো, অপরাধীকে যেসব শর্ত দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়, তা ভঙ্গ করলে পুনরায় তাঁকে প্রথাগত শাস্তির আওতায় আসতে হয়।

তাই এরকম ভাবার কোন কারণ নেই যে অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার সমস্ত কার্যক্রম পরোক্ষভাবে আদালতের নজরদারিতেই রয়েছে।

যে কর্মকর্তা প্রবেশন অফিসারের দায়িত্বে থাকবেন তিনি একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর আদালতকে আসামীর উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে তথ্য দিতে থাকবেন এবং সাথে সাথে যে উদ্দেশ্যে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে সে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য রাখবেন।।

সর্বোপরি আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রবেশন একটি সময়োপযোগী ও কার্যকরী বিকল্প ব্যবস্থা, যা সমাজে অপরাধের পরিমাণ কমাতে সহায়তা করে, সাথে সাথে অপরাধ জগতে থিতু হওয়ার আগেই অপরাধী স্বাভাবিক সমাজ জীবনে ফিরে আসে।

লেখক : খুরশিদ কামাল তুষার; শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

তথ্যসূত্রঃ  ১) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এর ওয়েবসাইট, ২) দৈনিক আযাদী, ৩) দৈনিক দেশ রুপান্তর।